ব্যাংকিং খাতে ঋণ দেওয়ার জন্য নীতিমালা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও তদারকির ব্যবস্থা থাকলেও নিয়মের ফাঁকফোকর, বিশেষ নীতি-সুবিধা এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে সেই কাঠামো বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে বড় ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, সুদ মওকুফ কিংবা এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ বারবার তৈরি হলে তা শুধু ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকেই দুর্বল করে না; নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী উদ্যোক্তাদের মধ্যেও হতাশা তৈরি করে। এতে ঋণশৃঙ্খলা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের অর্থ আটকে দিচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে অর্থনীতিতে নতুন ঋণের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের Monetary Policy Review 2025-26 অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের বিপরীতে গ্রস খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ, কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণ, ঋণগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক চাপ এবং ব্যাংকিং সুশাসনের দুর্বলতাকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে খেলাপি ঋণের পুরো সমস্যাকে শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা ব্যবসায়িকভাবে সাময়িক সংকটে পড়তেই পারেন। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের পরিবর্তন, উচ্চ সুদ কিংবা অর্থনৈতিক মন্দার মতো কারণে কোনো কার্যকর ব্যবসা সাময়িকভাবে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক। একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা টিকে থাকলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বজায় থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের অর্থও ফেরত আসার সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন সাময়িক সংকট মোকাবিলার জন্য তৈরি এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণকে কৃত্রিমভাবে স্বাভাবিক দেখানোর উপায়ে পরিণত হয়। নামমাত্র অর্থ জমা দিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিল করা, বারবার পরিশোধের সময় বাড়ানো কিংবা বিশেষ নীতির মাধ্যমে পুরোনো দায়কে নতুন কাঠামোয় সাজিয়ে দেওয়া হলে ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি আড়ালে থাকতে পারে। ফলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র সময়মতো প্রকাশ পায় না এবং সমস্যা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় হয়ে জমা হয়।
এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ঋণশৃঙ্খলায়। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী একজন উদ্যোক্তা যদি দেখেন যে বড় ঋণগ্রহীতা বছরের পর বছর খেলাপি থেকেও নতুন সুবিধা পাচ্ছেন, তাহলে সময়মতো ঋণ পরিশোধের প্রণোদনা দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক। তখন একটি ভুল বার্তা তৈরি হয়—ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘moral hazard’ বা নৈতিক ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংস্কৃতিকেও উৎসাহিত করতে পারে।
এ কারণেই বিশেষ সুবিধার প্রয়োজনীয়তা ও তার অপব্যবহারের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি। ২০২৬ সালের ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনরুদ্ধার ও নিষ্পত্তির জন্য Special Exit Policy জারি করেছে। এর উদ্দেশ্য দীর্ঘদিন আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার করে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাকে দায় নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া। একই সময়ে পুনর্গঠন ও One Time Exit ব্যবস্থার মতো নীতিও চালু হয়েছে। এসব উদ্যোগের অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে, কারণ দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকের অর্থ আটকে রাখে এবং সেই অর্থ নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যায় না।
তবে বিশেষ সুবিধার সাফল্য নির্ভর করবে কারা এই সুবিধা পাচ্ছেন এবং কীভাবে তাদের যাচাই করা হচ্ছে তার ওপর। প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া, হিসাব স্বচ্ছ রাখা এবং নিজের সম্পদ ও আয় থেকে দায় পরিশোধে প্রস্তুত ঋণগ্রহীতার জন্য পুনর্গঠন বা নিষ্পত্তির সুযোগ অর্থবহ হতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া, সম্পদ গোপন করা, ভুয়া নথি ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধ না করার প্রমাণ থাকলে একই সুবিধা দেওয়া হলে তা ন্যায়সংগত হবে না। বিশেষ সুবিধা তখন পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার না হয়ে খেলাপির পুরস্কারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের বিষয়টিও তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো ঋণগ্রহীতা যদি ব্যবসার সক্ষমতা বা প্রকল্পের সম্ভাবনার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ, মালিকপক্ষের প্রভাব কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বড় ঋণ পাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে ব্যাংকের স্বাভাবিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের নগদ প্রবাহ, জামানতের প্রকৃত মূল্য, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও বাজার সম্ভাবনার বদলে প্রভাব কাজ করলে সেই ঋণের ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত ব্যাংককেই বহন করতে হয়।
একই সমস্যা দেখা দিতে পারে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে। কাগজে প্রতিষ্ঠান আলাদা হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে থাকলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ আলাদাভাবে বিবেচনা করলে ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা শনাক্ত করা এবং একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।
শুধু ঋণ দেওয়ার সময় যাচাই করলেই হবে না; ঋণ দেওয়ার পরও তার ব্যবহার ও ব্যবসার আর্থিক অবস্থার ওপর নজরদারি প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা ঋণ অনুমোদনের সময় ভালো থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঋণের অর্থ অন্য খাতে চলে যেতে পারে, সম্পদের মূল্য কমে যেতে পারে কিংবা নগদ প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই বড় ঋণের ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, ব্যবসার আয়-ব্যয় কেমন এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কী অবস্থায় রয়েছে—এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এখানে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একটি সমন্বিত ঋণ তথ্যব্যবস্থায় কোনো বড় ঋণগ্রহীতার সব ব্যাংকের দায়, পুনঃতফসিলের সংখ্যা, পুনর্গঠনের ইতিহাস, সুদ মওকুফ, জামানতের বর্তমান মূল্য এবং ঋণের ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য একসঙ্গে পাওয়া গেলে ঝুঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে। কোম্পানির মালিকানা, কর-সংক্রান্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে এসব ডেটা সমন্বয় করা গেলে একই গোষ্ঠীর নামে ছড়িয়ে থাকা ঋণও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তবে ঋণখেলাপির দায় শুধু ঋণগ্রহীতার ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তারা কী ধরনের যাচাই করেছেন, জামানতের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করেছেন এবং ঝুঁকি কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন—এসবও পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে। কোনো ঋণ পরবর্তীতে বড় খেলাপিতে পরিণত হলে স্বাধীন Credit Decision Audit করা যেতে পারে। এতে ঋণ অনুমোদনের সময় কোনো গাফিলতি, অনিয়ম বা অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থাকেও আরও সক্রিয় হতে হবে। কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হলো কি না—শুধু এটিই যথেষ্ট নয়। বরং কোন ঋণ ভবিষ্যতে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তা আগেই শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, তথ্য বিশ্লেষণ, নিয়মিত স্ট্রেস টেস্ট এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এই সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাধারণ ও নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে গিয়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা, জামানত ও কঠোর যাচাইয়ের মুখোমুখি হন। তারা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করার পরও যদি দেখেন বড় ঋণগ্রহীতারা বারবার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা কমতে পারে। এর ফলে সৎ উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাই সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিশেষ সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ করা নয়; বরং তার অপব্যবহার বন্ধ করা। প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া উদ্যোক্তাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা প্রভাবের ভিত্তিতে বাড়তি সুবিধা দেওয়া যাবে না। সুদ মওকুফ, পুনঃতফসিল বা এককালীন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও স্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, লিখিত সিদ্ধান্ত, স্বাধীন যাচাই এবং পরবর্তী নিরীক্ষা থাকা প্রয়োজন। ইচ্ছাকৃত খেলাপির ক্ষেত্রে নতুন ঋণ সুবিধা সীমিত করা এবং আইনগত আদায় প্রক্রিয়াকে কার্যকর করাও জরুরি।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ব্যাংকের অর্থ মূলত জনগণের আমানতের অর্থ। এই অর্থ অনিয়ম, প্রভাব বা দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আটকে গেলে তার ক্ষতি শুধু কোনো একটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমানতকারী, নিয়মিত ঋণগ্রহীতা, বিনিয়োগকারী এবং পুরো অর্থনীতি তার প্রভাব বহন করে। তাই ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ঋণ দেওয়ার সময় প্রভাব নয়, সক্ষমতা বিবেচিত হবে; পুনর্গঠনের সময় সম্পর্ক নয়, ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করা হবে এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ছাড়ের ওপর নির্ভর করে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে টেকসই করতে প্রয়োজন শুধু নতুন নীতিমালা নয়, বরং বিদ্যমান নীতির সমান ও স্বচ্ছ প্রয়োগ। নিয়মের ফাঁকফোকর বন্ধ করে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি বাড়িয়ে এবং ব্যাংকের ভেতর-বাইরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই খেলাপি সংস্কৃতির লাগাম টানা সম্ভব। তখন বিশেষ সুবিধা হবে প্রকৃত সংকটে পড়া ব্যবসাকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যম, আর ইচ্ছাকৃত খেলাপির জন্য দায় এড়ানোর পথ নয়। এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের বর্তমান অগ্রাধিকার

