যদি সাফল্যের অর্থ হয় পৃথিবীর বিশাল অংশ জয় ও শোষণ করা, তবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নিঃসন্দেহে গত ৩০০ বছরের সবচেয়ে সফল ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প ছিল।
যদিও ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যবর্তী দুই দশকে সাম্রাজ্যটির কার্যত অবসান ঘটেছিল, আধুনিক বিশ্বের উপর এর প্রভাব এখনও প্রকাশ পাচ্ছে।
ইউরোপের অন্যান্য প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের সাম্রাজ্যবাদী বিজয়ের ইতিহাসকে পেছনে ফেলে মধ্যম শক্তি হিসেবে নিজেদের মর্যাদা ব্যাপকভাবে মেনে নিয়েছে, কিন্তু ব্রিটেনের ক্ষেত্রে এমনটা বলা যায় না।
মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া শেষ দুটি মহাবিপর্যয় ছিল: ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজন , যার ফলে ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল এবং জাতিসংঘের প্রধান শক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, কিন্তু যে আরব রাষ্ট্রগুলোর অঞ্চল থেকে এটি গঠিত হয়েছিল তাদের বিরোধিতায় ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি, যা ১৯৪৮ সালে সাড়ে সাত লক্ষ ফিলিস্তিনিকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল ।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে উদ্ভূত তিনটি ঔপনিবেশিক-পরবর্তী রাষ্ট্র একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ।
যদিও এগুলো খুবই ভিন্ন সরকার ও সামাজিক ব্যবস্থা, তবুও এদের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল এককালের দাস-বাগানভিত্তিক অর্থনীতি যা বিবর্তিত হয়ে একটি শিল্পশক্তি ও বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে; ইসরায়েল ছিল একটি বসতি স্থাপনকারী অর্থনীতি যা বিকশিত হয়ে একটি প্রযুক্তি-সামরিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল কয়েকটি জেলেপাড়া, যা পরে অতি ধনীদের জন্য বিশ্বের শীর্ষ গন্তব্যে পরিণত হয় এবং পরবর্তীকালে একটি আঞ্চলিক সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
অধিকন্তু, এই শাসনব্যবস্থাগুলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পে অন্তর্নিহিত বর্ণবৈষম্য ও ঔপনিবেশিক শাসনেরই পুনরুৎপাদন করেছে; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়ে সহিংসভাবে প্রতিবেশী ও আদিবাসী ভূখণ্ডে বিস্তার লাভ করেছে এবং সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই দলে যোগ দিয়েছে।
এরকমই আরেকটি প্রাক্তন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ছিল বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা, কিন্তু বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং আফ্রিকা, কিউবা ও গ্লোবাল সাউথে এর মিত্রদের কল্যাণে বর্ণবাদের অবসান ঘটে।
একটি সাম্রাজ্য হারানোর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য বিশ্বকে উপহার দিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য, যার সামরিক উপস্থিতি ইতিহাসের যেকোনো সাম্রাজ্যের চেয়ে বৃহত্তম; ইসরায়েলে একটি চরম সামরিকতাবাদী বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ এবং একটি উপসাগরীয় একনায়কতন্ত্র, যার অর্থনীতি বর্ণবৈষম্যমূলক এবং পূর্ব আফ্রিকার ওপর যার সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং তখন থেকে প্রায় অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, কোরিয়া, ইন্দোচীন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে।
একইভাবে, ইসরায়েলও ১৯৪৮ সালে তার সহিংস জন্মলগ্ন থেকে জবরদখল করা ভূমির আদি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এবং তার সকল আরব প্রতিবেশীর সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে এবং ২০২৩ সাল থেকে গণহত্যা চালিয়ে আসছে ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, কিন্তু অতি সম্প্রতি মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের শাসনামলে দেশটি লিবিয়া থেকে সুদান ও সোমালিয়া পর্যন্ত প্রক্সি গোষ্ঠী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে অর্থায়ন করে একটি আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার চেষ্টা করছে ।
একটি নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
উপসাগরীয় বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে , সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রথম বৃহৎ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক উদ্যোগ—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে—পুনরায় সৃষ্টি করছে। ইসরায়েলের মতোই, আধাসামরিক আরএসএফ- কে অস্ত্র সরবরাহের জন্য এটিও এখন গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত , যে আরএসএফ দারফুরে কৃষ্ণাঙ্গ সুদানি জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক নৃশংসতা চালিয়েছে।
আশা করা গিয়েছিল যে, বিশ্বকে বিভাজন ও শাসন এবং অধিকারচ্যুতির এই সাম্রাজ্যবাদী উত্তরাধিকার দিয়ে যাওয়ার পর, যুক্তরাজ্য তার ঔপনিবেশিক পূর্বসূরিদের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে এর প্রভাব প্রশমিত করার চেষ্টা করবে এবং একটি নতুন শান্তিপূর্ণ পথ তৈরি করবে।
কিন্তু এর পরিবর্তে, একবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্য মার্কিন সাম্রাজ্যের এক কনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে অতীতের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধগুলোতে ফিরে গেছে। এটি তার সাম্রাজ্যবাদী উত্তরসূরিদের সাথেও মৈত্রী বজায় রেখেছে এবং ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকাণ্ডের মোকাবিলায় কোনো প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর পরিবর্তে, ব্যবসা, সামরিক জোট এবং কৌশলগত স্বার্থ এই সাম্রাজ্যবাদী উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন অধ্যায় শুরু করার যেকোনো নৈতিক দায়িত্বকে ছাপিয়ে গেছে। এর অজুহাত হিসেবে সাধারণত বাস্তবতা এবং মুনাফাকেই দেখানো হয়।
মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক উদাহরণে দেখা যায়, জাতিসংঘে সুদান সংকট বিষয়ক কমিটির প্রধান হিসেবে ব্রিটিশ সরকারকে, উত্তর দারফুরের রাজধানী আল-ফাশেরের ওপর অবরোধ ও আসন্ন হামলার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মানবিক বিশেষজ্ঞরা বারবার অনুরোধ করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থায়নে ও অস্ত্রে সজ্জিত আধাসামরিক গোষ্ঠী আরএসএফ এই শহরটি দখল করতে উদ্যত ছিল।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক গবেষণা ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা নাথানিয়েল রেমন্ড বলেছেন যে, সতর্কবার্তা জানাতে এবং হামলা বন্ধ করার জন্য তাদের আমিরাতি মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ১৮ মাস ধরে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরে বারবার ফোন করা হয়েছিল।
রেমন্ড বলেন, পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা সেই বারবার দেওয়া সতর্কবার্তাগুলোকে উপেক্ষা, প্রশ্নবিদ্ধ বা খারিজ করে দিয়েছিলেন। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আরএসএফ-এর মধ্যকার যোগসূত্রের প্রমাণও তুলে ধরেন এবং আমিরাতিদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য যুক্তরাজ্যকে সেই তথ্যগুলো প্রকাশ করার আহ্বান জানান। কিন্তু যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা তাকে জানান যে, আবুধাবিতে তাদের মিত্রদের কাছ থেকে তারা ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছেন। এই পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতির পর, ২০২৫ সালের অক্টোবরে আরএসএফ আনুমানিক ৬০,০০০ মানুষের ওপর একটি গণহত্যা চালায়, যা এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড।
রেমন্ড বলেছেন যে, যুক্তরাজ্য সরকার সুদানে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের গণহত্যা প্রতিরোধের চেয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে তার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ককে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে।
সুদানে এই লজ্জাজনক ব্যর্থতার পাশাপাশি রয়েছে যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততা, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রির মতো বাস্তব তথ্য। এই গণহত্যায় সম্ভবত ১ লক্ষ ফিলিস্তিনি এবং ৮ হাজারের বেশি লেবানিজ নিহত হয়েছেন, আর যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলের অপরাধের বিপুল প্রমাণ ক্রমাগত অস্বীকার করে চলেছে।
সাম্রাজ্যের প্রতি আসক্ত
এগুলো হলো দুটি সাম্প্রতিক ও জঘন্য উদাহরণ, যা দেখায় কীভাবে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক আইন এবং তার নিজস্ব মানবাধিকার ঘোষণাপত্রকে উপেক্ষা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে উদ্ভূত দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রগুলোর সাথে তার মিত্রতাকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেছে।
তৃতীয়টি হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এর এখনকার সম্পূর্ণ অকার্যকর “বিশেষ সম্পর্ক”, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে , ইসরায়েলকে অস্ত্র দিচ্ছে, কিউবাকে অবরোধ করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রকাশ্যে আক্রমণ চালাচ্ছে।
সাম্রাজ্যের অবসানের অর্ধশতাব্দী পরেও যে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ও অকার্যকর জোটগুলো এমন ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছে, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ব্রিটেনের বিশ্বের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা।
অবশ্যই, এই ধরনের পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে এবং এতে জড়িত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি স্থিতাবস্থা সমর্থনকারী প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ ভোটার যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যায় যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এবং এই পরিবর্তনকে সমর্থন করবে।
এই দায়িত্বটি অ্যান্ডি বার্নহামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের, কিন্তু এখন পর্যন্ত নতুন সরকারের গতানুগতিক ধারা থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছা আছে বলে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; মিলিব্যান্ডের উদ্বোধনী বিবৃতিটি দেখে মনে হচ্ছে, পররাষ্ট্র দপ্তরের চ্যাট জিবিটি সংস্করণটিই তা লিখেছে।
ইতিমধ্যে, বার্নহ্যাম ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ যুদ্ধের জন্য ডিয়েগো গার্সিয়া এবং আরএএফ ফেয়ারফোর্ডে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের বিমান ঘাঁটিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবেশাধিকার দেওয়া অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছেন। ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন, বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যের ম্লান হয়ে যাওয়া খ্যাতির যে কোনো মূল্যেই হোক না কেন, শাসকগোষ্ঠীর ডিএনএ সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে আসক্ত। এর পরিবর্তন অবশ্যই করতে হবে।
- জো গিল: লন্ডন, ভেনেজুয়েলা ও ওমানে ফিনান্সিয়াল টাইমস, মর্নিং স্টার এবং মিডল ইস্ট আই-এর মতো সংবাদপত্রের হয়ে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

