বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে একটি নির্মম সত্য বেরিয়ে আসে—কোনো ব্যাংকের সংকটের মূল কারণ সাধারণত তাৎক্ষণিক তারল্য সংকট নয়; বরং দীর্ঘদিনের সঞ্চিত খেলাপি ঋণ, দুর্বল ঋণ প্রশাসন, আইনি জটিলতা এবং রিকভারি কার্যক্রমের চরম অদক্ষতা। গত দুই দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—উভয় ধরনের ব্যাংকই খেলাপি ঋণ আদায়ে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিল, মামলা, বারবার সময় বৃদ্ধি বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও বাস্তবে নগদ অর্থ আদায়ের হার আশানুরূপ হয়নি।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা ফুটে ওঠে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা (Tk 6.44 trillion), যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩%। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক রেকর্ড। এই বিশাল অংকের অতল গহ্বর থেকে ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এসে সম্পূর্ণ নতুন এবং আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। আর এখানেই সামনে আসে একজন প্রধান রিকভারি ও রেজোলিউশন কর্মকর্তা (Chief Recovery & Resolution Officer – CRRO)-এর অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা।
সিইও বনাম সিআরআরও: দুই ভিন্ন মেরুর লড়াই
বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ আদায়ের চূড়ান্ত দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকে। কিন্তু একজন সিইও-কে একই সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণ, আমানত সংগ্রহ, তারল্য ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়, শাখা পরিচালনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভিযোজনের মতো বহুমুখী ও জটিল দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে, খেলাপি ঋণ আদায়ের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর প্রক্রিয়া প্রায়শই কৌশলগত অগ্রাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা একটি সাধারণ প্রশাসনিক রুটিন কার্যক্রমে পরিণত হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে বড় বড় ব্যাংক পুনর্গঠন কর্মসূচিতে সবসময়ই বা Special Asset Resolution Platform গঠন করা হয় এবং তা পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ পৃথক নেতৃত্ব নিয়োগ দেওয়া হয়। কারণ—ব্যবসা পরিচালনা করা এবং খেলাপি ঋণ উদ্ধার করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতা ও মানসিকতার কাজ। একজন সিইও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখান, নতুন ব্যবসা গড়ে তোলেন; আর একজন CRRO অতীতের ক্ষত মেরামত করেন, হারিয়ে যাওয়া ক্ষতি পুনরুদ্ধার করেন। অধিকাংশ ব্যাংকগুলো এখানেই কৌশলগত ভুল করে। র্বোড একজনকে দিয়ে দুটো কাজ চালাতে চান। কৌশলগতভাবে ভুল করে।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO)বেসিক কাজ হলো – আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, নতুন ব্যবসা ও মুনাফা সৃষ্টি, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও দৈনিক ব্যাংক পরিচালনা করা। এসবের জন্য প্রয়োজন বিসনেস মানসিকতা। প্রধান রিকভারি ও রেজোলিউশন কর্মকর্তা, বেসিক কাজ হলো- সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ আইনি লড়াই করে নগদ পুনরুদ্ধার, খেলাপি ও দায়ীদের জবাবদিহিতায় আনা, অচল ও বিশেষ সম্পদ পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তি প্রভৃতি । এ ধরনের কাজের জন্য প্রয়োজন হয় কঠোর কম্প্লায়েন্স ধরনের মানসিকতা। সুধু রিকোভারির প্রতি ফোকাস দিয়ে ব্যাবসাকে সংকুচিত করলে পরিনাম ভাল হয় না। ডিপোজিটরদের আমাতন ফেরত দিতে হলেও ব্যাবসা করে ফেরত দিতে হবে।
কেন প্রথাগত আইনি বিভাগ খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ?
আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোতে একটি বড় সাধারণ সমস্যা হলো—ঋণ খেলাপি হলে মামলা করা হয় না সঠিক সময়ে। যাওবা মামলা করা হয় তা পরবর্তিতে মনিটর করা হয় না। পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোতে মারাত্মক ঘাটতি থাকে। যেমন:
- ঋণগ্রহীতা বা জামিনদারের প্রকৃত সম্পদ অনুসন্ধান না করা।
- পর্দার আড়ালের প্রভাবশালী অপরাধীদের নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে না পারা।
- বেনামি বা বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ চিহ্নিতকরণে উদাসীনতা। উক্ত সম্পত্তি ফেরত আনার বিষয়ে কোন প্রকার পদক্ষেপ গ্রহন না করা।
- সমন্বিত নিষ্পত্তি কৌশল (Settlement Strategy) এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ দ্রুত বিক্রির কার্যকর উদ্যোগের অভাব।
ফলে বছরের পর বছর মামলা চললেও ব্যাংকের লকারে জমা পড়ে কেবল নথিপত্র, নগদ টাকার দেখা মেলে না। একজন দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ CRRO এই পুরো ভেঙে পড়া প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত এবং শক্তিশালী “রিকভারি ইঞ্জিন”-এ রূপ দিতে পারেন। তাঁর অধীনে থাকবে কালেকশন বিভাগ, আইন বিভাগ, ফরেনসিক তদন্ত বিভাগ, সম্পদ উদ্ধার ফোর্স এবং বিশেষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ—অর্থাৎ ঋণ পুন-তফসিল/পুনর্গঠনের মতো বিশেষায়িত দল।
সংকটাপন্ন ও পুনর্গঠিত ব্যাংকের জন্য CRRO-এর গুরুত্ব:
বিশেষ করে সংকটে পড়া বা নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে চাওয়া ব্যাংকগুলোর (যেমন পুনর্গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকসমূহ) ক্ষেত্রে এই পদের গুরুত্ব অপরিসীম। এসব ব্যাংকের সিইও-র প্রধান মনোযোগ হওয়া উচিত গ্রাহকের আস্থা ফেরানো, নতুন আমানত সংগ্রহ এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা। অন্যদিকে, CRRO-এর একমাত্র এবং অবিচল লক্ষ্য হবে—যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ পুনরুদ্ধার করা এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিকে পুনরায় শক্তিশালী করা।
বাস্তবতা হলো, পুনর্গঠিত বা সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল, তা কত দ্রুত নতুন ঋণ বিতরণ করা যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে—কত কার্যকরভাবে পুরোনো ও আটকা পড়া খেলাপি ঋণ উদ্ধার করা যাচ্ছে তার ওপর। তাই ব্যাংকের নেতৃত্ব কাঠামোতে CRRO-কে কেবল একটি সাধারণ বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁকে সিইও-র পরবর্তী অন্যতম শীর্ষ ও ক্ষমতাশালী নির্বাহী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
জনগণের আমানত সুরক্ষা, হারিয়ে যাওয়া আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের সফল পুনরুত্থান নিশ্চিত করতে হলে প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকগুলোতে এখনই একটি শক্তিশালী, সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং জবাবদিহিমূলক CRRO পদ সৃষ্টি করা এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করা সময়ের সবচেয়ে বড় ও অপরিহার্য দাবি। এই একটি সাহসী পদক্ষেপই পারে ঋণের মহাসংকটে থাকা দেশের অর্থনীতিকে আবার সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনতে।
- লেখক: কাজী মাহমুদুর রহমানি: চিফ লিগ্যাল অফিসার, ইউনিয়ন ব্যাংক

