প্রায়ই শোনা যায়—বাংলাদেশ নাকি কখনো চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, কখনো পাকিস্তানের, আবার কখনো ভারতের প্রভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন আলোচনায় এমন মন্তব্য নিয়মিতই চোখে পড়ে। কিন্তু এসব কথা শুনতে ভালো লাগে না। বরং দেশের প্রতি মমত্ববোধ থাকলে এমন মন্তব্য অনেকের কাছেই অপমানজনক মনে হতে পারে।
এসব বিশ্লেষণ বা মন্তব্য দেখলে একটি প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই নিজেদের দেশকে নিরপেক্ষভাবে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি? নাকি রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশের পরিচয়কেই অন্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?
আমার কাছে বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশই। কোনো দেশের ছায়া বা পরিচয়ে তাকে দেখতে ইচ্ছা করে না। এই বিশ্বাস থেকেই দেশের প্রতি গর্ববোধ জন্মায়। অবশ্য একটি দেশে নানা মত, নানা চিন্তা ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকবেই। সব মতের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব নয়। যদি প্রতিটি বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নিতে হয়, তাহলে সমাজে শান্তি বা পারস্পরিক শ্রদ্ধা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
মানুষের মন যেন একটি রান্নাঘরের মতো। সেখানে যে উপকরণ জমা হয়, সেই স্বাদই পরে কথাবার্তা ও মন্তব্যে প্রকাশ পায়। অনেকের মানসিক রান্নাঘরে যেন সারাবছর শুধু নেতিবাচকতার ঝোলই রান্না হয়। সেখানে ইতিবাচকতার কোনো উপকরণ থাকে না, থাকে শুধু তীব্র সমালোচনার ঝাঁজ।
নিজের দেশের চরিত্র সম্পর্কে হঠাৎ করে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত টেনে ফেললে হয়তো কেউ ব্যক্তিগত তৃপ্তি পেতে পারেন। কিন্তু যারা দেশকে হৃদয়ের অংশ মনে করেন, তাদের কাছে এমন মন্তব্য স্বস্তির নয়। বরং তা কষ্ট, হতাশা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়।
একটি নদীর যেমন দুটি তীর থাকে, তেমনি সমাজেও নানা মত ও অবস্থান থাকবে। কিন্তু যারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেন, তারা প্রায়ই এমনভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন যেন সত্যের একটিই দিক রয়েছে। বাস্তবে কোনো বিষয়ই এত সরল নয়।
যখন কোনো ব্যক্তি দেশের চেয়ে দলকে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গিও স্বাভাবিকভাবেই একপেশে হয়ে ওঠে। দেশের প্রতি ভালোবাসা যদি সীমিত হয়ে যায় আর দলীয় আনুগত্যই প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জাতীয় স্বার্থের মূল্যায়নও সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের আগে দেশের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। এ নিয়ে দেশের কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু আমরা যখন নিজেরাই বাংলাদেশকে কখনো অন্য দেশের দিকে ঝুঁকে পড়া রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিই, তখন যেন দেশ নীরবে আমাদের দিকেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কবে সত্যিকার অর্থে দেশের মানুষ হয়ে উঠব?
এই দেশের জন্য ভাষার আন্দোলনে মানুষ প্রাণ দিয়েছে। স্বাধীনতার জন্য অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছে। সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ কোনো ধার করা পরিচয়ের রাষ্ট্র নয়। এটি আমাদের আত্মত্যাগের অর্জন।
যেদিন আমরা দল, মত কিংবা বিদেশি প্রভাবের চশমা খুলে বাংলাদেশকে শুধুই নিজের দেশ হিসেবে দেখতে শিখব, সেদিন হয়তো দেশকে নিয়ে এত অভিযোগ, এত বিভাজন আর এত সন্দেহও থাকবে না। দেশের প্রতি ভালোবাসাই তখন হবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
- লেখক: আফজাল হোসেন: জনপ্রিয় অভিনেতা ও কথাসাহিত্যিক(এই পোস্টটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

