সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভয়াবহ দাম্পত্য সহিংসতার ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সংবাদ অনুযায়ী, পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে এক স্ত্রী তাঁর স্বামীর যৌনাঙ্গ কেটে গুরুতরভাবে আহত করেছেন। ঘটনার সত্যতা, পেছনের কারণ কিংবা দাম্পত্য জীবনে কী ধরনের বিরোধ ছিল-এসব নিয়ে তদন্ত চলতে পারে কিন্তু যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক, তা হলো এই নিষ্ঠুর ঘটনার প্রতি সমাজের একটি অংশের প্রতিক্রিয়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, অনেকে ঘটনাটিকে হাস্যরসের বিষয় হিসেবে নিয়েছেন। কেউ “হাহা” প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, কেউ মিম তৈরি করেছেন, আবার কেউ কেউ কোনো প্রমাণ ছাড়াই ধরে নিয়েছেন যে স্বামী নিশ্চয়ই পরকীয়ায় জড়িত ছিলেন এবং সে কারণেই তিনি এমন “শাস্তি” পাওয়ার যোগ্য।
এখানেই আমাদের সামাজিক বিবেকের বড় সংকটটি প্রকাশ পায়। কোনো ব্যক্তি পরকীয়ায় জড়িত থাকলেও তাঁর শরীরের অঙ্গ কেটে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। স্ত্রী, স্বামী, প্রেমিক, প্রেমিকা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য-কেউ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে পারেন না। অভিযোগ সত্য হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, বিবাহবিচ্ছেদ করা যেতে পারে, পারিবারিক ও সামাজিক সমাধান খোঁজা যেতে পারে। কিন্তু শারীরিক অঙ্গহানি কখনো বিচার হতে পারে না। এটি নিছক প্রতিশোধ এবং গুরুতর অপরাধ।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। যদি ঘটনার শিকার একজন নারী হতেন? যদি কোনো স্বামী দাম্পত্য কলহের জেরে স্ত্রীর শরীরের কোনো সংবেদনশীল অঙ্গ কেটে দিতেন, তাহলে কি সমাজ একইভাবে হাসত? তখন কি কেউ বলতেন, “উচিত বিচার হয়েছে”? নাকি ঘটনাটিকে নারী নির্যাতন, বর্বরতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতা হিসেবে তুলে ধরা হতো?
বাস্তবতা হলো, নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ যতটা সংবেদনশীল, পুরুষ নির্যাতনের ক্ষেত্রে অনেক সময় ততটাই উদাসীন। পুরুষ কাঁদলে তাঁকে দুর্বল বলা হয়, স্ত্রী কর্তৃক নির্যাতিত হলে উপহাস করা হয়, আর যৌন বা শারীরিক অক্ষমতার শিকার হলে সেটিকে হাসির খোরাক বানানো হয়। এই মনোভাব শুধু অন্যায় নয়, বরং বিপজ্জনকও।
মানবাধিকার কখনো লিঙ্গনির্ভর হতে পারে না। একজন নারী যেমন নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকারী, একজন পুরুষও ঠিক একই অধিকার রাখেন। ভুক্তভোগীর লিঙ্গ দেখে সহানুভূতির মাত্রা বদলে গেলে সেটি ন্যায়বিচার নয়; সেটি পক্ষপাত।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিচার। কোনো সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর অনেকেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য না জেনেই রায় দিয়ে দেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়া হয়। বিশেষ করে দাম্পত্য বিরোধের ক্ষেত্রে একপক্ষের বক্তব্য শুনেই অন্যপক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। পরকীয়ার অভিযোগ সত্য কি না, সেটি তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়। কিন্তু অনুমানের ভিত্তিতে একজন আহত ব্যক্তির ওপর সংঘটিত নিষ্ঠুরতাকে সমর্থন করা কোনো সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে না।
আরও দুঃখজনক হলো, অনেকে পুরুষের যৌনাঙ্গ নিয়ে এমনভাবে কৌতুক করেন যেন এটি তাঁর শরীরের অংশ নয়, তাঁর মানবিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত নয়। অথচ এ ধরনের আঘাত একজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, প্রজননক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান এবং পুরো ভবিষ্যৎ জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
একজন নারী ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন বা অঙ্গহানির শিকার হলে যেমন হাসাহাসি করা অমানবিক, একজন পুরুষ একই ধরনের সহিংসতার শিকার হলেও হাসাহাসি করা সমানভাবে অমানবিক। সহিংসতার কোনো লিঙ্গ নেই; অপরাধেরও কোনো গ্রহণযোগ্য অজুহাত নেই।
তবে এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুরো নারীসমাজকে দোষারোপ করাও সঠিক নয়। কিছু মানুষের অসংবেদনশীল মন্তব্যের দায় সব নারীর ওপর চাপানো অন্যায়। একইভাবে কিছু পুরুষের অপরাধের জন্য পুরো পুরুষজাতিকে দায়ী করাও যৌক্তিক নয়। আমাদের বিরোধিতা করতে হবে অপরাধীর, কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের নয়। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো-সে দুর্বল ও আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ভুক্তভোগী নারী না পুরুষ তা বিবেচনা করে না। সে অভিযোগের বিচার আদালতের ওপর ছেড়ে দেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিদ্রূপের ওপর নয়।
আজ প্রয়োজন একটি স্পষ্ট সামাজিক অবস্থান: দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, বিশ্বাসঘাতকতা বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ-কোনোটিই অঙ্গহানি বা শারীরিক নির্যাতনের বৈধতা দেয় না। নারী হোক বা পুরুষ, প্রত্যেক ভুক্তভোগীর প্রতি সমান সহমর্মিতা থাকতে হবে এবং প্রত্যেক অপরাধীর বিরুদ্ধে সমান আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে আমরা ন্যায়বিচারের কথা বললেও বাস্তবে কেবল নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিচার চাইব। আর সেটি বিচার নয়, পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিশোধমাত্র।
- লেখক: মো: হায়দার তানভীরুজ্জামান: এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

