সমকালীন চিন্তক তমজিৎ গাঙ্গুলীর একটি আলোচিত ফেসবুক পোস্টে অনিশ্চয়তা, কৌতূহল এবং মানবিক স্বাধীনতার প্রশ্ন নতুনভাবে উঠে এসেছে। মানুষের আত্ম-অন্বেষণ, প্রশ্ন করার সাহস এবং অজানাকে গ্রহণ করার দর্শন নিয়ে তাঁর এই ভাবনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। পাঠকদের জন্য লেখাটি নিচে তুলে ধরা হলো-
মানুষ হওয়া মানে শুধু নিয়ম মেনে চলা নয়। শুধু সমাজের তৈরি ছাঁচে নিজেকে ঢেলে দেওয়াও নয়। প্রকৃত মানুষ হওয়া মানে পৃথিবীর প্রতি এক ধরনের উন্মুক্ততা ধারণ করা। এমন এক মন তৈরি করা, যা অজানাকে ভয় পায় না, অনিশ্চয়তাকে শত্রু মনে করে না, আর অন্ধ নিশ্চয়তার কাছে নিজের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেয় না।
আমরা এমন এক সংস্কৃতিতে বড় হই যেখানে আমাদের শেখানো হয় নিশ্চিত উত্তর খুঁজতে। বলা হয়, এই পথই সঠিক, এই বিশ্বাসই চূড়ান্ত, এই নিয়মই শেষ কথা। কিন্তু জীবন কখনও এত সরল নয়। জীবন কোনো সমাধানপুস্তক / Ray n Martin নয় যেখানে সব প্রশ্নের উত্তর আগেই লেখা আছে। জীবন বরং এক উন্মুক্ত ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
যত গভীরভাবে আমরা অস্তিত্বকে দেখি, ততই বুঝতে পারি যে একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো অনিশ্চয়তা। সবকিছু পরিবর্তনশীল। সবকিছু প্রবাহমান। আজ যা সত্য বলে মনে হচ্ছে, আগামীকাল তা নতুন উপলব্ধির সামনে পরিবর্তিত হতে পারে। আজ যে বিশ্বাসকে আমরা আঁকড়ে ধরে আছি, কাল হয়তো সেই বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতাই আমাদের চোখে পড়বে।
তাই প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা মানে জীবনের প্রতি নিজের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। যে মানুষ প্রশ্ন করতে পারে না, সে শিখতেও পারে না। কারণ প্রশ্নই জ্ঞানের জন্ম দেয়। প্রশ্নই নতুন পথ খুলে দেয়। প্রশ্নই মানুষকে ভয় থেকে মুক্ত করে।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ব্যর্থ হওয়া নয়। সবচেয়ে বড় ভুল হলো ব্যর্থতার ভয়ে চেষ্টা না করা। ভুল করার সাহস না থাকা। কারণ যে মানুষ ভুল করে না, সে আসলে নতুন কিছু করারও চেষ্টা করে না। সে শুধু নিরাপদ বৃত্তের ভেতরে ঘুরপাক খায়।
অজানা জলে নামতে শিখতে হবে। প্রতিটি ঢেউয়ের উচ্চতা মেপে তবেই যাত্রা শুরু করলে কোনোদিন সমুদ্র পাড়ি দেওয়া যায় না। কখনও কখনও ঝুঁকি নিতে হয়। কখনও কখনও অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ জীবন অপেক্ষা করে না যতক্ষণ না আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হই।
আমাদের ভেতরে যে সংস্কার, বিশ্বাস, ভয় এবং সামাজিক প্রোগ্রামিং জমে আছে, সেগুলোকেও পরীক্ষা করা দরকার। আমরা অনেক কিছু বিশ্বাস করি শুধু কারণ আমাদের তা বিশ্বাস করতে শেখানো হয়েছে। অনেক নিয়ম মেনে চলি শুধু কারণ সবাই মেনে চলছে। কিন্তু কোনো ধারণা পুরনো হলেই তা সত্য হয় না। কোনো বিশ্বাস জনপ্রিয় হলেই তা সঠিক হয় না।
সাহসী মানুষ সেই, যে নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে পারে। নিজের মানসিক কাঠামোকে ভেঙে নতুন করে গড়তে পারে। নিজের ভেতরের কারাগারকে চিনতে পারে।
মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো কল্পনা। কিন্তু কল্পনাও প্রায়শই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। আমরা সেই পর্যন্তই কল্পনা করি, যতটা আমাদের শেখানো হয়েছে। অথচ কল্পনার প্রকৃত কাজ হলো সীমা অতিক্রম করা। এমন সম্ভাবনার কথা ভাবা যা আগে কেউ ভাবেনি। এমন বাস্তবতার স্বপ্ন দেখা যা এখনও জন্ম নেয়নি।
নিজের কল্পনাকেও পুনরায় কল্পনা করতে শিখতে হবে। নিজের চিন্তার ভিত্তিকেও নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। কারণ যে মন পরিবর্তিত হতে পারে না, সে ধীরে ধীরে জীবন্ত থাকা সত্ত্বেও স্থবির হয়ে যায়।
ভাগ্যের বিষয়টিও আমরা প্রায়শই অবহেলা করি। আমরা ভাবি সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমাদের পরিকল্পনার বাইরে ঘটে। কার সঙ্গে দেখা হবে, কোন সুযোগ সামনে আসবে, কোন ঘটনা আমাদের জীবন বদলে দেবে, তার অনেকটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এ কারণেই জীবনের প্রতি এক ধরনের প্রেম দরকার। শুধু সাফল্যের প্রতি নয়, শুধু আনন্দের প্রতি নয়, বরং সমগ্র যাত্রার প্রতি। যা ঘটেছে, যা ঘটছে, এবং যা ঘটবে, তার প্রতি গভীর গ্রহণযোগ্যতা।
এর মানে এই নয় যে সবকিছুর কাছে আত্মসমর্পণ করা। বরং এর মানে হলো বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ না করে তার সঙ্গে নৃত্য করতে শেখা। প্রতিরোধের বদলে অংশগ্রহণ করা। অভিযোগের বদলে উপলব্ধি করা।
জীবনের অন্যতম গভীর শিক্ষা হলো বিপরীত সত্যগুলোকে একসঙ্গে ধারণ করতে পারা। শক্তিশালী হওয়া এবং কোমল হওয়া। স্বাধীন হওয়া এবং সংযুক্ত হওয়া। সন্দেহ করা এবং বিশ্বাস করা। বিশৃঙ্খলাকে গ্রহণ করা এবং একইসঙ্গে অর্থ সৃষ্টি করা।
পৃথিবী সাদা-কালো নয়। অস্তিত্ব কোনো সরল সমীকরণ নয়। এখানে অনেক সত্য একইসঙ্গে সত্য হতে পারে। অনেক বিরোধ আসলে গভীরতর স্তরে একে অপরের পরিপূরক।
যে মানুষ এই দ্বৈততার টান সহ্য করতে পারে, সে পরিণত হয়। যে মানুষ সবকিছুকে সরল উত্তর দিয়ে মিটিয়ে ফেলতে চায়, সে প্রায়ই বাস্তবতার জটিলতা থেকে পালিয়ে বেড়ায়।
অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসে থাকতে শেখা এক ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি। কারণ তখন আর প্রতিটি প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত উত্তর লাগে না। প্রতিটি অন্ধকারকে সঙ্গে সঙ্গে আলোকিত করার প্রয়োজন হয় না। তখন মানুষ জানে যে কিছু রহস্য রহস্য হিসেবেই থাকতে পারে।
কৌতূহল তখন কম্পাস হয়ে ওঠে। ভয় নয়। ডগমা নয়। অন্ধ বিশ্বাস নয়। কৌতূহলী মানুষ জানে যে পথই আসল শিক্ষক। সে জানে যে প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি ব্যর্থতা, প্রতিটি বিস্ময় তাকে নতুন করে গড়ছে।
অবশেষে হয়তো জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া নয়, বরং অর্থ সৃষ্টি করাই মানুষের কাজ। এই বিশাল নীরব মহাবিশ্ব আমাদের জন্য কোনো প্রস্তুত উত্তর নিয়ে অপেক্ষা করছে না। কিন্তু সেই শূন্যতাই আমাদের স্বাধীনতা।
সেই শূন্যতার ভেতরেই আমরা অর্থ সৃষ্টি করি। মূল্য সৃষ্টি করি। ভালোবাসা সৃষ্টি করি। শিল্প সৃষ্টি করি। নিজেদের সৃষ্টি করি।
আর হয়তো প্রকৃত মানুষ হওয়া মানে এটাই। নিশ্চয়তার কারাগার ছেড়ে অজানার আকাশে পা রাখা। ভয়ের বদলে কৌতূহল বেছে নেওয়া। আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই নিজের আলো জ্বালিয়ে পথ চলা।
লেখক: টমজিৎ গাঙ্গুলী, ফেসবুক

