| প্রযুক্তি বিশ্লেষক, লেখক এবং টেকসই উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক ফাইজ তাইয়েব আহমেদ সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশের কূটনীতি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলো-আপ ঘাটতি নিয়ে একটি বিশদ মতামত প্রকাশ করেছেন। পাঠকদের জন্য তাঁর লেখাটি তুলে ধরা হলো। |
বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী জানেন? সফর হয়। চুক্তি হয়। ছবি ওঠে। তারপর? আর সেভাবে ফলো-আপ হয় না।
বাংলাদেশের সরকার প্রধানরা বিদেশ সফরে যান, গ্লোবাল বিজনেস লিডার, টেক লিডার কিংবা বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বসেন, চুক্তি হয়, সমঝোতাপত্র সই করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান প্রফেসর ইউনুস চীন গেছেন, আমেরিকা গেছেন, পৃথিবীর শীর্ষ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছেন।
এসব হাই প্রোফাইল সংযোগের জন্য বহু দেশ লিবস্টের পেছনে মিলিয়ন ডলার খরচ করে। সফরের আসল কাজ শুরু হবার কথা, ফেরার পরে। কিন্তু আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফলোআপ করেনা সেভাবে। কানেকশন ছবিতেই থেকে যায়।
একটা সংযোগ তৈরি হলে সেটাকে নার্চার করতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়/বিডা- এই ৪/৫ জায়গায় সেই ফলো-আপ নিবিড়ভাবে করে না। সংশ্লিষ্ট কোনও ডেস্ক নাই যারা এগুলা করবে, একে অপরকে এসকালেট করবে। যে ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সংযোগ হলো, তাঁকে বাংলাদেশের সাপ্লাই চেইনে আনতে হবে, পণ্য উৎপাদনে যুক্ত করতে হবে, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, আউটসোর্সিং বা টেকনোলজি ট্রান্সফারে কাজ করাতে হবে। এই রূপান্তরটা এমনিতে হয় না। এর জন্য দরকার কাঠামোগত ফলো-আপ, বৈঠকের পরে বৈঠক, প্রস্তাবের পরে প্রস্তাব, এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
১। শি-জিন পিং ২০১৬ সালে বাংলাদেশে এসেছেন। সেসময় বড় বড় ঋণ চুক্তি, সমঝোতা হয়। আইসিটির একটা প্রকল্প ইডিসি’তে ৩০০০ কোটি টাকার ঋণ দেয়ার কথা। দায়িত্ব নেয়ার পর দেখলাম প্রকল্প চলছে ৬/৭ বছর ধরে, প্রায় সব কম্পনেন্ট আউটডেটেড, অকার্যকর। তখনও বাংলাদেশ সুদের হার নিয়ে সম্মত হতে পারেনি। ইআরডি চায় জাইকা রেটে ২%। আমি চাইনিজ দূতাবাসকে অনুরোধ করলাম বিষয়টি সেটেল এন্ড ক্লোজ করতে।
এমব্যাসি থেকে জানানো হল, চাইনিজ এক্সিম ব্যাংক ৩% এর নিচে দিতে পারবে না। তাদের লোকসান করে ৩% এর নিচে তারা ঋণ দিতে পারবে না। আমি চাইনিজ কম্পোনেন্ট বাদ দিয়ে ইডিসি প্রজেক্ট কাটছাঁট করে নতুন রিভাইজড ডিপিপি প্ল্যানিং কমিশনে পাঠিয়েছি। এবং যাথারীতি কিছু কর্মকর্তা নাখোশ, প্ল্যানিং কমিশনে ভেন্ডর আর অসাধু কিছু কর্মকর্তা দৌড়ঝাপ করেছেন। চাইনিজ প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুত প্রজেক্ট ঠিক সময়ে সেটেল করতে না পারায়, এর কার্যকরিতা থাক্লো না। একটা ডিজিটাল প্রজেক্ট যদি আপনি ২/৩ বছরে শেষ না করেন, এটার স্পেসিফিকেশন গুলার কার্যকরিতা থাকে না, এই কালেক্টিভ বোধ আমাদের নাই।
- ক। প্রজেক্টের বাস্তবায়ন ঠিক সময়ে না হওয়ায় দেশের বৈদেশিক ঋণের ডেট সার্ভিসিং এ বিশাল চাপ এসেছে।
- খ। বাস্তবায়নে ৩ বছরের জায়গায় ৭/৮ বছর লাগে বলে প্রকল্পগুলো কার্যকরিতা হারাচ্ছে।
- গ। নতুন প্রযুক্তিগত প্রজেক্টের আলোচনার পথ বন্ধ হচ্ছে।
৩। নেদারল্যান্ডসের ব্রেইন পোর্ট যারা সেমাইকন্ডাকটর, থ্রি-ডি প্রিন্টিং ইকোসিস্টেম তৈরিতে, ইন্ডাস্ত্রি-একাডেমিয়া-সরকার এই তিনের গ্যাপ পূরণে কাজ করে (যেমন তাইওয়ান, ভিয়েতনাম)। আওয়ামীলীগের সময়ে বাংলাদেশে ঘুরে গেছেন। একটা ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি দরকার, মাত্র দেড়-দুই কোটি টাকার ইস্যু, একাধিকবার তাগাদা দেয়ার পরেও কর্মকর্তাদের কোনো মাথাব্যাথা নাই। অথচ একবার এঙ্গেইজ হলে, কিছু হোক বা না হোক ওদের থার্ড পার্টি প্রজেক্টে (সৌদি বা তাইওয়ান) রিসোর্স সাপ্লাই এর সম্ভাবনা তৈরি হয়। যেখানে বিদেশ ভ্রমণ নাই, সেখানে উনাদের তেমন কোন আগ্রহ নাই।
৪। ডাচ ও জার্মান টেলিকম রেগুলেটর ২টার সাথে বিটিআরসির ফর্মাল ট্রেনিং ও টেক শেয়ারিং এঙ্গেইজমেন্ট করতে এমওইউ’র পরামর্শ দিয়েছি। একাধিকবার বলার পরেও বিটিআরসি বিষয়টা পিক করেনি। কিন্তু উনারা রেগুলেটরি যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা চান। আমাদের টেলিকম রেগুলেটর সক্ষমতার দিক থেকে মাত্র ২য় প্রজন্মের, ডাচ-জার্মানরা ৫ম প্রজন্মের। কিন্তু তাও আমাদের নতুন জ্ঞানের দরকার নাই!
কিন্তু শত শত কোটির যন্ত্রপাতি কেনা লাগবে। দেখুন, সারা বিশ্বে টেলিকমের শত শত অপারেটরদের সবাই মাত্র ২/৩টা ভেন্ডরের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। কিন্তু সেসবের ফিচারাইজেশন ও প্যারামিটারাইজেশন ভিন্ন হবার কারনে উমলাউট বেঞ্চমার্কিং এ কারও পার্ফর্মেন্স স্কোর ১০০০ এ ৫০০ কারও ৯৭০। আমরা বিদেশ ভ্রমণ চাই, জ্ঞান ও দক্ষতা ট্র্যান্সফারে নজর নাই। প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিপ্লোম্যাসি, বিজনেস, নলেজ ট্রান্সফার এবং দক্ষাতা উৎপাদনের এসব কম্পোনেন্টের কাঠামোগত সমাধান দরকার। কে ড্রাইভ করবে, পিক করবে- ফলোআপ করবে, না করলে পেনাল্টি কি হবে!
ফলাফল কী হচ্ছে? ভূরাজনৈতিক অ্যালাইনমেন্ট আসছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভ্যালু যোগ হচ্ছে না। চুক্তি ফাইলে থাকছে, বাস্তবে নামছে না। কূটনীতির সাফল্য মাপা উচিত স্বাক্ষরে নয়, কতটা বিনিয়োগ এলো, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো, কোন প্রযুক্তি দেশে ঢুকল, সেই হিসেবে। কূটনীতির সাফল্য চুক্তির পাতায় নয়, মাঠে মাপতে হবে।
লেখক: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক

