বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি মৌসুমি সংক্রামক রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত রাজধানীকেন্দ্রিক বর্ষাকালের সমস্যা হিসেবে ডেঙ্গুকে দেখা হলেও বর্তমান পরিস্থিতি সেই চিত্রকে বদলে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতার কারণে এখন বছরের বিভিন্ন সময় দেশের নানা অঞ্চলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, চিকিৎসাসেবার ওপর তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত চাপ এবং অসংখ্য পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক বোঝা।
ডেঙ্গু নিয়ে জনপরিসরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান ঘিরে। তবে এই রোগের আর্থিক প্রভাব নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা দেখা যায়। অথচ একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় থেকে শুরু করে কর্মক্ষমতা হারানো, পারিবারিক আয় কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বাধা—সব মিলিয়ে ডেঙ্গুর প্রভাব ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রোগের ক্ষতি শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হলে তাঁর উৎপাদনশীলতা কমে যায়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যকেও পরিচর্যার জন্য কাজ থেকে বিরতি নিতে হয়। এর ফলে ব্যক্তি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্র—সব পর্যায়েই অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি হয়।
অর্থনীতির ভাষায় এই সামগ্রিক ক্ষতিকে বলা হয় ‘কস্ট অব ইলনেস (Cost of Illness)’। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ ব্যয়ের আওতায় থাকে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, হাসপাতালে ভর্তি, যাতায়াত এবং রোগীর পরিচর্যার খরচ। অন্যদিকে পরোক্ষ ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে কর্মঘণ্টা হারানো, উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, পরিবারের সদস্যদের কর্মবিরতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত ক্ষতি।
ফলে ডেঙ্গুকে শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি রোগটির অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলাও সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য বলছে, গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। প্রতি বছর আনুমানিক ১০ থেকে ৪০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও বিপুলসংখ্যক সংক্রমণ আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় রোগটির ভৌগোলিক পরিধিও দ্রুত বাড়ছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখনো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হলেও লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও নিয়মিত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও ডেঙ্গুর বিস্তার ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে রোগটি বড় পরিসরে আলোচনায় এলেও ২০০০ সালে প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এরপর ২০১৯ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ধারাবাহিক সংক্রমণ স্পষ্ট করে দিয়েছে, ডেঙ্গু আর মৌসুমি সংকট নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর বাইরের জেলাগুলোতে রোগটির দ্রুত বিস্তার প্রমাণ করছে যে ডেঙ্গুর ভৌগোলিক চরিত্র বদলে গেছে। ফলে এটি এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো রোগী ও তাঁর পরিবারকে নিজস্ব অর্থ থেকেই বহন করতে হয়। সরকারি হাসপাতাল থাকলেও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, অতিরিক্ত চিকিৎসাসেবা কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে অনেক পরিবারকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। ডেঙ্গুর মতো হঠাৎ দেখা দেওয়া রোগের ক্ষেত্রে এই ব্যয় অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
একজন সাধারণ ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাতেই চিকিৎসকের ফি, এনএস১ পরীক্ষা, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, নিয়মিত প্লাটিলেট পর্যবেক্ষণ, ওষুধ, পুষ্টিকর খাদ্য এবং যাতায়াত খরচ মিলিয়ে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তখন ব্যয়ের পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বা জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অনেক পরিবারের জন্য সেই ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বা রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভর করে না। সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীও টেকসই অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। যখন একটি সমাজ বারবার প্রতিরোধযোগ্য রোগের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়, তখন উৎপাদনশীলতা কমে যায়, সঞ্চয়ের সক্ষমতা হ্রাস পায়, মানবসম্পদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। ডেঙ্গুর প্রভাবও ঠিক এমনই—এটি শুধু হাসপাতালের শয্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত পৌঁছে যায় একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, শিশুর শিক্ষাজীবন, শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির গভীর স্তর পর্যন্ত।
তবে ডেঙ্গুর অর্থনৈতিক ক্ষতি চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় যখন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তি আক্রান্ত হন। একজন রিকশাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পোশাকশ্রমিক বা পরিবহনশ্রমিক যদি টানা এক থেকে দুই সপ্তাহ কাজ করতে না পারেন, তাহলে তাঁর পরিবারের নিয়মিত আয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় বাড়তে থাকে। ফলে পরিবারকে একসঙ্গে দুটি চাপ সামলাতে হয়—একদিকে আয় কমে যায়, অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে যায়। অর্থনীতির ভাষায় এটিই একটি ‘দ্বৈত অর্থনৈতিক আঘাত’, যা স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো, দেশের ৮৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এই বিশাল কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশেরই বেতনসহ অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নেই। ফলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া তাদের জন্য শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, বরং নতুন করে আর্থিক দুর্দশায় পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। মাসিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল অধিকাংশ পরিবারের সঞ্চয় সীমিত। হঠাৎ করে চিকিৎসার জন্য ৩০ হাজার, ৫০ হাজার কিংবা এক লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে হলে অনেককেই সঞ্চয় ভাঙতে হয়। কেউ ঋণ নেন, কেউ গয়না বিক্রি করেন, আবার কেউ সন্তানের শিক্ষা বা ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা অর্থ ব্যবহার করতে বাধ্য হন। ফলে একটি রোগের ধাক্কায় বহু বছরের আর্থিক পরিকল্পনা মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে পারে।
ডেঙ্গুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত প্রভাব হলো উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া। অনেক রোগী জ্বর থেকে সুস্থ হলেও কয়েক সপ্তাহ ধরে দুর্বলতায় ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে পোস্ট-ভাইরাল ফ্যাটিগ বলা হয়। ফলে কর্মস্থলে ফিরে এলেও আগের মতো দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হয় না। শিল্পকারখানা, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি দপ্তর—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দেখা যায়। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকে প্রেজেন্টিইজম (Presenteeism) বলা হয়, অর্থাৎ কর্মস্থলে উপস্থিত থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে না পারা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা এবং বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংক্রামক রোগের কারণে শ্রমঘণ্টা কমে গেলে জাতীয় উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে এই প্রভাব আরও বেশি স্পষ্ট। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, নির্মাণ, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তানির্ভর ব্যবসায় মানবশ্রমই প্রধান শক্তি। তাই ডেঙ্গুর সময়ে যদি বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, কর্মচারী বা উদ্যোক্তা সাময়িকভাবে কর্মক্ষমতা হারান, তাহলে উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং সেবার ধারাবাহিকতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
শিক্ষা খাতও এই সংকটের বাইরে নয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকতে হয়। এতে পাঠদানে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটে এবং মানসিক চাপ তৈরি হয়। একইভাবে শিক্ষক আক্রান্ত হলে শিক্ষা কার্যক্রমও বিঘ্নিত হয়। এসব ক্ষতির তাৎক্ষণিক অর্থমূল্য নির্ধারণ করা কঠিন হলেও দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়লে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। একই সময়ে অন্যান্য রোগের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে ডেঙ্গু শুধু নতুন ব্যয়ের কারণই নয়, বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। আগে ডেঙ্গুকে মূলত বর্ষাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন বছরের বিভিন্ন সময়েই সংক্রমণের ঘটনা ঘটছে। ফলে রোগটির অর্থনৈতিক প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর নিয়মিত নজরদারি, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে সমন্বিত করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং জনগণের অংশগ্রহণে পরিচালিত কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশেও ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। বিষয়টিকে শুধু সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। প্রয়োজন সারা বছরব্যাপী সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। এর আওতায় প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত লার্ভা জরিপ, নির্মাণাধীন ভবনে কঠোর নজরদারি, জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ডেঙ্গুর অর্থনৈতিক প্রভাব কমাতে শুধু রোগী চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়; কর্মক্ষেত্রেও প্রয়োজন স্বাস্থ্যবান্ধব নীতি। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রান্ত কর্মীদের জন্য নমনীয় ছুটির ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসহায়তা এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমার আওতা সম্প্রসারণ করা গেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিষয় তুলে ধরছেন—প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ব্যয় করা অর্থ চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি এমন একটি বিনিয়োগ, যার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল দীর্ঘমেয়াদে বহুগুণে ফিরে আসে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধকে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের ক্ষতি কমানোর কার্যকর বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সুস্থ, কর্মক্ষম ও নিরাপদ জনগোষ্ঠীই একটি শক্তিশালী অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি।
তবে এই লড়াইয়ে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব, অব্যবহৃত পাত্র কিংবা অল্প সময়ের জন্য জমে থাকা পানিও এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত স্থান হয়ে উঠতে পারে। তাই ব্যক্তিগত অসতর্কতা শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজের জন্য অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সচেতন নাগরিক আচরণই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর উপায়।
একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু বড় অবকাঠামো, বৈদেশিক বিনিয়োগ কিংবা রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। জনগণের সুস্বাস্থ্যও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। যখন একটি সমাজ বারবার প্রতিরোধযোগ্য রোগের মুখোমুখি হয়, তখন উৎপাদনশীলতা কমে যায়, সঞ্চয়ের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে পড়ে। ডেঙ্গুর প্রভাবও ঠিক এমনই—এর ক্ষতি হাসপাতালের সীমানা ছাড়িয়ে একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
তাই ডেঙ্গুকে আর কেবল বর্ষাকালের একটি স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। আজ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় যে বিনিয়োগ করা হবে, তা ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যয় কমাবে, কর্মঘণ্টার ক্ষতি হ্রাস করবে, উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং অসংখ্য পরিবারকে আর্থিক সংকট ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেবে। অর্থাৎ ডেঙ্গু মোকাবিলার কার্যকর উদ্যোগ শুধু মানুষের জীবন রক্ষার জন্যই নয়, দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই রাখার জন্যও সমানভাবে জরুরি। সূত্র: জাগো নিউজ

