বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পবেল্টে এক ভিন্ন বাস্তবতার কল্পনা করা যায়। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আধুনিক শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন হাজারো তরুণ-তরুণী দক্ষতা অর্জনের সনদ নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। তারা আর বিদেশে স্বল্পদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কর্মসংস্থানের জন্য ছুটছে না; বরং নিজ দেশেই প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও দক্ষ কর্মী হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তুলছে।
শিল্পাঞ্চলের পাশেই গড়ে উঠেছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র। কাচঘেরা ভবন, উন্মুক্ত কর্মপরিবেশ এবং সবুজ ক্যাম্পাসজুড়ে সকাল থেকেই কর্মব্যস্ততা। কেউ চিপ নকশা নিয়ে গবেষণা করছে, কেউ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, আবার কেউ সফটওয়্যার ও শিল্পপ্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবনে যুক্ত। আজ এটি কল্পনার মতো মনে হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এমন বাস্তবতা তৈরি করা অসম্ভব নয়।
এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরকে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি অর্জন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। এর মূল্যায়ন হওয়া উচিত কতটি বিনিয়োগ এল, কত প্রযুক্তি দেশে এলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কত নতুন রপ্তানি সুযোগ তৈরি হলো—এসব সূচকের ভিত্তিতে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা পেয়ে আসছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও টানেল নির্মাণে চীনা অর্থায়ন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ রয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এসব অবকাঠামোর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে পারবে কি না। আসন্ন সফরের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই পথ নির্ধারণ করা।
অবকাঠামো উন্নয়ন শুধু সড়ক বা সেতু নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের নদী, পানি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিও উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিস্তা প্রকল্প যদি আলোচনায় আসে, তবে সেটিকে শুধু একটি বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে নয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচব্যবস্থা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, মৎস্যসম্পদ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চীনের আর্থিক বা কারিগরি সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঋণের শর্ত, পরিবেশগত মূল্যায়ন, দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ এবং স্বাধীন তদারকির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তিস্তা প্রকল্প যেন কেবল ঋণনির্ভর উদ্যোগ না হয়ে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি হয়, সেই লক্ষ্যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।
বর্তমান বিশ্বে চীন কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারি প্রযুক্তি, সৌরশক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন, শিল্প উৎপাদন এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়ও অন্যতম শীর্ষ শক্তি। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ঋণের পরিবর্তে বিনিয়োগ আকর্ষণ, আমদানিনির্ভরতার পরিবর্তে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতার পরিবর্তে প্রযুক্তি অর্জন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর এক বিষয় নয়। ভবিষ্যতের যেকোনো বড় প্রকল্পে কেবল জনবল প্রশিক্ষণ নয়, দেশীয় প্রকৌশল সক্ষমতা বৃদ্ধি, রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা, স্থানীয় সরবরাহকারী উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বহুদিন ধরে আলোচিত এই প্রকল্পকে শুধু জমি উন্নয়ন বা অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কোন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে, বিনিয়োগের পরিমাণ কত হবে, কী ধরনের পণ্য উৎপাদিত হবে, কতজন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, কত শতাংশ স্থানীয় উপকরণ ব্যবহৃত হবে এবং কত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু হবে—এসব বিষয় চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা জরুরি।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিদেশি বিনিয়োগ এলেই প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত হয় না। বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও দেশীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত হয়নি। ফলে ভবিষ্যতের যেকোনো সমঝোতায় প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় সরবরাহকারী সংযোগের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন খাত বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ হ্রাসে এসব খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ যদি শুধু সৌর প্যানেল সংযোজনেই সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাটারি, ইনভার্টার, চার্জিং অবকাঠামো, বৈদ্যুতিক বাস ও মোটরসাইকেল উৎপাদনের মতো সমন্বিত শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়—তিনটিই সম্ভব হবে।
সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকস খাতেও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বিশাল আকারের চিপ উৎপাদন কারখানা স্থাপন এখনই বাস্তবসম্মত না হলেও চিপ নকশা, এমবেডেড সফটওয়্যার, পরীক্ষণ, প্যাকেজিং, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, সেন্সরভিত্তিক যন্ত্র এবং ইলেকট্রনিক উপাদান উৎপাদনে অংশীদারত্বের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীদের দক্ষতা রয়েছে; প্রয়োজন গবেষণাগার, শিল্পসংযোগ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ।
এই লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ-চীন শিল্পদক্ষতা ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। যেখানে সৌর প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যান রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, রোবট প্রযুক্তি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা হবে।
বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার বিষয়টিও আলোচনায় থাকা জরুরি। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় আমদানি উৎস হলেও সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো সীমিত। শুল্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও পণ্যের মান, মোড়কীকরণ, সনদায়ন, পরিবহন, বিপণন, ভাষাগত দক্ষতা এবং ভোক্তার চাহিদা সম্পর্কে সীমিত ধারণা রপ্তানি বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে আছে। এসব সমস্যা দূর করতে বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে পাট, চামড়া, সামুদ্রিক খাদ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, হালাল খাদ্য, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল পণ্য ও উন্নতমানের পোশাক চীনা বাজারের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হবে।
কৃষি ও খাদ্যপ্রযুক্তিতেও সহযোগিতার সুযোগ বিস্তৃত। খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জন করলেও বাংলাদেশ এখনো ফসল-পরবর্তী ক্ষতি, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিরাপত্তা সনদ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য শুধু ভর্তুকি বা স্বল্পমেয়াদি ঋণ যথেষ্ট নয়। কৃষি-শিল্প গুচ্ছ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কৃষকদেরও অংশীদার করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং রপ্তানিমুখী সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হলে কৃষকেরা কেবল উৎপাদক নয়, লাভের অংশীদারও হতে পারবেন।
ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও সতর্ক থাকা জরুরি। নতুন ঋণের পরিবর্তে উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেকোনো অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, সুদের হার, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্দর, কাস্টমস, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ছাড়া শিল্পায়নের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। দ্রুত ছাড়পত্র ব্যবস্থা, বন্ডেড গুদাম, ডিজিটাল কাস্টমস, শীতল সরবরাহব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকর তদারকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়ন দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেছে। তাই প্রতিটি চুক্তির সঙ্গে সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং বাস্তবায়ন ধাপ স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতি হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা মানে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সমানভাবে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সাফল্য কতটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো তা দিয়ে নয়, বরং কতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল, কতজন তরুণ দক্ষতা অর্জন করল, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত প্রযুক্তি দেশে এলো এবং কত রপ্তানি বৃদ্ধি পেল—এসব ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।
বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন দেশটি কেবল চীনা পণ্যের বাজার হিসেবে নয়, বরং চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে নিজস্ব উৎপাদন, রপ্তানি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট কৌশল, দক্ষ দরকষাকষি এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর চুক্তি।

