ব্যাংকিং খাত মূলত মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার মূলধন, শাখা-উপশাখা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নয়—আমানতকারীর বিশ্বাস। সাধারণ মানুষ সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংকে রাখেন এই প্রত্যাশায় যে প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ নিরাপদে ফেরত পাবেন।
ব্যবসায়ী ব্যাংককে লেনদেনের নির্ভরযোগ্য অংশীদার এবং উদ্যোক্তা সুষ্ঠু মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থায়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে এই মৌলিক বিশ্বাসে যখন ফাটল ধরে, তখন ক্ষতিটা কেবল কোনো একটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতি ও সমাজে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এমনই এক কঠিন সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম, বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া, উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ এবং দুর্বল তদারকির মতো বিষয় বারবার সামনে এসেছে। বিশেষ করে অনিয়মের মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের পর তা আদায়ে ব্যর্থতা সাধারণ আমানতকারীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে—তার কষ্টার্জিত সঞ্চয় আসলে কতটা নিরাপদ। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট এখন আর কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি দেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নও পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩২.৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল ৭.৯ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকি অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, regulatory capture এবং related-party lending ব্যাংকিং খাতের বড় দুর্বলতার কারণ। বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংকিং খাতের প্রাধান্যও অত্যন্ত বেশি; দেশের আর্থিক ব্যবস্থার সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে কোনো ব্যাংকের সব আমানত ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়া নয়। কিন্তু খেলাপি ঋণ যখন বিপুল আকার ধারণ করে, তখন ব্যাংকের আয় কমে যায়, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় provisioning-এর চাপ বাড়ে, মূলধন ক্ষয় হয় এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হতে থাকে। এর ফলে আমানতকারী, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই সংকটের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের জমে থাকা দুর্বলতার ফল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নেও ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণ দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম শক্তিশালী হওয়ার পর ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সমস্যার একটি বড় অংশ হিসাবের মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে এবং এর ফলে অনেক ব্যাংকের reported capital adequacy regulatory minimum-এর নিচে নেমে গেছে। অর্থাৎ বর্তমানে যে সংকট প্রকাশ্যে এসেছে, তার সবটাই নতুন করে সৃষ্টি হয়নি; অতীতে জমে থাকা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার একটি বড় অংশ এখন আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। এ কারণেই শুধু খেলাপি ঋণের সর্বশেষ সংখ্যা কমিয়ে দেখানো, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে হিসাবের চেহারা পরিবর্তন করা কিংবা সাময়িক সুবিধা দিয়ে সংকট আড়াল করা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদের মান, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় মূলধনের পরিমাণ—সবকিছুর স্বচ্ছ মূল্যায়ন জরুরি।
ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের জটিল হিসাব সাধারণ আমানতকারীর কাছে সবসময় বোধগম্য নয়। তিনি মূলত দেখেন, প্রয়োজনের সময় নিজের টাকা তুলতে পারছেন কি না, চেক সময়মতো নিষ্পত্তি হচ্ছে কি না, মেয়াদি আমানতের অর্থ নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যাচ্ছে কি না, ব্যাংকের শাখায় অস্বাভাবিক দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে কি না কিংবা কোনো ব্যাংক নিয়ে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হচ্ছে কি না। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তার আস্থা বা অনাস্থার ভিত্তি তৈরি করে।
আস্থার সংকট আরও গভীর হয় যখন কোনো ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি কিংবা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা থাকে না। কোনো গ্রাহক নিজের টাকা তুলতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতা বা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হলে সেই উদ্বেগ খুব দ্রুত অন্য আমানতকারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের যুগে একটি নেতিবাচক খবর, গুজব কিংবা কোনো ব্যাংকের তারল্য সংকটের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আর্থিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংককে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে আমানতকারীদের স্বাভাবিক প্রশ্ন আরও তীব্র হয়—তাদের টাকা কতটা নিরাপদ, কখন তা তোলা যাবে এবং ব্যাংকের কাঠামো পরিবর্তিত হলে তাদের হিসাবের কী হবে। ব্যাংক পুনর্গঠন বা একীভূতকরণ প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্য, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া তা করা হলে সংস্কারের উদ্দেশ্যই উল্টো ফল দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকও সতর্ক করেছে, দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে দ্রুত consolidation করা হলে তুলনামূলক ভালো ব্যাংকও দুর্বল প্রতিষ্ঠানের সমস্যার ভারে আক্রান্ত হতে পারে।
ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমে গেলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। সীমিত আয় থেকে বছরের পর বছর সঞ্চয় করা মধ্যবিত্ত পরিবার, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা ব্যাংকের আমানতের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল মানুষদের কাছে সামান্য সঞ্চয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং আর্থিক নিরাপত্তা—সবকিছুতেই চাপ পড়ে।
আস্থার সংকট মানুষকে ব্যাংকে নতুন করে টাকা জমাতে, দীর্ঘমেয়াদি আমানত রাখতে কিংবা বিনিয়োগে অর্থ দিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। কেউ অতিরিক্ত নগদ অর্থ হাতে রাখতে পারেন, কেউ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হওয়া প্রতিষ্ঠানে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকতে পারেন। এর ফলে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের ব্যয় বাড়তে পারে এবং আমানতের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও সংকুচিত হতে পারে।
এর প্রভাব তখন ব্যাংকের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে পিছিয়ে যান, ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি কমে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের ওপর আস্থার সংকট শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সংকটেও রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড ও ইলেকট্রনিক লেনদেন ব্যাংকিং সেবাকে দ্রুত আধুনিক করেছে। এখন অনেক সেবা শাখায় না গিয়েই পাওয়া সম্ভব। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু প্রযুক্তি কোনোভাবেই ব্যাংকের সুশাসনের বিকল্প নয়।
একটি ব্যাংকের অ্যাপ যত আধুনিকই হোক, ঋণ যদি যথাযথ যাচাই ছাড়া দেওয়া হয়, পরিচালনা পর্ষদ যদি ব্যবস্থাপনার কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকে কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা সময়মতো ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে প্রযুক্তি দিয়ে আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বরং ডিজিটাল যুগে আস্থার সংকট আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, দ্রুত তথ্যপ্রকাশ এবং বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ কাঠামো অপরিহার্য।
পরিস্থিতির ইতিবাচক দিক হলো, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা মোকাবিলায় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই, পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন, ব্যাংক resolution কাঠামো শক্তিশালী করা এবং আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের Financial Sector Support Project II-এর লক্ষ্যও deposit protection ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংক resolution-এর কাঠামো তৈরি করা, Emergency Liquidity Assistance ব্যবস্থা উন্নত করা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারে সহায়তা করা।
এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সাধারণ মানুষ বাস্তবে এর সুফল কতটা অনুভব করছেন। কোনো ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন তুলনামূলক ভালো হলেও যদি আমানতকারী মনে করেন তার টাকা নিরাপদ নয়, তাহলে প্রকৃত আস্থা ফিরবে না। বিপরীতে কোনো ব্যাংকের সমস্যা থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি স্বচ্ছভাবে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে, আমানতকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আতঙ্ক অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের অন্যতম ভিত্তি হলো শক্তিশালী আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশে Deposit Protection Scheme শক্তিশালী করা এবং Deposit Protection Fund পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আমানত সুরক্ষার সীমা ১ লাখ টাকা থেকে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করার সংস্কারও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তবে শুধু সুরক্ষার সীমা নির্ধারণ করলেই মানুষের উদ্বেগ দূর হবে না। আমানতকারীকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে—কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে তার সুরক্ষিত অর্থ কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কত সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে deposit insurance-এর শক্তি শুধু সুরক্ষিত অর্থের পরিমাণে নয়; দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যেও নিহিত। বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো খেলাপি ঋণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান। ঋণখেলাপিকে বারবার পুনঃতফসিল করে সময় দেওয়া আর প্রকৃত অর্থে ঋণ উদ্ধার করা এক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক bad বা loss হিসেবে শ্রেণীকৃত ঋণের জন্য এককালীন exit facility চালু করেছে। নির্দিষ্ট শর্তে এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ এবং কিছু সুদ মওকুফের ব্যবস্থাও এতে রয়েছে।
এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য যদি হয় প্রকৃত অর্থ উদ্ধার, দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করা, তাহলে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে বারবার সুবিধা দিয়ে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের পুরস্কৃত করা না হয়। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকের প্রতি অন্যায় হবে এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। অসুস্থ কিন্তু সম্ভাবনাময় ব্যবসা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে তাই একই দৃষ্টিতে দেখা যাবে না।
দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি হওয়া উচিত—ব্যাংকের ক্ষতির দায় প্রথমে মালিক ও ব্যবস্থাপনার ওপর বর্তাবে, সাধারণ আমানতকারীর ওপর নয়। ব্যাংকের মালিকানা শুধু মুনাফা অর্জনের সুযোগ নয়; এর সঙ্গে বিশাল সামাজিক ও আর্থিক দায়ও জড়িত। কোনো মালিক বা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে ব্যাংকের সম্পদ নষ্ট হলে সাধারণ করদাতার অর্থ দিয়ে বারবার সেই ক্ষতি পূরণ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
একইভাবে ভালো ব্যাংককে দুর্বল ব্যাংক অধিগ্রহণ বা একীভূতকরণে যুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সম্পদ ও দায়ের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি। তা না হলে একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি তুলনামূলক সুস্থ প্রতিষ্ঠানকেও দুর্বল করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার অন্যতম প্রধান শর্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর তদারকি সক্ষমতা। শুধু নিয়ম প্রণয়ন করলেই হবে না; নিয়ম ভঙ্গ হলে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, governance failure, regulatory capture এবং related-party lending ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ICT অবকাঠামো আধুনিকীকরণ, তথ্য ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং risk-based supervision শক্তিশালী করার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ব্যাংকিং তদারকি শুধু ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নিয়ন্ত্রকের হাতে real-time বা near-real-time risk monitoring, interconnected exposure analysis, related-party transaction monitoring এবং early-warning system-এর মতো আধুনিক সক্ষমতা থাকতে হবে।
সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যথাসম্ভব নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। সমস্যা লুকিয়ে রাখলে সাময়িকভাবে আতঙ্ক কমানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে fit-and-proper criteria কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। ব্যাংকের মালিকানা থাকলেই যে কেউ ব্যাংক পরিচালনার যোগ্য—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
Related-party lending এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ থেকে ঋণ সিদ্ধান্তকে সুরক্ষিত করার জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক firewall তৈরি করতে হবে। খেলাপি ঋণ উদ্ধারে বিশেষায়িত কাঠামো, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর bankruptcy framework প্রয়োজন। শক্তিশালী bank resolution, deposit insurance, corporate governance, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার এবং robust NPL management framework-এর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যাংক একীভূত বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও আমানতকারীদের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা প্রয়োজন। কে কতটা সুরক্ষা পাবেন, হিসাব কীভাবে পরিচালিত হবে, টাকা তোলার নিয়ম কী হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কত সময় নিতে পারে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকলে গুজব ও আতঙ্ক বাড়বে। পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটকে শুধু কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দীর্ঘদিনের ঋণশৃঙ্খলার দুর্বলতা, ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়ম, খেলাপি ঋণের বিস্তার, সুশাসনের ঘাটতি, তদারকির সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের আস্থা ক্ষয়ের সম্মিলিত ফল। ২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২.৬ শতাংশে পৌঁছানো এবং ২০২৫ সালের শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকি অনুপাত ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ হওয়া পরিস্থিতির গভীরতা বোঝার জন্য যথেষ্ট।
তবে এই সংকটকে শুধু হতাশার কারণ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা দূর করে ব্যাংকিং খাতকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি সুযোগও হতে পারে। প্রয়োজন সমস্যাকে আড়াল না করে স্বীকার করা, প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ করা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং আমানতকারীর স্বার্থকে প্রতিটি সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।
ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন করা যায়, নতুন আইন করা যায়, দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা যায়, প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটানো যায়। কিন্তু মানুষের হারানো আস্থা রাতারাতি ফিরিয়ে আনা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি স্বচ্ছতা, কঠোর জবাবদিহি, ন্যায়সংগত ঋণব্যবস্থা, কার্যকর তদারকি এবং ধারাবাহিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ।
কারণ ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কত টাকা আমানত আছে, কতগুলো শাখা আছে কিংবা কতটি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে—তা নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ কি এখনো নির্ভয়ে বলতে পারেন—‘আমার কষ্টার্জিত টাকা এখানে নিরাপদ’? এই বিশ্বাসটুকু ফিরিয়ে আনাই এখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

