বাংলাদেশে বিচারক নিয়োগের প্রশ্নে আমরা সাধারণত একটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই—পরীক্ষার কঠোরতা। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) পরীক্ষায় একজন প্রার্থীকে প্রিলিমিনারি, ১,০০০ নম্বরের লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার মতো একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। এই দীর্ঘ ও কঠিন বাছাই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে যোগ্য, মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তিদের বিচার বিভাগে নিয়োগ দেওয়া।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন আইন গ্র্যাজুয়েট যদি এই কঠিন বাছাই প্রক্রিয়ার জন্য যোগ্য হন, তাহলে কেবল বয়সের সীমার কারণে তাঁর সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগই বন্ধ করে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?
সম্প্রতি প্রকাশিত ১৯তম বিজেএস নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন গ্র্যাজুয়েট ও সহকারী জজ পদপ্রার্থীদের মধ্যে এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। তাঁদের দাবি—সিভিল জজ পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩৪ বছর করা হোক; ১৯তম বিজেএসের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখ ধরে বয়স গণনার সুযোগ দেওয়া হোক; এবং বিজেএসের সব ধাপ পেরিয়েও পদস্বল্পতার কারণে যারা নিয়োগ পান না, তাঁদের জন্য বিসিএসের আদলে নন-ক্যাডার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক।
এই দাবিগুলোকে কেবল চাকরিপ্রার্থীদের ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে দেখলে বিষয়টির মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যায়। এখানে আসলে প্রশ্ন উঠছে ন্যায্য প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্রীয় মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ মান নিয়ে।
মহামারির সময় হারিয়ে যাওয়া সময় কি প্রার্থীদের দায়?
কোভিড-১৯ মহামারি শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেনি; এটি শিক্ষা, পরীক্ষা ও সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থাকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থবির করে দিয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ সেশনজট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবনে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার বিলম্ব।
একজন আইন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এই সময়ের মূল্য অন্য অনেক চাকরিপ্রার্থীর তুলনায় ভিন্ন। আইন পড়ার পর বার কাউন্সিলের পরীক্ষার প্রস্তুতি, পরীক্ষা, ফলাফল, পেশাগত নিবন্ধন এবং আদালতে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রক্রিয়া মিলিয়ে ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য সময় চলে যায়।
ফলে একজন মেধাবী আইন গ্র্যাজুয়েট যখন বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হন, তখন তাঁর বয়স ৩০ বা ৩১ পেরিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এখানেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একটি মৌলিক প্রশ্ন বিবেচনা করা প্রয়োজন—যে সময়টি প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, সেই সময়ের ক্ষতির পুরো দায় কি তাকেই বহন করতে হবে?
সরকার ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি বৃহত্তর বাস্তবতাকে স্বীকার করেছে। তাই একই ধরনের বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটের প্রভাব যদি বিজেএস পরীক্ষার্থীদের ওপরও পড়ে থাকে, তাহলে তাঁদের জন্য কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন কি না—এই প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়।
সমতার অর্থ কি সবার জন্য একই নিয়ম?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলে এবং ২৯ অনুচ্ছেদ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতার নিশ্চয়তা দেয়।
তবে সাংবিধানিক সমতার অর্থ সব পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের ওপর যান্ত্রিকভাবে একই নিয়ম প্রয়োগ করা নয়। বরং একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি যুক্তিসঙ্গত ও বৈষম্যহীন আচরণ নিশ্চিত করাই সমতার মূল চেতনা।
এই জায়গা থেকেই বিজেএস পরীক্ষার্থীদের দাবিটি বিচার করা প্রয়োজন।
যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে অন্যান্য সরকারি চাকরির প্রার্থীরা বয়সসংক্রান্ত সুবিধা পেয়ে থাকেন, অথচ একই মহামারি, সেশনজট ও নিয়োগ বিলম্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিজেএস পরীক্ষার্থীরা সম্পূর্ণভাবে সেই সুবিধার বাইরে থাকেন, তাহলে অন্তত নীতিগতভাবে এর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
এখানে আরও একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত আলোচনায় এসেছে। চিকিৎসকদের বিসিএস পরীক্ষায় বয়সসীমা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনের বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে যদি বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব হয়, তাহলে আইন পেশায় প্রবেশের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং বিচার বিভাগীয় নিয়োগের বিশেষ বাস্তবতা বিবেচনা করে বিজেএসের বয়সসীমা নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
এটি কোনো পেশার সঙ্গে অন্য পেশার সরল তুলনা নয়। বরং প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্র কি প্রত্যেক পেশার বাস্তব সময়চক্র ও প্রশিক্ষণ কাঠামো বিবেচনা করে নিয়োগনীতি তৈরি করবে, নাকি একটি নির্দিষ্ট বয়সকে সব পেশার জন্য অপরিবর্তনীয় মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করবে?
৩২ থেকে ৩৪—এতে কি বিচার বিভাগের মান কমবে?
বয়সসীমা ৩৪ বছর করার বিরোধিতায় স্বাভাবিকভাবেই একটি যুক্তি আসতে পারে—বয়স বাড়ালে তরুণ প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়বেন এবং বিচার বিভাগে নিয়োগের মান কমে যেতে পারে।
কিন্তু বয়স নিজে কোনো মেধার মাপকাঠি নয়।
বিজেএস পরীক্ষায় একজন প্রার্থীকে যে প্রতিযোগিতামূলক বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেটিই মূল মানদণ্ড। একজন ৩৩ বছর বয়সী প্রার্থী যদি একই প্রিলিমিনারি, একই ১,০০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা এবং একই মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন, তাহলে শুধু বয়সের কারণে তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা বা বিচারিক সম্ভাবনা কমে যায়—এমন কোনো স্বতঃসিদ্ধ যুক্তি নেই।
বরং আইন পেশায় বয়সের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতাও বাড়ে। আদালতে কাজ করা একজন আইনজীবী মামলা পরিচালনা, সাক্ষ্য, যুক্তিতর্ক, আদালতের কার্যক্রম, আইনের ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং বিচারপ্রার্থীর বাস্তব সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে কেবল অভিজ্ঞ আইনজীবীরাই ভালো বিচারক হবেন। কিন্তু এটিও বলা যায় না যে ৩২ বছর পেরোলেই একজন আইন গ্র্যাজুয়েট বিচারক হওয়ার জন্য অযোগ্য হয়ে যান।
বিচার বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত—কে সবচেয়ে যোগ্য, শুধু কে সবচেয়ে কম বয়সী নয়।
বার ও বেঞ্চের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার
বিচারব্যবস্থার একটি বহুল ব্যবহৃত ধারণা হলো—বার ও বেঞ্চ একে অপরের পরিপূরক।
একজন বিচারকের জন্য আইন জানা অপরিহার্য। কিন্তু আইনের বাস্তব প্রয়োগ, আদালতের কার্যপ্রণালি, মামলার প্রকৃতি এবং বিচারপ্রার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণাও বিচারিক দক্ষতার অংশ।
বাংলাদেশে বহু আইনজীবী ৩২ বছর বয়স অতিক্রম করার পরও পেশাগতভাবে আরও পরিণত হন। অথচ বর্তমান বয়সসীমার কারণে তাঁদের একটি অংশ বিচার বিভাগীয় চাকরির প্রতিযোগিতায় প্রবেশের সুযোগ হারান।
বয়সসীমা ৩৪ বছর করা হলে এই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবীদের একটি অংশ বিচার বিভাগে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। এতে বিচার বিভাগের মান কমবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কঠোর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের যোগ্যতাকে রাষ্ট্র কীভাবে কাজে লাগাতে পারে।
১৯তম বিজেএস: একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ সমাধান
১৯তম বিজেএস পরীক্ষায় ২৫০টি শূন্য পদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর এত বড় সংখ্যক পদে নিয়োগের সুযোগ নিঃসন্দেহে আইন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একই সময়ে এমন অনেক প্রার্থী আছেন, যাঁদের বয়স করোনা মহামারি, পরীক্ষা ও নিয়োগের দীর্ঘ বিলম্ব এবং অন্যান্য অনিবার্য কারণে ৩২ বছরের সীমা অতিক্রম করেছে।
এখানে স্থায়ীভাবে বয়সসীমা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি এক রকম; আর ১৯তম বিজেএসের মতো একটি নির্দিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের জন্য এককালীন অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নেওয়া আরেক রকম।
১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখকে বয়স গণনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাবটি তাই স্থায়ী বয়সসীমা বৃদ্ধির বিকল্প নয়। এটি একটি one-time equitable relief হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনি ক্ষমতা, নিয়োগবিধি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করতে হবে। কিন্তু শুধু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রশ্নটি আলোচনার বাইরে রাখা উচিত নয়।
বিজেএসের ‘নন-ক্যাডার’ ধারণা কেন আলোচনায় আসা উচিত?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আরও গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
প্রতি বছর বিজেএস পরীক্ষায় বহু প্রার্থী প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেন। তাঁদের মধ্য থেকে একটি অংশ মৌখিক পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন। কিন্তু পদসংখ্যা সীমিত হওয়ায় তাঁদের সবাইকে সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না।
ফলে রাষ্ট্র একদিকে কঠিন ও ব্যয়বহুল পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে, অন্যদিকে সেই পরীক্ষায় সফল প্রার্থীদের একটি অংশকে কোনো বিকল্প সরকারি নিয়োগের সুযোগ না দিয়েই ছেড়ে দেয়।
এখানে বিসিএসের নন-ক্যাডার ব্যবস্থার আদলে একটি Panel of Qualified Candidates গঠনের ধারণা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি—বিজেএসের মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মানেই কোনো নির্দিষ্ট সরকারি পদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্যতা অর্জন করা নয়। সংশ্লিষ্ট পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগবিধি, অভিজ্ঞতা, মেধাক্রম এবং অন্যান্য আইনগত শর্ত অবশ্যই প্রযোজ্য হবে।
তবু একটি স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও বিধিসম্মত প্যানেল থাকলে রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন আইনভিত্তিক পদে ইতোমধ্যে যাচাইকৃত মানবসম্পদ ব্যবহার করতে পারে।
মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের লিগ্যাল অফিসার, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আইন কর্মকর্তা, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার বিভিন্ন পদ, সাব-রেজিস্ট্রারসহ আইনভিত্তিক অন্যান্য সরকারি পদ—যেখানে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি অনুমোদন করে—সেখানে এই মেধাতালিকা ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
এতে একই ধরনের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য বারবার নতুন পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজন কমতে পারে। রাষ্ট্রের সময় ও প্রশাসনিক ব্যয়ও সাশ্রয় হতে পারে।
তবে দাবির সঙ্গে থাকতে হবে বাস্তবসম্মত নীতিমালা
এই আন্দোলনের দাবিগুলোকে কার্যকর করতে হলে আবেগের পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামো প্রয়োজন।
বয়সসীমা ৩৪ বছর করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি সংশোধন, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
১৯তম বিজেএসের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন বয়সসুবিধার জন্যও আইনগত ভিত্তি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আর নন-ক্যাডার নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে স্বচ্ছতা। কতদিন প্যানেল কার্যকর থাকবে, মেধাক্রম কীভাবে নির্ধারিত হবে, কোন কোন পদে প্রার্থীদের বিবেচনা করা হবে, সংশ্লিষ্ট পদের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই হবে এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী হবে—এসব স্পষ্ট বিধিমালার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থাৎ দাবি বাস্তবায়নের অর্থ কোনো নিয়ম ভেঙে নিয়োগ দেওয়া নয়; বরং উপযুক্ত আইন ও বিধির মাধ্যমে একটি ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও টেকসই ব্যবস্থা তৈরি করা।
বিচার বিভাগ শুধু তরুণদের জন্য নয়, যোগ্যদের জন্যও
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য দক্ষ বিচারক প্রয়োজন। কিন্তু দক্ষতার সংজ্ঞায় বয়সকে একমাত্র বা প্রধান মানদণ্ড বানানোর সুযোগ নেই।
৩২ বছর বয়স একজন মানুষের জীবনের এমন কোনো জাদুকরী সীমারেখা নয়, যার একদিন আগে তিনি বিচারক হওয়ার উপযুক্ত এবং একদিন পরে অনুপযুক্ত।
বরং কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই, পেশাগত অভিজ্ঞতা, সততা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, আইনজ্ঞান এবং বিচারিক মানসিকতা—এসবের সমন্বয়েই একজন ভালো বিচারক তৈরি হন।
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি তার মেধাবী আইন গ্র্যাজুয়েটদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে প্রস্তুত?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা, ১৯তম বিজেএসের ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের জন্য একটি ন্যায়সংগত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা এবং পরীক্ষায় ইতোমধ্যে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করা প্রার্থীদের জন্য বিধিসম্মত নন-ক্যাডার সুযোগ—এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
কারণ একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় অপচয় শুধু অর্থের অপচয় নয়; যোগ্য মানবসম্পদের অপচয়ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতি।
বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎকে আরও দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মানবিক করতে হলে আমাদের নিয়োগনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত বয়স নয়—যোগ্যতা, ন্যায়সংগত সুযোগ এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী মেধার সর্বোত্তম ব্যবহার।
সেই জায়গা থেকেই বিজেএস পরীক্ষার্থীদের এই তিন দফা দাবিকে দেখা দরকার—চাকরিপ্রার্থীদের দাবি হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার একটি নীতিগত প্রস্তাব হিসেবে।
লেখক: এডভোকেট শামস আর্ক
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা

