২০০১ সালের প্রথম দিকে তালেবানরা আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় ষষ্ঠ শতাব্দীর দুটি বিশাল বুদ্ধ মূর্তি উড়িয়ে দেয়।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এমন সব মূর্তি হারানোর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে, যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষ সম্ভবত জানতই না, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেগুলো আমাদের ‘সামষ্টিক মানবতা’-র প্রতীক ছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ- মুখপাত্র ফিলিপ টি রিকার একটি প্রেস বিবৃতি জারি করে তালেবানের বুদ্ধ মূর্তি ও অন্যান্য প্রাচীন নিদর্শন ধ্বংস করার সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের “বিচলিত ও হতবাক” হওয়ার কথা জানিয়েছেন: “বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত মূর্তি ও ভাস্কর্যের ইচ্ছাকৃত ধ্বংসযজ্ঞ অবোধ্য।”
অবশ্যই, সেই একই বছরের শেষের দিকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” শুরু করে এবং আফগানিস্তানকে বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়, তখন “ইচ্ছাকৃত ধ্বংসযজ্ঞ” বা “ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের” গণহত্যা নিয়ে অনুরূপ কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়নি।
কিন্তু এই ধরনের ভণ্ডামি হলো প্রাচ্যবাদী অমানবিকীকরণ, বাছাইকৃত সাংস্কৃতিক উদ্বেগ এবং ‘ঐতিহ্য’-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
যদিও বামিয়ান সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাটি ছিল যে, তালেবানরা বুদ্ধ মূর্তিগুলোকে মূর্তিপূজক হওয়ার কারণে ধ্বংস করেছিল, কিন্তু ২০০১ সালের ১৯ মার্চ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ঘটনাটির কিছুটা ভিন্ন বিবরণ তুলে ধরে।
প্রতিবেদনটিতে তালেবান দূত সাইয়েদ রহমতুল্লাহ হাশিমির উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, যিনি দাবি করেছেন যে, মূর্তিগুলো সংরক্ষণের জন্য ইউরোপীয় ও অন্যান্য বিদেশিদের কাছ থেকে অর্থের প্রস্তাব পেলেও অনাহারে থাকা দশ লক্ষ আফগানকে সাহায্য করতে রাজি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ একদল ধর্মীয় পণ্ডিত এই ধ্বংসযজ্ঞের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ভুল অগ্রাধিকারের কারণে পণ্ডিতরা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁরা বলেছিলেন, “আপনারা যদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেন, তবে আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি আপনাদের কোনো মনোযোগ থাকতে পারে না।” আর তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে এই মূর্তিগুলো অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।
সভ্যতার উপর যুদ্ধ
এক চতুর্থাংশ শতাব্দী এগিয়ে গিয়ে ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার গণহত্যাবাদী বন্ধু ইসরায়েলের ইরানের উপর চালানো যুদ্ধের কথা ভাবলে, বামিয়ান বুদ্ধের সেই ভণ্ডামি আবারও মনে পড়ে যায়। সর্বোপরি, ইরান প্রচুর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রাচীন স্থানের আবাসস্থল, যার অনেক কিছুই মাসব্যাপী এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিন্তু যেহেতু ধ্বংসযজ্ঞটা ওরা নয়, বরং আমরাই চালাচ্ছি, তাই ইতিহাসের এই ক্ষতি নিয়ে কেউই তেমন সোচ্চার নয় — বিপুল প্রাণহানির কথা তো বলাই বাহুল্য। যুদ্ধের শুরুর দিকের অন্যতম একটি হামলায়, মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল স্কুলছাত্রী।
স্বভাবসুলভভাবেই, মার্কিন সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, যতক্ষণ না তা পুরোপুরি অনিবার্য হয়ে ওঠে। একেই বলে ‘ভবিষ্যৎ’ ধ্বংস করা।
অতীতের ধ্বংসের প্রসঙ্গে, গার্ডিয়ানের একটি নিবন্ধে ইরানের ইসফাহান প্রদেশের গভর্নর মেহদি জামালিনেজাদের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি ঐতিহাসিক সম্পদের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষতিসাধন নিয়ে বলেছেন: “এটি একটি সভ্যতার ওপর যুদ্ধ ঘোষণা। যে শত্রুর কোনো সংস্কৃতি নেই, সে সংস্কৃতির প্রতীকের প্রতি মনোযোগ দেয় না। যে দেশের কোনো ইতিহাস নেই, সে ইতিহাসের চিহ্নকে সম্মান করে না।”
এদিকে লেবাননে, যেখানে মার্কিন-সমর্থিত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সাড়ে তিন মাসে ৩,৮২০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, সেখানে সভ্যতাও আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
ইসরায়েলের উন্মত্ত বোমা হামলা এবং পোড়ামাটি নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলো দক্ষিণ লেবাননের টায়ার শহর, যা তার প্রায় ৫,০০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে বিশ্বের প্রাচীনতম এবং অবিচ্ছিন্নভাবে জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি।
ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান টায়ারে রয়েছে দ্বিতীয় শতাব্দীর একটি রোমান হিপ্পোড্রোম, একটি ফিনিশীয় সমাধিক্ষেত্র, সমুদ্রের দিকে প্রসারিত প্রাচীন স্তম্ভশোভিত রাস্তা এবং আরও প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক রত্ন, যেগুলো বোমাবর্ষণে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট ঝুঁকিতে রয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের ৯০০ বছরের পুরোনো বোফোর্ট দুর্গ, যা ইউনেস্কোর মতে “নিকট প্রাচ্যের মধ্যযুগীয় দুর্গগুলোর অন্যতম সেরা সংরক্ষিত উদাহরণ”, সেটিও ইসরায়েলিদের দ্বারা দখল ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর টায়ারের দক্ষিণে শামা শহরে, সেন্ট পিটারের প্রতি উৎসর্গীকৃত একটি ঐতিহাসিক দুর্গ ও উপাসনালয় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে।
এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, যদি পরিস্থিতি উল্টো হতো এবং হিজবুল্লাহই উন্মত্তের মতো ৫,০০০ বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ‘সামষ্টিক মানবতা’ নিশ্চিহ্ন করে দিত, তাহলে পশ্চিমা দর্শকেরা এই পুরো ঘটনার পৈশাচিকতা সম্পর্কে আরও অনেক বেশি শুনতে পেত।
‘বিচলিত ও হতবাক’ হওয়ার কথা ভুলে যান – মার্কিন সরকার এবার নিশ্চিতভাবেই আরও তীব্র আবেগকেই বেছে নেবে।
দক্ষিণ লেবাননে ইতিহাস ধ্বংসের কথা বলতে গেলে ২০১৩ সালের একটি ঘটনা মনে না করে পারা যায় না, যখন লেবাননে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মওরা কনেলি গাড়িবহর নিয়ে টায়ারের একটি প্রাচীন স্থানের ওপর দিয়ে চালিয়ে সেটির ক্ষতিসাধন করেন, যার ফলে জাদালিয়্যা ওয়েবসাইটে এই শিরোনামটি প্রকাশিত হয়েছিল: “টায়ারের ওপর টায়ার: মার্কিন রাষ্ট্রদূত ধ্বংসাবশেষকেই ধ্বংস করলেন”।
বলা বাহুল্য, মার্কিন গণমাধ্যম বিষয়টি লক্ষ্য করেনি।
ধ্বংস পর্যটন
আজও বামিয়ান বুদ্ধ মূর্তিগুলো যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করে চলেছে এবং বর্তমানে নিউ ইয়র্ক শহরে তাদের সম্মানে একটি বিশাল বেলেপাথরের ভাস্কর্য প্রদর্শিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, তালেবানরা বুদ্ধ মূর্তিগুলোর পূর্বের স্থানটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছে এবং ২০২১ সালে এনবিসি নিউজ রিপোর্ট করেছিল যে, “প্রায় ৫ ডলারের বিনিময়ে কৌতূহলী দর্শনার্থীরা পাহাড়ের খাড়া গায়ে থাকা সেই বিশাল গর্তগুলোর চারপাশে ঘুরে বেড়াতে এবং ছবি তুলতে পারে, যেখানে একসময় প্রাচীন বুদ্ধ মূর্তিগুলো দাঁড়িয়ে ছিল”।
২০২৩ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট এর জবাবে লেখে: “অর্থকষ্টে থাকা তালেবানরা তাদেরই উড়িয়ে দেওয়া বুদ্ধমূর্তির ধ্বংসাবশেষের টিকিট বিক্রি করছে।”
তবুও, নিজেদের ধ্বংস করা জিনিস থেকে শুধু তালেবানরাই যে অর্থ কামাচ্ছে, তা নয়। ধ্বংস-পর্যটনের আরও এক বীভৎস রূপে, ইসরায়েলি শহর সদেরোতের একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে বসানো দূরবীন দর্শনার্থীদের—সামান্য অর্থের বিনিময়ে—গাজা উপত্যকার ওপর ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়।
বেড়ানোর আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করার জন্য কেউ কেউ পপকর্ন নিয়ে আসে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় মার্কিন-সমর্থিত গণহত্যা যুদ্ধে সরকারিভাবে ৭৩,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যদিও প্রকৃত মৃতের সংখ্যা নিঃসন্দেহে এর চেয়ে অনেক বেশি।
কিন্তু বিষয়টি শুধু হত্যা নিয়ে নয়। গাজা ও লেবানন উভয় স্থানেই গণহত্যা, পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ এবং ঐতিহাসিক ধ্বংসযজ্ঞ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরায়েল যখন বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির বিনাশ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন তা সম্মিলিত মানবতার অস্তিত্বের ভানকেও নির্মূল করে দিচ্ছে।
- বেলেন ফার্নান্দেজ: আল জাজিরার একজন কলামিস্ট এবং তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘The Darien Gap: A Reporter’s Journey through the Deadly Crossroads of the Americas’ (রাটগার্স ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২৫)। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

