যদিও ইলিশ ভারত মহাসাগরের মাছ তবে বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ উপকূল ইলিশের জন্য সবচেয়ে সমৃদ্ধ। এর বাইরে কিছু ইলিশ পাওয়া যায় আরব সাগরে। যে পরিমাণ ইলিশ সাগর থেকে ধরা হয় তার ৮০ শতাংশই বলা চলে সুন্দরবন থেকে মায়ানমার পর্যন্ত এই অঞ্চলে পাওয়া যেত।
পদ্মার ইলিশ খ্যাত ইলিশ মূলত গঙ্গার মাছ। এই মাছের স্বাদ আলাদা তাই গত বছর পর্যন্ত ভারতে ইলিশ রপ্তানি হতো। কিন্তু এখন ঘটছে উল্টো। এবার বাংলাদেশ ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছে। বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ইলিশ একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না এমনটি নয়; তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকটের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে গোছে। অন্য দিকে ভারতের পশ্চিম উপকূলে নর্মদা ও তপ্তী নদী অববাহিকায় যেখানে এই দুটি নদী আরব সাগরে মিলিত হয়েছে সেখানে অনুকূল পরিবেশের কারণে গুজরাটে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে।
ইলিশ যেহেতু গঙ্গার মাছ যার সম্পর্ক হিমালয়ের সাথে তাই গঙ্গা যেখানো পদ্মা হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে সেখানে এবং নর্মদা ও তপ্তী নদী যেগুলো হিমালয়ের তুলনায় অনেক প্রাচীন পর্বত সাতপুরা ও মৈকাল থেকে উৎপন্ন হয়ে মিলিত হয়েছে আরব সাগরে সেখানে মিলছে ইলিশ। মৈকাল পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অমরকণ্টক থেকে ‘সোন’ নদীর উৎপত্তি হয়েছে। এই সোন নদীটি উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ, মৈকাল এবং হিমালয়; উভয় অঞ্চলের পানিই শেষ পর্যন্ত গঙ্গা নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। আবার অন্যটি চলে গেছে নর্মদা তপ্তী নদী হয়ে আরব সাগরের দিকে।
এই গঙ্গা এবং নর্মদা ও তপ্তী নদীতে ইলিশ পাওয়ার ঘটনা সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই। তবে হঠাৎ করে এমন কি ঘটলো ইলিশের বড় আবাস ধ্বংস হয়ে গঙ্গা থেকে চলে গেছে নর্মদা তপ্তীর দিকে। রহস্যটা এখানেই। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত নিয়ে আমার ছোট একটি বুকলেটও আছে যেখানে আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি ইলিশ মূলত টেথিস সাগরের আদি বাসিন্দা। এই টেথিস সাগর হিমালয়ে পরিণত হওয়ার পর ইলিশ মাইগ্রেট করেছে বটে তবে সে তার অরিজিনের দিকে হাঁটতে চায়। তাই ইলিশ গঙ্গা ও নর্মদা তপ্তী নদীর উজানে হাঁটে যেখানে হিমালয়ের পানি পায়। তাই কিছু ইলিশ সিন্ধু নদেও মিলে। এখন যেহেতু গঙ্গা মানে পদ্মা অববাহিকায় নাব্যতা সংকট মানে ইলিশ সামুদ্রিক মাছ হলেও ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে পদ্মা (গঙ্গা) ও নর্মদা, তপ্তী নদীর মিঠা পানিতে আসে।
বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের নদীগুলোতে (যেমন পদ্মা ও মেঘনা) প্রবেশের মুখে পলি জমে নদীর গভীরতা বা নাব্যতা কমে গেছে। গভীরতা কম থাকায় ইলিশ মাছ নদীর ভেতরের দিকে আসতে পারছে না এবং সাগরের দূরবর্তী অঞ্চলেই থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নদীগুলোতে অতিরিক্ত শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং যত্রতত্র ড্রেজিং ও নৌযান চলাচলের কারণে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। ইলিশ খুবই সংবেদনশীল মাছ। পানির গন্ধ বা পরিবেশ অনুকূল না হলে তারা গতিপথ পরিবর্তন করে। উজান থেকে পদ্মা হয়ে মিষ্টি পানি নামার হারও কমে গেছে যার কারণে ইলিশ হিমালয়ের মিষ্টি পানি না পেয়ে হারাচ্ছে ডিম পাড়ার নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু ঘটনা ঘটছে নর্মদা ও তপ্তী নদীর ক্ষেত্রে।
ভারতের গুজরাট অঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, মৈকাল পর্বত থেকে স্বাদু পানির যোগান নর্মদা এবং তাপ্তী নদী যেখানে আরব সাগরে মিশেছে, সেখানে ইলিশের জন্য চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওই অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদীগুলোতে প্রচুর মিঠা পানির প্রবাহ তৈরি হয়েছে। এই অনুকূল পরিবেশ পেয়ে সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ গুজরাটের উপকূলে এবং নদীতে ডিম ছাড়তে যাচ্ছে আর ধরা পড়ছে জেলেদের জালে।
মোঃ আব্দুর রহমান

