২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।
তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ দুটি মূলত দেশীয় ও বৈশ্বিক। প্রথমত দেশের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে, যা ব্যবসা পরিচালনা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি তৈরি করছে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এই অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা, পণ্যের মূল্য এবং প্রতিযোগিতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তিনি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে এ মন্তব্য করেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সার্বিক পরিস্থিতি কেমন হতে পারে?
চলতি অর্থবছর অনেকটাই বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য কোথাও নতুন করে ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর। তবে বিশ্ব পরিস্থিতি যদি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে চলতি বছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
তবে বছরের শেষ দিকে নতুন চাপ আসতে পারে। বিশেষ করে ভারত যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধা কার্যকরভাবে পেতে শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। তাই এখন থেকেই সেই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
এ অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের অভ্যন্তরীণ ও ব্যুরোক্রেটিক (আমলাতান্ত্রিক) বাধা। দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা। একজন রপ্তানিকারকের প্রতিনিয়ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হয়। কিন্তু পদে পদে প্রশাসনিক জটিলতা, ধীরগতি ও অপ্রয়োজনীয় বাধার কারণে ব্যবসার গতি ব্যাহত হয়। এসব সমস্যা দূর না করলে শুধু বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব হবে না।
রপ্তানি খাতের গতি বাড়াতে সরকারের কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
প্রথমত, ব্যবসা পরিচালনায় ব্যুরোক্রেটিক জটিলতা কমাতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর সেবা আরও দ্রুত, সমন্বিত ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। বিশেষ করে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো সহজ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, সৎ ও নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা থাকা উচিত। বর্তমানে খেলাপি ঋণগ্রহীতারা নানা ধরনের পুনঃতফসিল ও ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন, অথচ যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন তাদের জন্য তেমন কোনো স্বীকৃতি বা সুবিধা নেই। এতে ভালো উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন। তাই ভালো উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার মতো নীতিও প্রয়োজন।
জ্বালানি সংকটকে আপনি কতটা বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন?
জ্বালানি সমস্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি মনে করি এটি সাময়িক সমস্যা ও সময়ের সঙ্গে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমার কাছে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বাধা দূর করা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা। এই দুটি বিষয় মোকাবিলা করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারবে। সরকার নতুন অর্থবছরের জন্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা ভাবছে। এ ধরনের লক্ষ্য কীভাবে দেখছেন?
রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ অবশ্যই বাস্তবতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। শুধু আগের বছরের প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে একটি বড় সংখ্যা নির্ধারণ করলেই হবে না। সরকার কী সূত্র বা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করছে, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। বৈশ্বিক চাহিদা, বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবণতা ও প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান— এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে ফাস্ট ফ্যাশন নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবেশগত কারণে অনেক দেশে ফাস্ট ফ্যাশনের ব্যবহার সীমিত করার বিষয়টি সামনে আসছে। ফলে শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধির আশা করলেই হবে না, বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

