দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের আগ্রহ দেখাচ্ছে।
পেট্রোবাংলা ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড বর্তমানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাফিগুরা, টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার এবং বিপি সিঙ্গাপুর ২০২৬ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।
সরবরাহের সময়সূচি, মূল্য নির্ধারণ এবং অন্যান্য শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর এসব চুক্তি সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয় চলতি বছরের মার্চে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে তাদের নির্ধারিত গ্যাস সরবরাহ করতে পারেনি।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক স্পট বাজার থেকে এলএনজি কিনতে হয়েছে। কিন্তু স্পট বাজারে দাম ব্যাপকভাবে ওঠানামা করায় আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্পট বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি চুক্তি থাকলে বাজারের অস্থিরতার সময় সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হয় এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হয়।
ট্রাফিগুরা বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের জন্য ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬টি কার্গো দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল্য নির্ধারণ প্রস্তাব এশিয়ার এলএনজি বাজারের অন্যতম সূচক জাপান-কোরিয়া মার্কারের সঙ্গে সামান্য অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
টোটালএনার্জিস ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ১৮টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দুটি মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির মাধ্যমে সরবরাহের প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাব এবং এশিয়ার জাপান-কোরিয়া মার্কারভিত্তিক মূল্য কাঠামো।
বিপি সিঙ্গাপুরও ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে দুটি করে এলএনজি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।
এর আগে সরকার টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ১৮টি এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ে প্রতি মাসে দুটি করে কার্গো সরবরাহ করবে।
বাংলাদেশ শুধু স্বল্পমেয়াদি সমাধানের ওপর নির্ভর করছে না। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত মোট ১১৭টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
এই চুক্তির আওতায় ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ১৪টি কার্গো স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি, ২০২৭ সালে ছয়টি এবং ২০২৮ সালে তিনটি কার্গো সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানটি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বছরে ১০টি করে মোট ১০০টি কার্গো সরবরাহ করা হবে।
এসব এলএনজি মহেশখালীতে সরবরাহ করা হবে। সেখানে থাকা দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসায়ন ইউনিটের যেকোনো একটির মাধ্যমে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা হবে।
তবে নতুন চুক্তি হলেও দেশের গ্যাস সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর দেশে মোট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫৭৬ বিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন। এর মধ্যে পুনঃগ্যাসায়িত এলএনজির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৮১ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন।
অন্যদিকে দেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতির কারণে বর্তমানে শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য বড় গ্রাহকের ক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাড়তি চাপের মুখে পড়ছে।
হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নের পর সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্পট বাজার থেকে প্রায় ৫০টি এলএনজি কার্গো কিনেছে। এর আগে ২০২৫ সালে স্পট বাজার থেকে মোট ৪৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বা ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় দ্রুত চাপ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি আমদানির মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য তৈরি করতে হবে।
সরকার এখন একদিকে নতুন সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এই পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে সরবরাহ চুক্তি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কতটা স্থিতিশীল করা সম্ভব হয় তার ওপর।

