পুরুষের জন্য পিতৃতন্ত্রও একটি ফাঁদ হতে পারে—কথাটা শুনতে হয়তো অনেকের অবাক লাগতে পারে। সাধারণ ধারণা হলো, পিতৃতন্ত্র মানে শুধুই পুরুষদের নিরঙ্কুশ রাজত্ব আর সুযোগ-সুবিধা। অথচ বাস্তবে এটি এমন এক সামাজিক বন্দোবস্ত, যা সমাজ কাঠামোর দুটি আলাদা ছকে নারী-পুরুষ উভয়কেই আটকে রাখে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী—ছেলে মানেই তাকে শক্ত হতে হবে, সংসারের সম্পূর্ণ আর্থিক দায়ভার বহন করতে হবে, আবেগ প্রকাশ করা যাবে না এবং সবসময় আধিপত্য বজায় রাখতে হবে।
মানব ইতিহাসের একেবারে গোড়ার দিকের সমাজব্যবস্থা নিয়ে নৃবিজ্ঞানীদের বেশ আগ্রহ রয়েছে। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁর বিখ্যাত বই ‘পরিবার ব্যাক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ (১৮৮৪)-এ ধারণা দিয়েছিলেন যে, শুরুর দিকের সমাজে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা নিয়ে বিরোধ সেভাবে ছিল না। আধুনিক নৃবিজ্ঞানের গবেষণাগুলোর দিকে তাকালে এর আংশিক সমর্থন মেলে।
অতীত শিকারি-সংগ্রাহক সমাজকে একেবারে সম্পূর্ণ সমতাভিত্তিক বলা ঠিক হবে না, তবে অনেক সমাজেই সম্পদের ব্যাপক বৈষম্য ও স্থায়ী কর্তৃত্বের কাঠামো তুলনামূলকভাবে বেশ দুর্বল ছিল। খাদ্য ভাগাভাগি ও পারস্পরিক নির্ভরতা ছিল ওই সামাজিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশেষ করে খাবার জোগাড়ে নারীদের ফলমূল সংগ্রহের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবদান রাখত। নারী-পুরুষের কাজের ধরনে তখনো পার্থক্য থাকলেও আধুনিককালের মতো জোরালো বৈষম্য বা ক্ষমতা কাঠামোর প্রকট রূপ সেখানে দেখা যেত না।
সমাজের চালচিত্র গভীরভাবে বদলাতে শুরু করে কৃষি ও স্থায়ী বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে। জমি ও সম্পদের ওপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ শুরু হওয়ার পর উদ্বৃত্ত সম্পদ জমা হতে থাকে এবং বংশানুক্রমিকভাবে সেই সম্পত্তি টিকিয়ে রাখার তাগিদ তৈরি হয়। পরিবার বা জ্ঞাতি-সম্পর্ক কৃষির বহু আগেও ছিল, কিন্তু সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা এসে সামাজিক স্তরবিন্যাসকে বদলে দেয়। অবশ্য কৃষির সঙ্গে পিতৃতন্ত্রের এই সম্পর্ককে সরল কারণ-ফল হিসেবে না দেখে—সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, স্থায়ী বসতি, শ্রমের বিভাজন এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস—সবকিছুর সম্মিলিত পরিবর্তন হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত। ঠিক এই ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায় পিতৃতন্ত্র, যা শুধু নারীর ওপর শাসন চাপায়নি, বরং পুরুষকেও এক সুনির্দিষ্ট নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলেছে।
পুরুষের জন্য পিতৃতন্ত্রও একটি ফাঁদ হতে পারে—কথাটা শুনতে হয়তো অনেকের অবাক লাগতে পারে। সাধারণ ধারণা হলো, পিতৃতন্ত্র মানে শুধুই পুরুষদের নিরঙ্কুশ রাজত্ব আর সুযোগ-সুবিধা। অথচ বাস্তবে এটি এমন এক সামাজিক বন্দোবস্ত, যা সমাজ কাঠামোর দুটি আলাদা ছকে নারী-পুরুষ উভয়কেই আটকে রাখে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী—ছেলে মানেই তাকে শক্ত হতে হবে, সংসারের সম্পূর্ণ আর্থিক দায়ভার বহন করতে হবে, আবেগ প্রকাশ করা যাবে না এবং সবসময় আধিপত্য বজায় রাখতে হবে।
বর্তমান সমাজবিজ্ঞানে এই চাপিয়ে দেওয়া আচরণগুলোকে প্রায়শই ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’ বা ক্ষতিকর পৌরুষ হিসেবে আলোচনা করা হয়। অবশ্য টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি বলতে পুরুষত্বের সব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে বোঝায় না; বরং এমন কিছু সামাজিক প্রত্যাশাকে বোঝায়, যেখানে আধিপত্য, আগ্রাসন, আবেগ দমন বা দুর্বলতা অস্বীকার করাকে পুরুষত্বের অপরিহার্য অংশ বলে চাপিয়ে দেওয়া হয়। সমাজের এই কৃত্রিম মানদণ্ডগুলো মেনে চলতে না পারলে একজন সাধারণ পুরুষ প্রতিনিয়ত সমাজের চোখে অবহেলিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
পুরুষ হওয়ার এই কঠিন নিয়মের পাঠ শুরু হয় একেবারে ছোটবেলা থেকেই। তবে পরিবার বা সমাজ কেউই একে আলাদা করে নির্যাতন বলে স্বীকার করতে চায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গিন্নী’ গল্পের ছোট ছেলে আশুর কথা মনে আছে? শুধু ছোট বোনের সাথে খেলা করার কারণে পণ্ডিত মশাই ক্লাসে তাকে যেভাবে সবার সামনে লজ্জিত করেছিলেন, সেই একই প্রবণতা আজও রয়ে গেছে। কোনো ছেলে একটু শান্ত প্রকৃতির হলে বা আবেগপ্রবণ হলে তাকে আজও ‘মেয়েলি’ বলে ক্ষ্যাপানো হয়। বয়ঃসন্ধিকালে বন্ধুমহলে পৌরুষ প্রমাণ করতে গিয়ে উগ্র আচরণ করা কিংবা আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার সামাজিক চাপটাও খুব তীব্র। একটু আঘাত পেলেও বলা হয়—”ছেলেরা কাঁদে না”। এমনকি শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও ‘পুরুষত্বের ভাবমূর্তি’ রক্ষার্থে অনেক সময় সমাজ বা পরিবার মুখে কুলুপ আঁটে।
এই কাঠামোগত চাপের মানসিক প্রতিক্রিয়া যে কতটা ভয়াবহ, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে কিছুটা হলেও প্রতিফলিত হয়, যেখানে দেখা যায় বিশ্বজুড়ে নারীদের চেয়ে পুরুষদের আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম আত্মহত্যার সামাজিক কারণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সমাজের সাথে বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্বের বিষয়টিকে সামনে এনেছিলেন। পুরুষের বেলাতেও এটি অনেকাংশে সত্যি; নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে না পারার কারণে মানসিক সংকটের সময় অনেক পুরুষ পরিবার, বন্ধু বা পেশাদার সহায়তার কাছেও যেতে চান না। ফলে মনের কথা প্রকাশ না করে নিজেকে গুটিয়ে রাখায় সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ রূপ নেয়। একই ভাবনা উঠে এসেছে নারীবাদী লেখক বেল হুকস-এর ‘দি উইল টু চেইঞ্জ’ বইয়ে।
পিতৃতান্ত্রিক পৌরুষ যে কেবল আবেগকে অবদমন করে তাই নয়; বরং সমাজ পুরুষের কাছ থেকে চরম ঝুঁকি নেওয়া, কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করা এবং প্রয়োজনে জীবন বিপন্ন করার প্রত্যাশাও করে। সমাজ বাস্তবতায় যুদ্ধক্ষেত্র, খনি, কিংবা শারীরিক ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক শ্রমে পুরুষের যে সংখ্যাধিক্য চোখে পড়ে, সেটিও মূলত এই পুরোনো সামাজিক প্রত্যাশারই একটা বড় অংশ।
আমাদের বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর দিকে তাকালেও এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট। পরিবারে পুরুষকে আজও ধরা হয় একক উপার্জনকারী বা ‘ব্রেডউইনার’ হিসেবে। বিয়ে বা সমাজে টিকে থাকা—সব মাপকাঠিতে পুরুষের যোগ্যতা নির্ধারণ করে তার আয়-রোজগার। ফলে কর্মহীন বা স্বল্প আয়ের পুরুষদের প্রতিনিয়ত তিরস্কার ও হীনম্মন্যতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অন্যদিকে দাম্পত্য জীবনে নির্যাতনের শিকার হলেও লোকলজ্জা আর পৌরুষ হারানোর ভয়ে অনেকেই তা আড়ালে রেখে দেন। তবে ঘরোয়া বা মানসিক নির্যাতনের শিকার পুরুষদের সাহায্য পাওয়ার জন্য নারী ও শিশুর মতো বিশেষ ও কার্যকর কোনো সামাজিক মেকানিজম বা সেল এখনো আমাদের দেশে অপ্রতুল।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে নির্যাতনের শিকার পুরুষের কোনো আইনি প্রতিকার নেই; শারীরিক আঘাত, হুমকি বা হয়রানির ক্ষেত্রে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের নানা ধারা প্রযোজ্য। তবে পুরুষের সামাজিক সংকটের মুহূর্তে আলাদা ও দ্রুত সাহায্যকারী পরিকাঠামো তুলনামূলকভাবে বেশ দুর্বল। একই সাথে নারী ও শিশু সুরক্ষায় প্রণীত বিভিন্ন আইনের অপব্যবহার করে ভুয়া মামলায় নির্দোষ পুরুষকে জড়ানোর অভিযোগও আজকাল দেখা যাচ্ছে। অবশ্য এ ধরনের অভিযোগকে সামগ্রিক সত্য হিসেবে মেনে নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রয়োজন। যৌক্তিকভাবে বিচার করতে গেলে কেবল অভিযোগ, রুজুকৃত মামলা এবং প্রমাণিত অপরাধ—এই তিনটিকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখাই সঠিক আইনি দৃষ্টিভঙ্গি।
এমন অনেক প্রেক্ষাপট থাকার পরও অনেকেই ভাবেন, নারীবাদ বুঝি শুধু পুরুষের সুবিধা কেড়ে নিতে বা ছোট করতে চায়। কিন্তু আসল চিত্র তা নয়। নারীবাদের আধুনিক চর্চাগুলো মূলত এই পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলগুলোকেই ভাঙতে চায়। লিঙ্গসমতার অর্থ শুধু নারীর কর্মসংস্থান বা ক্ষমতায়ন নয়; এর একটি বড় অর্থ হলো পুরুষের ওপর একক উপার্জনকারীর পাহাড়সম মানসিক চাপ কমানো। নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী হলে সংসার চালানোর একা দায়িত্ব থেকে পুরুষ যেমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারে, তেমনি লিঙ্গভিত্তিক সমতার ফলে পিতৃত্বের বা সন্তান পালনের আইনেও বাবা হিসেবে পুরুষ তাঁর সমান অধিকার ও সুযোগ পান। তখন সমাজ আর আবেগকে ‘দুর্বলতা’ না বলে স্বাভাবিক মানবিক আচরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।
শুরুতে হয়তো বেঁচে থাকার বা মালিকানা রক্ষার কৌশল হিসেবে আমরা নিজেদের অজান্তেই যে সামাজিক বিধিনিষেধের কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলাম, আজ তা পুরুষদের ওপরই জেঁকে বসেছে। পিতৃতন্ত্র পুরুষকে ঠিক কোনো আবেগসম্পন্ন মানবিক রূপ হিসেবে দেখে না; দেখে বরং সংসারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এক কাঠখোট্টা উৎপাদনশীল হাতিয়ার হিসেবে। তাই পুরুষদের নিজেদের লড়াইটাও নারীর বা নারীবাদের বিপক্ষে হওয়া যৌক্তিক নয়। সমাজ থেকে এই বদ্ধমূল ধারণা দূর করা গেলেই উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে সন্তান পালন—সব ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষের একটি সম্মানজনক ভাগাভাগি নিশ্চিত হবে। আর তখন লিঙ্গ পরিচয়ের বাধ্যবাধকতা ছাপিয়ে গিয়ে প্রতিটি মানুষ মানসিক শান্তি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠার অবকাশ পাবে।
লেখক:ফেরদৌস আরা রুমী, জেন্ডার বিশ্লেষক এবং মানবসম্পদ বিভাগ প্রধান, ঢাকা পেপার্স।

