বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে ধরুন আপনার মাথায় একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় এসেছে। গবেষণাটি সম্পন্ন করতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, প্রয়োজন হতে পারে গবেষণাগারের সুবিধা, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা এমন কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া, যেখানে অন্য গবেষকেরা আপনার কাজ নিয়ে মতামত দেবেন। লক্ষ্য একটাই—মানসম্মত গবেষণা প্রকাশ করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বাড়ানো।
কিন্তু যদি পুরো বছরের গবেষণা বরাদ্দ হয় মাত্র এক লাখ টাকা, তাহলে সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত? গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ বাজেটে দুই হাজারের বেশি শিক্ষকের গবেষণার জন্য মোট ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ একজন শিক্ষকের ভাগে গড়ে এসেছে প্রায় এক লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বরাদ্দ এখনো প্রকাশিত না হলেও জাতীয় বাজেটের প্রস্তাবে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য বরাদ্দ ২০০ কোটি টাকা একত্র করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি কেন্দ্রীয় তহবিলে রাখা হয়েছে।
তবে শুধু তহবিল এক জায়গায় নিয়ে এলেই গবেষণার মান বদলে যাবে না। এতে কেবল অর্থ বিতরণের দায়িত্ব বদলাবে, কিন্তু পুরোনো পদ্ধতিতে অর্থ ভাগ হলে ফলও একই থাকবে। একজন গবেষকের জন্য এক লাখ টাকা দিয়ে হয়তো একটি মাঠসমীক্ষা, একটি সাময়িকীর সদস্যপদ বা সীমিত পরিসরের তথ্য সংগ্রহ সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ও যৌথ গবেষণার জন্য এটি মোটেও যথেষ্ট নয়। ফলে গবেষণার অর্থ বিনিয়োগের পরিবর্তে অনেকটা অতিরিক্ত ভাতার মতো ব্যবহৃত হয়।
লেখকদের মতে, একই অর্থ ভিন্নভাবে ব্যবহার করলে অনেক বেশি ফল পাওয়া সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন, মোট বাজেটের প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে ১০টি সুপরিকল্পিত বিদেশি পিএইচডি অংশীদারত্ব কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি গবেষকের জন্য প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন বছরের টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার খরচ বহন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেক শিক্ষক পিএইচডি সম্পন্ন করার আগেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটিতে যান। এই শিক্ষকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেই এমন কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে বিদেশে পাঠিয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় না থেকে, পুরো সময় তারা যেন বাংলাদেশের নিজ বিভাগ ও শিক্ষকদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। একই সঙ্গে গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার, যৌথ তত্ত্বাবধান এবং নিয়মিত দেশে এসে গবেষণার অগ্রগতি ভাগাভাগির ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
অবশিষ্ট প্রায় ১০ কোটি টাকা দিয়ে চালু করা যেতে পারে এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক অভ্যন্তরীণ গবেষণা অনুদান কর্মসূচি, যার সঙ্গে থাকবে একটি নতুন ডিগ্রি—মাস্টার অব রিসার্চ বা এমরেস।
এমরেস প্রচলিত কোর্সভিত্তিক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নয়, আবার এমফিলও নয়। এটি মূলত গবেষক তৈরির জন্য পরিকল্পিত একটি একবছর মেয়াদি ডিগ্রি। এ সময় শিক্ষার্থীরা সাহিত্য পর্যালোচনা করবেন, গবেষণা অনুদানের প্রস্তাব তৈরি করবেন, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবেন, গবেষণার ফল সম্মেলনে উপস্থাপন করবেন এবং আন্তর্জাতিক মানের সাময়িকীতে প্রকাশের জন্য গবেষণাপত্র জমা দেবেন। ফলে তারা বাস্তব গবেষণার অভিজ্ঞতা নিয়ে বের হতে পারবেন।
বাংলাদেশে এই মডেল বাস্তবায়ন করা হলে পিএইচডিধারী শিক্ষকরা বছরে একটি করে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী ৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদানের জন্য তারা প্রতিযোগিতা করবেন। বাইরের বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৭৫টি প্রকল্প নির্বাচন করা যেতে পারে।
এরপর নির্বাচিত প্রতিটি শিক্ষক উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এমরেস শিক্ষার্থী নির্বাচন করবেন। নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পূর্ণ গবেষণা বৃত্তি, জীবনযাত্রার সহায়তা এবং প্রকল্প পরিচালনার ব্যয় পাবেন। প্রশাসনিক সহায়তা ও গবেষণা প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় বা অনুষদ পর্যায়ে পরিচালিত হবে, আর গবেষণার তত্ত্বাবধান হবে সংশ্লিষ্ট বিভাগে।
এই পদ্ধতিতে মাত্র একটি শিক্ষাবর্ষেই ৭৫টি মৌলিক গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন হতে পারে। একই সঙ্গে ৭৫ জন এমরেস স্নাতক তৈরি হবে, যারা বাস্তব গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। পাশাপাশি ৭৫ জন শিক্ষক প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা প্রস্তাব তৈরি ও বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা লাভ করবেন। পরবর্তীতে এসব শিক্ষার্থীর কেউ এমফিল বা পিএইচডিতে যেতে পারবেন, আবার কেউ সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বৈজ্ঞানিক সংস্থায় গবেষক হিসেবে কাজ করতে পারবেন। সেখানে এমরেস ডিগ্রি গবেষণা সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লেখকদের মতে, এখানে যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, তা একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ধারণাগত উদাহরণ মাত্র। নির্দিষ্ট বাজেট পরিকল্পনা নয়, বরং কীভাবে একই অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই বোঝানো হয়েছে।
এই মডেল দেশের যেকোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োগ করা সম্ভব। মূল ধারণা হলো, সীমিতসংখ্যক মানসম্মত গবেষণায় বড় বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ গবেষণার ফল বাড়ায়। বিপরীতে হাজারো শিক্ষকের মধ্যে সমানভাবে অর্থ ভাগ করে দিলে উল্লেখযোগ্য গবেষণা উৎপাদন সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় হয়তো এখনই আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই। বরং বিদ্যমান অর্থ এমনভাবে ব্যয় করতে হবে, যাতে তার বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল পাওয়া যায়। ইউজিসির অধীনে নতুন কেন্দ্রীয় গবেষণা তহবিল সেই পরিবর্তনের সূচনা করবে, নাকি শুধু অর্থ রাখার ঠিকানাই বদলাবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
লেখক:
মো. হক: যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের জলভূতত্ত্ব ও পরিবেশগত ভূবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক।
আশরাফ দেওয়ান: অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথিবী ও গ্রহবিজ্ঞান স্কুলের গবেষণা পরিচালক।

