ব্যাংকের হিসাবের খাতায় অঙ্ক মিলে গেছে, ফাইলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও আছে, অনুমোদনের স্বাক্ষরও রয়েছে; কিন্তু একটু গভীরে গেলেই দেখা গেল, যে পণ্যের কেনাবেচার কথা বলে ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, সেই পণ্যের অস্তিত্বই নেই।
কোথাও পণ্য আছে, কিন্তু বিলের মূল্য বাস্তবের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। কোথাও ক্রেতা-বিক্রেতা দুই প্রতিষ্ঠানই আছে, কিন্তু তাদের লেনদেনের পেছনে প্রকৃত ব্যবসা নেই। আবার কোথাও একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ ঘুরিয়ে এমন একটি বাণিজ্যিক চিত্র তৈরি করা হয়েছে, যা কাগজে বৈধ হলেও বাস্তবে অর্থ বের করে নেওয়ার কৌশল মাত্র।
ব্যাংকিং খাতে এই ধরনের কারসাজি নতুন নয়। কিন্তু এর ধরন বদলেছে, গতি বেড়েছে এবং প্রযুক্তির কারণে প্রতারণাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে ভুয়া বিল এখন শুধু জাল কাগজের সমস্যা নয়; এটি ব্যাংকের ঋণব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট সুশাসন, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং আর্থিক গোয়েন্দা তৎপরতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় ঝুঁকি।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি পর্যালোচনা অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ ছিল খেলাপি। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ এই হার ৩৫.৭৩ শতাংশে উঠেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে ঋণশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ, কঠোর শ্রেণীকরণ এবং ঋণগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক চাপকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভুয়া বিল, কৃত্রিম লেনদেন বা নথির কারসাজির মাধ্যমে নতুন করে ব্যাংকের অর্থ ঝুঁকিতে পড়ার সুযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মার্চ ২০২৬: মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২.২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বর ২০২৫: খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। এক বছরে পরিবর্তন: মার্চ ২০২৫-এর ২৪.১৩ শতাংশ থেকে মার্চ ২০২৬-এ খেলাপি ঋণের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তদারকির নতুন দিক: বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শনে ক্রেডিট রিস্ক, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই পরিসংখ্যান ভুয়া বিলের কারণে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের হিসাব নয়। তবে এগুলো ব্যাংকগুলোর ঋণমান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ওপর যে বড় চাপ রয়েছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র।
একটি ভুয়া বিল সাধারণত একা কাজ করে না। তার সঙ্গে থাকে একটি সাজানো বাণিজ্যিক গল্প। বলা হয়, কোনো প্রতিষ্ঠান পণ্য কিনেছে, অন্য প্রতিষ্ঠান তা সরবরাহ করেছে। তৈরি হয় ইনভয়েস, চালান, ক্রয়াদেশ, পরিবহনসংক্রান্ত কাগজ এবং প্রয়োজন হলে ঋণ বা এলসির নথি। সব নথি পাশাপাশি রাখলে মনে হয় একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।সমস্যা হলো, ব্যাংক যদি নথির উপস্থিতিকেই লেনদেনের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে প্রতারণার দরজা খুলে যায়।
কারণ একটি ইনভয়েস সত্যিকারের কাগজ হতে পারে, কিন্তু তাতে লেখা তথ্য সত্য নাও হতে পারে। একটি চালান তৈরি হতে পারে, কিন্তু পণ্য বাস্তবে পরিবহন নাও হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হতে পারে, কিন্তু তার নামে দেখানো শত কোটি টাকার ব্যবসা করার সক্ষমতা নাও থাকতে পারে। আবার দুটি প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে অস্তিত্বশীল হলেও তাদের মধ্যকার লেনদেনটি হতে পারে কৃত্রিম।
এখানেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। ব্যাংককে শুধু জানতে হবে না যে ‘কাগজ আছে কি না’; জানতে হবে কাগজে যে ঘটনা দেখানো হয়েছে, সেটি বাস্তবে ঘটেছে কি না।
একটি ব্যাংকের হিসাবের খাতায় কোনো লেনদেন ঠিকভাবে লেখা থাকলেও তার অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ব্যবসা কয়েক কোটি টাকা। হঠাৎ তার হিসাবে শত শত কোটি টাকার ক্রয়-বিক্রয়ের বিল জমা পড়তে শুরু করল। কাগজে সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কারখানা, গুদাম, কর্মী, উৎপাদনক্ষমতা, পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা বাজারে বিক্রির সক্ষমতা সেই পরিমাণ ব্যবসাকে সমর্থন করে না। এখানেই একজন দক্ষ ব্যাংকারের প্রশ্ন করা উচিত। শুধু হিসাবের খাতা নয়, ব্যবসাটিকেও দেখতে হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার আকার, নগদপ্রবাহ, কর-সংক্রান্ত তথ্য, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, পণ্যের বাজারমূল্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের মালিকানা এবং ব্যাংকিং লেনদেন—সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত আধুনিক যাচাইয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান তদারকি কাঠামোতেও ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় ক্রেডিট রিস্ক, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স, সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকি পর্যালোচনা করা হয়। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক কাঠামোও ধীরে ধীরে শুধু নিয়ম ভাঙা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে সরে ঝুঁকি কোথায় তৈরি হচ্ছে, সেটি শনাক্ত করার দিকে যাচ্ছে।
ভুয়া বিলের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি হলো সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে কৃত্রিম লেনদেন। একই মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আলাদা নামে ব্যবসা করতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান বিক্রেতা, অন্যটি ক্রেতা। একটির বিল অন্যটি গ্রহণ করে। এরপর ব্যাংক সেই বিলের বিপরীতে অর্থায়ন করে। কাগজে এটি বাণিজ্য। বাস্তবে হতে পারে অর্থ স্থানান্তরের একটি বৃত্ত।
একই অর্থ একাধিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ঘুরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে পারে। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিক্রি হঠাৎ বেড়ে যায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বাড়ে, আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা কাগজে শক্তিশালী দেখায়। একপর্যায়ে ব্যাংক যখন প্রকৃত ব্যবসা যাচাই করতে যায়, তখন দেখা যায় যে সম্পদের মূল্যায়ন, বিক্রির হিসাব বা পণ্যের অস্তিত্ব—কোনোটিই প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই।
এ কারণে প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা এখন ব্যাংকিং নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। শুধু প্রতিষ্ঠানের নামে কে পরিচালক, সেটি জানলেই হবে না; শেষ পর্যন্ত কে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কার স্বার্থে লেনদেনটি হচ্ছে, সেটিও বুঝতে হবে।
এলসি ও ট্রেড ফাইন্যান্সে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। বৈদেশিক বাণিজ্যের অর্থায়নে এলসি একটি অপরিহার্য ব্যবস্থা। কিন্তু বাণিজ্যিক নথি, পণ্যের মূল্য এবং সরবরাহের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই না হলে ট্রেড ফাইন্যান্স প্রতারণার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো, পণ্যের পরিমাণের সঙ্গে অর্থের অঙ্কের অসামঞ্জস্য, একই ধরনের লেনদেনের পুনরাবৃত্তি কিংবা এমন পণ্য আমদানির কাগজ তৈরি করা যার সঙ্গে আমদানিকারকের প্রকৃত ব্যবসার সম্পর্ক নেই—এসবই সতর্ক সংকেত। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরেও ভুয়া ক্রয়াদেশ, অতিরঞ্জিত ইনভয়েস বা কাল্পনিক সরবরাহের মাধ্যমে বিল তৈরি করে ব্যাংক অর্থায়ন নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তাই ট্রেড ফাইন্যান্সে ব্যাংকের যাচাই শুধু গ্রাহকের দেওয়া নথির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কাস্টমস, কর, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের সঙ্গে নিরাপদ ডিজিটাল সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
ব্যাংকিং খাত যত দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে, নথি যাচাইয়ের পুরোনো ধারণাও তত দ্রুত বদলানো দরকার। ডিজিটাল ইনভয়েস, ই-মেইল, স্ক্যান করা কাগজ, ইলেকট্রনিক অনুমোদন এবং অনলাইন লেনদেন ব্যাংকিংকে দ্রুত করেছে; কিন্তু এগুলো নিজে থেকে কোনো তথ্যকে সত্য করে তোলে না।
বরং প্রযুক্তির অপব্যবহারে জাল নথি তৈরি, তথ্য পরিবর্তন কিংবা একই কাগজের ডিজিটাল কপি ব্যবহার করে একাধিক জায়গায় অর্থায়নের চেষ্টা আরও সহজ হতে পারে। তাই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা শুধু সাইবার আক্রমণ ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ডেটার সত্যতা যাচাইও ডিজিটাল নিরাপত্তার অংশ হতে হবে।
এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের স্বাভাবিক ধরন যদি কয়েক মাসের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বদলে যায়, একই ধরনের ইনভয়েস বারবার ব্যবহার হয়, একই পক্ষের সঙ্গে অস্বাভাবিক পরিমাণ লেনদেন হয় কিংবা ব্যবসার সক্ষমতার তুলনায় অর্থপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক সংকেত তৈরি হওয়া উচিত।
তবে প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, বিকল্প হিসেবে নয়। অ্যালগরিদম একটি সন্দেহ শনাক্ত করতে পারে; চূড়ান্ত সত্যতা যাচাই করতে হবে দক্ষ কর্মকর্তাকে।
ব্যাংকের ভেতরে ঋণ বা বিল অনুমোদনের একাধিক স্তর থাকার মূল উদ্দেশ্যই হলো একজন ব্যক্তির ভুল বা ইচ্ছাকৃত অনিয়ম যেন পুরো প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে। কিন্তু maker-checker ব্যবস্থা কাগজে থাকলেই হবে না; বাস্তবে দায়িত্বের পৃথকীকরণ কার্যকর হতে হবে।
যে কর্মকর্তা গ্রাহকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করছেন, তিনিই যদি নথি যাচাই করেন, ঋণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন এবং অর্থ ছাড়ের ওপরও প্রভাব রাখেন, তাহলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যায়। একইভাবে কোনো শাখায় দীর্ঘদিন একই গ্রাহক ও একই কর্মকর্তা পরস্পরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লেও ঝুঁকি বাড়ে।
তাই কর্মী রোটেশন, বাধ্যতামূলক ছুটি, স্বাধীন পর্যালোচনা, আকস্মিক পরিদর্শন এবং সন্দেহজনক লেনদেনে দ্বিতীয় স্তরের যাচাই কার্যকর করা জরুরি। অভ্যন্তরীণ অডিটকেও কেবল ফাইলের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখার প্রতিষ্ঠান বানিয়ে রাখা যাবে না। অডিটের লক্ষ্য হতে হবে ব্যাংকের অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং তার পেছনে প্রকৃত অর্থনৈতিক কার্যক্রম আছে কি না, সেটি বের করা। খেলাপি ঋণের চাপের মধ্যে নতুন অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করতেই হবে।
বর্তমান ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতা আরও কঠিন। মার্চ ২০২৬-এ মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২.২৬ শতাংশে থাকলেও এটি মার্চ ২০২৫-এর ২৪.১৩ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ব্যাংকিং খাতের সম্পদের মানের অবনতি এবং সুশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা বড় উদ্বেগের বিষয়।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে ঋণ সৃষ্টি হলে তার ক্ষতি দ্বিগুণ। প্রথমে ব্যাংকের অর্থ বেরিয়ে যায়, পরে ঋণটি খেলাপি হলে ব্যাংককে তার বিপরীতে অতিরিক্ত সংস্থান করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতির চাপ পড়ে ব্যাংকের মূলধন, মুনাফা এবং আমানতকারীর স্বার্থের ওপর।
আরেকটি বৈষম্যও এখানে তৈরি হয়। প্রকৃত উদ্যোক্তা যখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে কঠিন যাচাই, উচ্চ সুদ ও নানা শর্তের মুখোমুখি হন, তখন কৃত্রিম ব্যবসার কাগজ দেখিয়ে কেউ যদি ব্যাংকের অর্থ পেয়ে যান, সেটি সৎ ব্যবসায়ীদের প্রতি সরাসরি অন্যায়।
এখন ব্যাংকিং খাতে এমন একটি সমন্বিত ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যেখানে বড় অঙ্কের ইনভয়েস, বিল ও ট্রেড ফাইন্যান্সের তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বাণিজ্যিক ডেটার সঙ্গে যাচাই করা যাবে। পণ্য আমদানি বা সরবরাহের দাবি থাকলে তার সঙ্গে কাস্টমস, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত। বড় অঙ্কের বিলের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাস্তব পণ্য ও ব্যবসা যাচাই করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর গ্রাহক-পরিচিতি ব্যবস্থাকে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র বা কোম্পানির নিবন্ধন যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। একই মালিকানার একাধিক প্রতিষ্ঠান পরস্পরের সঙ্গে অস্বাভাবিক লেনদেন করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চঝুঁকির সংকেত হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
বড় ঋণ ও ট্রেড ফাইন্যান্সে ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার বাড়াতে হবে। অস্বাভাবিক মূল্য, অস্বাভাবিক টার্নওভার, একই ইনভয়েসের পুনরাবৃত্তি, দ্রুত অর্থ স্থানান্তর এবং সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘন ঘন লেনদেন শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি গড়ে তুলতে হবে।
অভ্যন্তরীণ অডিটকে ব্যবস্থাপনার দৈনন্দিন প্রভাবমুক্ত করে পরিচালনা পর্ষদের Audit Committee-এর কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারী কর্মকর্তার জন্য কার্যকর সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে চাকরি হারানোর ভয় বা পদোন্নতি আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় কেউ দুর্নীতি গোপন না করেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইচ্ছাকৃত অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কোনো প্রতিষ্ঠানের নামের ওপর জরিমানা আরোপ করলেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো কর্মকর্তা জেনেশুনে ভুয়া বিল অনুমোদন করেছেন, তাহলে তাঁর দায় নির্ধারণ করতে হবে। একইভাবে প্রতারণার সুবিধাভোগী গ্রাহকের বিরুদ্ধেও দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির দিকে জোর দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন ব্যবস্থায় ক্রেডিট রিস্ক, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি নিয়ে কর্মশালাও আয়োজন করেছে। এটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু কাঠামো যত আধুনিকই হোক, প্রয়োগ দুর্বল হলে তার ফল পাওয়া যাবে না।
একটি ব্যাংকের ফাইলে শত শত পৃষ্ঠা নথি থাকতে পারে। সেখানে স্বাক্ষর, সিল, অনুমোদন—সবই থাকতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রকৃত নিরাপত্তা নির্ভর করে সেই নথির পেছনের অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর। তাই এখন সময় এসেছে ‘ফাইল ঠিক আছে’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ‘লেনদেন সত্য কি না’ সংস্কৃতিতে যাওয়ার।
ব্যাংকের হিসাবের প্রতিটি অঙ্কের পেছনে থাকতে হবে সত্য। ব্যাংকের অর্থ কোনো পরিচালকের ব্যক্তিগত অর্থ নয়, কোনো কর্মকর্তার ক্ষমতার সম্পদ নয় এবং কোনো প্রভাবশালী গ্রাহকের বিশেষ সুবিধাও নয়। এর বড় অংশ মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসায়ীর মূলধন এবং অর্থনীতির সঞ্চালনশক্তি।
ভুয়া বিলের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ বেরিয়ে গেলে ক্ষতিটা শুধু একটি হিসাবের খাতায় আটকে থাকে না। তার প্রভাব পড়ে আমানতকারীর আস্থায়, ব্যাংকের মূলধনে, প্রকৃত উদ্যোক্তার ঋণপ্রাপ্তিতে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়।
সুতরাং ব্যাংকের হিসাবের খাতায় গরমিলকে নিছক হিসাবের ভুল হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটি আর্থিক সুশাসনের প্রশ্ন, এটি আমানতকারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন, এটি অর্থনীতির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো কাগজ-নির্ভর যাচাই পদ্ধতি দিয়ে নতুন ধরনের আর্থিক প্রতারণা ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু তার সঙ্গে চাই দক্ষ মানবিক যাচাই। অডিট করতে হবে, কিন্তু শুধু অঙ্ক মিলিয়ে নয়। তদারকি করতে হবে, কিন্তু অনিয়ম হওয়ার পর নয়—ঝুঁকি তৈরি হওয়ার মুহূর্ত থেকেই।
সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এমন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে কোনো বড় অঙ্কের অর্থ ছাড়ের আগে প্রশ্ন উঠবে—এই অর্থের পেছনে সত্যিকারের ব্যবসা কোথায়? পণ্য কোথায়? প্রকৃত ক্রেতা-বিক্রেতা কারা? এবং শেষ পর্যন্ত এই অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী কে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যত শক্তভাবে খোঁজা যাবে, ভুয়া বিল ও কাগুজে কারসাজির পথ তত সংকুচিত হবে। কারণ একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু সুন্দর হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সেটি দাঁড়িয়ে থাকে সত্যনিষ্ঠ হিসাব, বাস্তব লেনদেন, কঠোর জবাবদিহি এবং আমানতকারীর অর্থের প্রতি সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধের ওপর।

