বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরেই একের পর এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে দেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ায় খাতটি নতুন করে উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে ওই বাজারে চীন ও ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও তেলের দামের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের অনিশ্চয়তা গত অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রত্যাশিত গতি আনতে পারেনি। ফলে খাতটি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনেও পিছিয়ে রয়েছে।
সম্প্রতি তৈরি পোশাকশিল্পের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে এসব বিষয় উল্লেখ করেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব দেশের পোশাকশিল্পেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রশ্ন: পোশাক খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
মাহমুদ হাসান খান: অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র গ্যাসসংকট, যার ফলে অধিকাংশ কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম ক্ষমতায় চলছে। নতুন গ্যাসসংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
ব্যাংকের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে বহাল রয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট দিতে হচ্ছে, রপ্তানি প্রণোদনা ৬০ শতাংশ কমেছে। এসব কারণে ব্যবসা ধরে রাখতে না পেরে ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
আরও অনেক কারখানা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামনে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ। গ্র্যাজুয়েশনের ৩ বছর পর ইইউতে ১২ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। যেখানে ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউর এফটিএ চুক্তির কারণে তারা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করতে না পারলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে। বিষয়টি এই শিল্পসংলগ্ন সবার মধ্যেই একটি অস্বস্তি তৈরি করেছে। ডাবল ট্রান্সফরমেশন প্রস্তুতিতেও যথেষ্ট অভাব রয়েছে, বিশেষ করে ওভেন ও সিনথেটিক পণ্যের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মেনে চলতে পারলে আমাদের অর্ধেক পোশাক রপ্তানি করা যাবে না।
প্রশ্ন: অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ কী বলে মনে করছেন?
মাহমুদ হাসান খান: সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকট চরমে উঠেছে। এসবের সঙ্গে কারখানাগুলোকে লড়াই করতে হচ্ছে। জ্বালানিসংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার অভাবে ২০২৩ সাল থেকে প্রায় ৩৬০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানায় উৎপাদন কমেছে।
প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা থামছে না। যুদ্ধ একবার থামছে তো আবার শুরু হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ সংকট কীভাবে মোকাবিলার কথা ভাবছেন?
মাহমুদ হাসান খান: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের বড় বিপদ থেকে রক্ষা করবে। তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাত ও মূল্যস্ফীতিতে পড়লে তা বিশ্ব পোশাকশিল্পের বাজারকে প্রভাবিত করবে।
এসবের সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের শিল্পেও। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনুভব করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করলে তা আমাদের জ্বালানি আমদানি ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশ্ন: চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার কী গ্রহণ করছে?
মাহমুদ হাসান খান: সরকার ৩ মাসের তেলের মজুত নিশ্চিত করতে নতুন করে আরও ৫ লাখ টন তেল আমদানি করছে। সেই সঙ্গে রিফাইনারি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশের সব অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে সহজ শর্তে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, চতুর্থ এফএসআরইউ (৬০০ এমএমসিএফডি) স্থাপনের উদ্যোগ, এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি।
প্রশ্ন: সরকার কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে অনেক বন্ধ কল-কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, পোশাকশিল্পের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন?
মাহমুদ হাসান খান: বন্ধ কারখানা চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এসব বন্ধ কারখানায় যে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে তা আমাদের দেশীয় অর্থনীতির একটি অংশ; এগুলোকে অলস অবস্থা থেকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থনীতি উপকৃত হবে। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের সদস্যদের সঙ্গেও কয়েক দফা মতবিনিময় করেছি এবং আমাদের পরামর্শগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও শেয়ার করেছি।
আশাবাদী এই উদ্যোগ থেকে শিল্প ও অর্থনীতি প্রত্যাশিত রিটার্ন পাবে। এর বাইরে সরকারের গৃহীত বেশ কিছু নীতি শিল্পের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি, যেমন–৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট লোন, চলতি অর্থবছরে সব ধরনের ইনসেনটিভ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, ইনসেনটিভের ওপর আরোপিত আয়কর অর্ধেক করা হয়েছে, সোর্স ট্যাক্সকে অ্যাডভান্স ট্যাক্স হিসেবে গণ্য করে সেভাবে কর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।
ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একগুচ্ছ পদক্ষেপের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া করপোরেট কর হার ৫ বছরের জন্য ঘোষণা, ব্যবসা নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টায় এবং প্রত্যাবাসন ৩০ দিনের মধ্যে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবুজ রূপান্তর তহবিল থেকে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং কারখানায় সোলার রুফটপ স্থাপনে ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া ৮ বছরের কম সুদে ঋণ প্রাপ্তির বিষয়ে বিজিএমইএ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। আশা করি, এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে উদ্যোক্তারা এই কঠিন সময়ে স্বস্তি পাবেন এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারী বাড়বে।
প্রশ্ন: সংকট উত্তরণের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
মাহমুদ হাসান খান: সংকট উত্তরণের জন্য চারটি স্তরে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। জ্বালানির ক্ষেত্রে রূপপুর থেকে আগস্টে ৩০০ মেগাওয়াট, ডিসেম্বরে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২৭ সালের জুনে পূর্ণ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ১ হাজার মেগাওয়াট যুক্ত হবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে।
চতুর্থ এফএসআরইউ ২০২৮ সালে চালু হলে এবং অফশোর অনুসন্ধান শুরু হলে আমাদের জ্বালানিসংকট বহুলাংশে কেটে যাবে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে সুদহার কমানো, এনপিএল কমানোর আইনি উদ্যোগ, এনপিএল মোকাবিলায় একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো সফল হলে কস্ট অফ ফান্ড অনেকটাই কমে আসবে।
লজিস্টিকস: ঢাকা-চট্টগ্রাম ৬ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে ২০৩২ সালের মধ্যে নির্মাণ, বে-টার্মিনাল ২০৩০ সালে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০২৯ সালে চালু হবে এবং হযরত শাহজালাল তৃতীয় টার্মিনাল চলতি বছর ডিসেম্বরে উদ্বোধন হবে।
বাজার সুবিধা: ইইউর সঙ্গে এফটিএ চুক্তির জন্য আলোচনা চলছে, জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা চলছে। এসব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে আমাদের অর্থনীতিতে দ্রুত তার সুফল পাব।
প্রশ্ন: দেশে পোশাক রপ্তানি আগের তুলনায় কমেছে? আরও কমার আশঙ্কা করছেন কী? এ ধারা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মাহমুদ হাসান খান: বর্তমান রপ্তানি হ্রাস উদ্বেগজনক হলেও আমি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী। আমাদের শিল্পের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ গ্রহণে শিল্পকে প্রস্তুত করতে হবে। বিশ্ব বাজারে আমাদের শেয়ার ৬.৯% থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ১৫%-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে ডাবল ট্রান্সফরমেশন নিশ্চিত করতে টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণের মান ও পরিধি বাড়াতে হবে। ইইউসহ সম্ভাব্য বাজারগুলোর সঙ্গে এফটিএ নিশ্চিত করতে হবে।

