হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানিকারকরা এখন এক নতুন সংকটের মুখে। বাংলাদেশ ও ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপগামী কনটেইনার পরিবহন খরচ গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবমুখী পণ্যের ভাড়া তিন মাস ধরে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ড্রিউরির ‘কনটেইনার ফ্রেইট রেট ইনসাইট’ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাত চলমান থাকা এবং উপসাগরীয় জাহাজসেবা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী ভাড়া উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। জেদ্দাসহ সৌদি বন্দরগুলোতে হুথি হামলার ঝুঁকিও পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরাসরি জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পণ্য এখন দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে পাঠাতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, ভারতের প্রধান বন্দরগুলোতে জাহাজ জট, বাজারে জাহাজের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং জুলাই থেকে বিভিন্ন শিপিং কোম্পানির নতুন সারচার্জ।
ভারতের জওহরলাল নেহরু বন্দর (জেএনপিটি) থেকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে ৪০ ফুট কনটেইনার পরিবহনের স্পট ভাড়া ২০২৫ সালে গড়ে ছিল ৭৩৪ ডলার। ইরান সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ২১৬ ডলারে—মাত্র দুই মাসে বৃদ্ধির হার ৮০৭ শতাংশ। বর্তমানে এসব চালান হরমুজ এড়িয়ে স্থলপথের সঙ্গে সমন্বিত বিকল্প রুটে পাঠানো হচ্ছে। ফলে খরচ ও সময় দুটোই বেড়েছে।
এপ্রিলে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর জুনে এ ভাড়া কিছুটা কমে ৫ হাজার ৬০৯ ডলারে নেমেছে। তবুও তা সংকট-পূর্ববর্তী সময়ের প্রায় আট গুণ। সৌদি আরবের জেদ্দামুখী পণ্য পরিবহনেও একই ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। জেএনপিটি থেকে জেদ্দায় ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৮৪ ডলার থেকে মার্চে বেড়ে ৫ হাজার ৩৫৪ ডলারে ওঠে। জুনে তা কিছুটা কমে ৪ হাজার ৫৯৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ড্রিউরির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলমুখী সরাসরি জাহাজসেবা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হওয়ায় পণ্যকে দীর্ঘ রুটে স্থানান্তর করতে হচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যগামী পরিবহন ব্যয়ে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে।
শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহে ভারত থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী রুটেও ভাড়া দ্রুত বেড়েছে। জেএনপিটি থেকে ইতালির জেনোয়া বন্দরে ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ৫৪ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৩০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে নিউইয়র্কগামী ভাড়া ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৭৯৭ ডলার হয়েছে, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাজারে জাহাজের সক্ষমতা হঠাৎ কমে যাওয়া। ভূমধ্যসাগরীয় শিপিং কোম্পানি এমএসসি তাদের ‘ইন্ডাস এক্সপ্রেস’ সেবা প্রত্যাহার করেছে। ওশান নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেসের (ওয়ান) ‘উইন’ সেবা জুনে সীমিত হয়ে পড়ায় কসকো ও এইচএমএম তাদের বরাদ্দকৃত পরিবহন সক্ষমতা হারিয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়া থেকে রপ্তানি পণ্যের চাহিদা আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
ফলে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল ও উত্তর ইউরোপমুখী জাহাজগুলোর জায়গা আগস্টের শেষ পর্যন্ত প্রায় পুরোপুরি বুক হয়ে গেছে। শিপিং কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সাপ্তাহিক চাহিদার তুলনায় বর্তমানে বুকিং আবেদন দ্বিগুণেরও বেশি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কোম্পানিগুলো বুকিংয়ের শর্ত কঠোর করছে। হ্যাপাগ-লয়েড প্রতি কনটেইনারের বুকিং বাতিলের জরিমানা তিন গুণ বাড়িয়ে ৩০০ ডলার করেছে। মায়ের্স্ক, এমএসসি, কসকো ও ওয়ান দক্ষিণ এশিয়ার পণ্য পরিবহনে বাতিল ফি বাড়িয়ে প্রতি কনটেইনার ১০০ থেকে ২০০ ডলার নির্ধারণ করেছে।
দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত জাহাজ সক্ষমতা দ্রুতই ঘাটতিতে রূপ নিচ্ছে। জুনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরীয় রুটে নিয়োজিত জাহাজের সক্ষমতা আগের মাসের তুলনায় ৬ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ এশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র রুটেও উদ্বৃত্ত সক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। ওয়ানের ‘উইন’ সেবা বন্ধ এবং এমএসসির ‘ইন্ডাস এক্সপ্রেস’ স্থগিত হওয়ায় দুই মাসে এ রুটের সক্ষমতা প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে।
ড্রিউরির শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভারতের নাভা শেভা ও মুন্দ্রা বন্দরে কয়েকটি জাহাজসেবায় প্রতি যাত্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টিইইউ পণ্য পরবর্তী জাহাজের জন্য পড়ে থাকছে। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে সিএমএ সিজিএমের মতো কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত জাহাজ মোতায়েন করছে। এমএসসিও আগস্টের শেষ দিকে ইন্ডাস এক্সপ্রেস সেবা আবার চালু করার পরিকল্পনা করেছে।
বন্দর জট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জেএনপিটিতে জাহাজের অপেক্ষার সময় বছরের ২৭তম সপ্তাহে ১৮ ঘণ্টা ছিল। পরের সপ্তাহেই তা বেড়ে ২৬ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। এতে রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পৌঁছার সময় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু সমুদ্র পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাত শুরুর পর প্রধান উপসাগরীয় এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ায় বৈশ্বিক আকাশপথে পণ্য পরিবহনের আনুমানিক ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সক্ষমতা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে কিছু সেবা চালু হলেও দক্ষিণ এশিয়ার বিমান পরিবহন ভাড়ায় এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দিল্লি ও মুম্বাই থেকে লন্ডনগামী এয়ার ফ্রেইটের স্পট ভাড়া ৫৭ থেকে ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ড্রিউরি পণ্য রপ্তানিকারক ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবহন বাজার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগর-সুয়েজ খাল এড়িয়ে বিকল্প রুট, অতিরিক্ত সময় ও ব্যাকআপ পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখার সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

