সম্প্রতি পল্লবীর শিশুধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড এবং এর আগে মাগুরায় একই ধরনের নৃশংস ঘটনার পর জনমনে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ দেখা গেছে। এই ক্ষোভের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া শুধু ফাঁসির দাবিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দ্রুত ও প্রকাশ্যে শাস্তি কার্যকরের দাবিও জোরালোভাবে ওঠে। পল্লবীর ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে বিচারিক রায় হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে কিছু গভীর ও কাঠামোগত প্রশ্ন সামনে এসেছে, যা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার যেখানে মাত্র ৩ শতাংশ, সেখানে বিচারহীনতাই যে জনক্ষোভের প্রধান উৎস—তা স্পষ্ট। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে ।
যখন বছরের পর বছর অপরাধীরা এই কাঠামোগত দুর্বলতা এবং কখনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে পার পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি হয়। এই অনাস্থা কখনো কঠোর শাস্তির দাবিতে প্রকাশ পায়, আবার কখনো তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতায় রূপ নেয়। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ‘প্রকাশ্যে শাস্তি’ চাওয়ার প্রবণতা এবং এ ধরনের হামলা—উভয়ই বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিফলন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই গণক্ষোভকে কেন্দ্র করে সমাজের সচেতন ও দায়িত্বশীল অংশ থেকেও এমন কিছু দাবি উঠছে, যা বিচারহীনতার সমাধান না হয়ে বরং অবিচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কেউ প্রকাশ্যে শাস্তি বা ফাঁসির দাবি তুলছেন, কেউ দোররা মারার কথা বলছেন, কেউ আবার অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী থাকার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। এমনকি কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, স্বীকারোক্তি থাকলে কেন ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রকাশ্য শাস্তির বিরোধিতাকে কিছু ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘ধর্মবিরোধিতা’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। যাঁরা এসব বক্তব্য দিচ্ছেন, তাঁরা সমাজ ও রাষ্ট্রের মত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এমনকি সরকারপ্রধানও এক জনসমাবেশে বলেছেন, পল্লবীর শিশুহত্যার ঘটনায় এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং সেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
এই পুরো প্রবণতা বিচারিক প্রক্রিয়া ও জনপরিসরের জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত বহন করছে। দার্শনিক হানা আরেন্ড ইউরোপে সর্বাত্মকবাদের উত্থান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ফ্রান্সের দ্রেফাস ঘটনাকে (১৮৯৪ সালের রাজনৈতিক ও বিচারিক কেলেঙ্কারি) গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তিনি দেখিয়েছেন, তখন অস্থির জনতা যেমন কঠোর ভাষায় কথা বলছিল, তেমনি কিছু বুদ্ধিজীবীও সেই ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। প্রচলিত ব্যবস্থা ও নিয়মের প্রতি ক্ষোভ থেকে তারা জনতার কট্টর অবস্থানকে ‘বিশুদ্ধতা’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
আরেন্ডের মতে, যখন সমাজের দায়িত্বশীল অংশও বিক্ষুব্ধ জনতার ভাষা বা জনতুষ্টিবাদী নেতাদের অনুকরণ শুরু করে, তখন তা এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পথ তৈরি করে। বর্তমানে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সমাধান না করে বরং পুরো বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনক্ষোভকে ব্যবহার করে অবিচার প্রতিষ্ঠার নজির বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। তাই বিচার দাবি করার সময়ও সতর্ক থাকা জরুরি। দ্রুত বিচার যেমন ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নয়, তেমনি বিলম্বিত বিচারও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে। সমাধান হিসেবে বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া কোনো সহজ পথ নেই।
বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যায়, জনক্ষোভের চাপের মুখে রাজনৈতিক নেতারা দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। পল্লবীর ঘটনায় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত রায়ও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ওই মাসেই ৫৯ জন কন্যাশিশুসহ মোট ৭২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। প্রায় প্রতি মাসেই এই সংখ্যায় সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। তাহলে একটি ঘটনার দ্রুত বিচার সম্ভব হলে অন্য ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে একই গতি কেন দেখা যায় না?
এখানেই ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’র প্রভাব স্পষ্ট হয়। কিছু ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো আবার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অর্থনৈতিক কনটেন্ট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে যে ঘটনাগুলো ভাইরাল হয়, সেগুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক মনোযোগ দ্রুত তৈরি হয়।
এই প্রবণতাকে কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখতে পারেন, কারণ এটি রাষ্ট্র ও সরকারকে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। দেখা যায়, শুধুমাত্র যে ঘটনাগুলো আলোচনায় আসে, সেগুলোরই দ্রুত বিচার বা প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়।
পল্লবী বা মাগুরার ঘটনা আলোচিত হয়েছে বলেই দ্রুত প্রতিক্রিয়া এসেছে, কিন্তু একই ধরনের অনেক ঘটনা আলোচনায় না আসায় তদন্ত থেমে গেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা আলোচনায় না এলে তদন্ত কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। যদি বিচার পাওয়ার একমাত্র শর্ত হয় ‘আলোচিত হওয়া’, তাহলে নাগরিক হিসেবে এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে দণ্ডমূলক জনতুষ্টিবাদের একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে জন্ম নেওয়া জনক্ষোভ যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন রাজনৈতিক মহল সেই ক্ষোভ প্রশমনে কঠোর শাস্তির প্রতিযোগিতায় নামে।
অনেক সময় বলা হয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং বিদ্যমান আইন যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং নিরাপত্তাহীনতার ভয়—এই দুই আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো অপরাধ দমনের চেয়ে বেশি করে কঠোর শাস্তি প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে কঠোর শাস্তির দাবি ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক রূপ নিচ্ছে। এমনকি বিচারব্যবস্থার মৌলিক প্রক্রিয়াগুলোকেও উপেক্ষা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফার্নান্দো ক্যাসাল বলেছেন, জনতুষ্টিবাদ সংকট চিহ্নিত করতে পারলেও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান দিতে পারে না—বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতাকে সামনে আনে।
এটি একটি দুষ্টচক্র। বিচারহীনতার কাঠামোগত কারণগুলো সমাধান না হয়ে টিকে থাকে। ফলে নাগরিকদের অনাস্থা বাড়ে। আবার সেই অনাস্থার বিস্ফোরণ ঘটলে রাজনৈতিক মহল দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সাময়িক ‘নজির’ স্থাপন করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিবর্তে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দ্রুত সিদ্ধান্তই সামনে আসে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাঠামোগত কাজগুলো প্রায় অনুপস্থিত থেকে যায়। উল্লেখ্য, অতীতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পক্ষে জনসম্মতি তৈরির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করেছে।
সব মিলিয়ে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনক্ষোভকে ব্যবহার করে অবিচার প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই বিচার দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা প্রকাশের ধরন ও দিকনির্দেশনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত সমাধান কোনো সহজ পথ নয়; বরং বিচারব্যবস্থার গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্যেই তার উত্তর নিহিত।
- সহুল আহমদ: লেখক ও গবেষক

