গত মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ইসরায়েল তার চলমান গণহত্যা অভিযানে ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করছে। এতে ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার ইসরায়েলের গণহত্যার উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি পড়লে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এতে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ২০,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা এবং আরও ৪৪,০০০ শিশুকে আহত করার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এই তথ্যপ্রমাণ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধেই নয়, বরং সেই বিশ্ব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও এক কঠোর অভিযোগ তুলে ধরে, যারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে এবং ২০২৪ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত কর্তৃক জারি করা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপগুলো কার্যকর করতে না পেরে একটি প্রজন্মের ধ্বংসযজ্ঞকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে।
প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার আইনের উপর ভিত্তি করে রচিত, যার জন্ম হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এবং ১৯২৪ সালে লীগ অফ নেশনস কর্তৃক ‘ শিশু অধিকার ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে । এই ঘোষণাপত্রটি শিশুদের অসহায়ত্বকে স্বীকৃতি দেয় এবং শান্তি ও যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে।
ফিলিস্তিনের শিশুদের জন্য এই প্রতিশ্রুতি কখনোই রক্ষা করা হয়নি – এবং তাদের সুরক্ষার মৌলিক দায়িত্ব প্রতিদিন লঙ্ঘিত হয়।
গাজার জনসংখ্যার অর্ধেকই শিশু এবং গাজায় সংঘটিত গণহত্যার বিশ্লেষণে জাতিসংঘের কমিশনের তাদের আইনি অধিকারের ওপর আলোকপাত করার সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ফিলিস্তিনি সমাজের জৈবিক ও সামাজিক ধারাবাহিকতা মুছে ফেলার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বারবার বাস্তুচ্যুতি, অনাহার, ব্যাপক মানসিক আঘাত, অনাথত্ব এবং পঙ্গুকারী আঘাতের মধ্যে শিশুদের ওপর চাপানো শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ইসরায়েলি কারাগারে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছে , যেখানে সম্মিলিতভাবে লজ্জিত করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাদের যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়।
এই ধরনের কর্মকাণ্ড তাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং তা যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার শামিল।
বিধ্বংসী আক্রমণ
ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বৃহত্তর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, প্রতিবেদনটিতে অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে শিশুদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার তীব্র বৃদ্ধির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ কমিশনের ব্যাপক গবেষণা, যা উন্মুক্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে, তাতে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আক্রান্ত শিশু, ছোট বাচ্চা ও নবজাতকদের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘ কমিশন শিশুদের নাম প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ এতে তারা বা তাদের পরিবার বিপদের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। ফলে, এই ফিলিস্তিনি শিশুদের নাম প্রকাশের মৌলিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, এমনকি মৃত্যুর পরেও।
ইসরায়েলের এই আগ্রাসন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতকে বিধ্বস্ত করেছে, উদাহরণস্বরূপ, নবজাতক ও প্রসূতি ওয়ার্ডগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে।
গাজার বহু শিশু প্রায় তিন বছর ধরে স্কুলে যেতে পারেনি, কারণ দেশটির ৯০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে, স্কুলে যাওয়ার পথে সামরিক অভিযান এবং শিশুদের হয়রানি একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃত হামলা নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরে মানবাধিকার সংস্থা , জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং গবেষকরা ফিলিস্তিনি শিশুদের অধিকারের ওপর ইসরায়েলের চলমান লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করে আসছে। ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল, আল-হাক, ইউনিসেফ এবং ইউএনআরডব্লিউএ-এর মতো সংস্থাগুলো এই নির্যাতনগুলোর ওপর নজর রেখেছে এবং রাষ্ট্রগুলোকে হস্তক্ষেপ করার জন্য সুস্পষ্ট আহ্বান জানিয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক হামলা শুরুর কয়েকদিন পর, জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ পূর্ববর্তী সময়কাল নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন । এতে কয়েক দশক ধরে সব বয়সী ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা, অঙ্গহানি, কারারুদ্ধকরণ এবং এতিম করার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়, যার ফলে ব্যক্তিগত, প্রজন্মগত এবং সমষ্টিগত মানসিক আঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
এক বছর পর, জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটি ফিলিস্তিনি শিশুদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালনে ইসরায়েলের ক্রমাগত অস্বীকৃতির বিষয়টি তুলে ধরে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ফলে সংঘটিত “অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন”-এর, “যার মধ্যে “ব্যাপক প্রাণহানি”ও অন্তর্ভুক্ত, “কঠোরতম ভাষায় নিন্দা” জানায়।
ব্যাপক দায়মুক্তি
ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর ইসরায়েলের গণহত্যা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। গাজা থেকে ফেরা চিকিৎসকেরা স্নাইপার ও কোয়াডকপ্টারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া শিশুদের চিকিৎসার কথা বর্ণনা করেছেন । শিশুরা নিজেরাও তাদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছে, এমনকি বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে আল-শিফা হাসপাতালের বাইরে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছে : “আমরা বাঁচতে চাই, আমরা শান্তি চাই, আমরা শিশুদের হত্যাকারীদের বিচার চাই।”
তাদের সাক্ষ্য ইসরায়েলি হামলা, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা ও ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার দৈনন্দিন সংগ্রামকে তুলে ধরে, যখন তারা ‘ শৈশবহীনতা’ —অর্থাৎ নিরাপদ শৈশব থেকে বঞ্চিত হওয়ার—অভিজ্ঞতা লাভ করে।
শিশুবিরোধী যুদ্ধের অংশ হিসেবে এবং দায়মুক্তির সাথে কাজ করে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনি শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নথিভুক্তকারী কয়েকটি গোষ্ঠীকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে এবং তাদেরকে “সন্ত্রাসী” সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের নাগরিক সমাজ গোষ্ঠীগুলোর কার্যালয়ে অভিযান চালানো এবং তাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করার কয়েক দশক ধরে চলে আসা ধারা অব্যাহত রয়েছে।
ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল – প্যালেস্টাইনের কার্যালয়ে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে এবং ইসরায়েলি বাহিনী এর গোপনীয় নথি জব্দ করেছে । অবশেষে এই বছর সংস্থাটি তার কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন উন্মোচন, আন্তর্জাতিক ফোরামে শিশুদের প্রতিনিধিত্ব এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সহায়তা ও প্রতিনিধিত্ব করার মতো বছরের পর বছরের কাজের অবসান ঘটে।
মানবাধিকার সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটি একটি বিবৃতি জারি করে ইসরায়েলকে “অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে শিশু অধিকার কর্মী ও মানবিক সংস্থাগুলোর সম্মুখীন হওয়া সকল বিধিনিষেধ ও বাধা অবিলম্বে তুলে নেওয়ার” আহ্বান জানায়। কমিটিটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে “ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সকল সম্ভাব্য উপায় অবলম্বন করার” জন্যও অনুরোধ জানায়।
তবুও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রসমূহ ইসরায়েলকে দায়মুক্তি নিয়ে তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে গেছে। ইসরায়েলকে তার অপরাধের জন্য জবাবদিহি করতে বিশ্বের ব্যর্থতাই গাজায় গণহত্যাকে সম্ভব করে তুলেছে, যার একটি মূল উপাদান হলো শিশুদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দশকের পর দশক ধরে আসা প্রতিবেদন ও সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছে, যার ফলে ইসরায়েল হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার সুযোগ পেয়েছে।
সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ছাড়া রাষ্ট্রের “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ অর্থহীন; এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের প্রেক্ষাপটে নির্মিত আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এবং তার “আর কখনো নয়” প্রতিশ্রুতির মৃত্যুসংবাদ।
সুতরাং, রাষ্ট্রগুলোর জন্য জাতিসংঘের কমিশনের সুপারিশগুলোকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা অপরিহার্য। তাদের অবশ্যই ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে এবং এই গণহত্যা সংঘটনের জন্য দায়ী সকলের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
- নোয়াম পেলেগ: সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার অনুষদের একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং অস্ট্রেলিয়ান হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউটের একজন সহযোগী। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

