বেতনভাতা নিয়ে বিগত কয়েকদিন সহ আজও চলমান পোশাকশ্রমিক দের বিক্ষোভ দুটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শ্রমিকদের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্য, আর আন্দোলন মোকাবিলায় রাষ্ট্র কোন পথ নেবে।
মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন। সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। কিন্তু শ্রমিকদের কথা, শুধু বোর্ড গঠন নয়, নতুন মজুরির অঙ্কও ঘোষণা করতে হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) পুলিশের সঙ্গে দিনভর সংঘর্ষ হয়। কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটে; মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে ও কোনাবাড়ীতে পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ ৪৮ থেকে ৪৯ জনকে আটক বা গ্রেপ্তার করেছে এবং পরিকল্পিত নাশকতার জন্য দশ হাজারের বেশি মানুষের নামে অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদসূত্র অনুযায়ী ৫৫০টির অধিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
দ্রব্যমূল্য ও বাজার বাস্তবতা: দেয়ালে পিঠ ঠেকা জীবন
শ্রমিকদের ওপর চাপ কতটা, তা কয়েকটি বিষয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়। যার অনেক হিসাব শ্রমিক-সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের।
দাম বাড়ছে: বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ, টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে। জুনে খাদ্যপণ্যে ৮.৬০ ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে ৯.৬১ শতাংশ।
আয়ের মূল্য কমেছে: এক আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকায় যা মিলত, এখন তা কিনতে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগে।
সংসারের খরচ: শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাবে চার সদস্যের পরিবারের শুধু খাবারেই মাসে ৩৫ হাজার ৫৮০ টাকা লাগে; সব খরচ মিলিয়ে ৬৩ হাজার ৬৬০ টাকা। এটি তাদের নিজস্ব হিসাব।

প্রকৃত মজুরি বাড়েনি: বিলসের নির্বাহী পরিচালকের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি তেমন বাড়েনি; সাড়ে ১২ হাজার টাকায় সংসার চালানো কঠিন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নীতি-ব্রিফও বলছে, পাঁচ বছরের চক্র ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ন্যূনতম মজুরির শ্রমিকদের আয় ক্ষয় করে। সিপিডির ২০১৮ সালের গবেষণায়ও দেখা যায়, বাসাভাড়া ও চিকিৎসার মতো খাদ্যবহির্ভূত খরচের অংশ বাড়ছে।
দেয়ালে পিঠ ঠেকা অবস্থা: আয় ও খরচের ফারাক বাড়লে মানুষ বাড়তি সময় কাজ করে, খাবারের মান কমায়, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনায় কাটছাঁট করে। ভাড়া, বাজার ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর কিছু না থাকলে সড়কে নামা অনেকের কাছে শেষ উপায় হয়ে ওঠে। এটি আন্দোলনের তীব্রতার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা।
অপর দিকের বাজার বাস্তবতা: শ্রমঘন খাতে ব্যয় বাড়লে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় চাপ পড়ে, মালিকপক্ষের পক্ষে সাধারণত এই যুক্তি দেওয়া হয়। কর্নেলের ব্রিফ এর পক্ষে প্রমাণ পায়নি। মতভেদ আছে, তাই কারখানাভিত্তিক সামর্থ্যের তথ্য প্রকাশ জরুরি।
আইনি কাঠামো: মজুরি বোর্ড ও সময়সীমা
শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৩৮–১৪২ অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি ঠিক হয় সরকার-গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সুপারিশে। সরকার তা ঘোষণা করে, আর ঘোষিত হার সব সংশ্লিষ্ট মালিকের জন্য বাধ্যতামূলক।
আগে পাঁচ বছর পর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণের নিয়ম ছিল। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে তা তিন বছর করা হয়েছে, আর পোশাক খাতের বর্তমান চক্র ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। তাই নতুন বোর্ড গঠন অপ্রত্যাশিত নয়। আসল প্রশ্ন, প্রক্রিয়া কত দ্রুত, কতটা স্বচ্ছ এবং কার অংশগ্রহণে এগোবে।
বিলসের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক খাতে সময়মতো মজুরি পুনর্মূল্যায়ন হয় না এবং প্রতিনিধি বাছাইয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ আছে। এটি আস্থার সংকটের একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, তবে বর্তমান বোর্ডের ক্ষেত্রে তা আলাদাভাবে যাচাইয়ের বিষয়।

সংবিধান: অঙ্গীকার ও তার আইনি মর্যাদা
সংবিধান একদিকে শ্রমিকের জীবিকা ও মর্যাদার অঙ্গীকার দেয়, অন্যদিকে সমাবেশের অধিকারকে শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃতি দেয়। দুই ধরনের বিধানের আইনি শক্তি এক নয়।
- অনুচ্ছেদ ১১: গণতন্ত্র ও মানবসত্তার মর্যাদার অঙ্গীকার।
- অনুচ্ছেদ ১৫ ও ২০: জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ, যুক্তিসঙ্গত মজুরিতে কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য ও মানবিক কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের দায়।
- অনুচ্ছেদ ৩৭: আইনসম্মত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র সমাবেশের স্বাধীনতা। এটি আদালতে প্রয়োগযোগ্য মৌলিক অধিকার।
- অনুচ্ছেদ ৮(২): ১১, ১৫ ও ২০ রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি, যা সরাসরি আদালতে বলবৎ করা যায় না।
কুদরত-ই-ইলাহী পনির মামলায় আপিল বিভাগ বলেছিল, শুধু মূলনীতির সঙ্গে অমিলের কারণে কোনো আইন বাতিল হয় না। আইনবিদদের একাংশ এর সমালোচনা করে বলেন, মূলনীতি নীতি-প্রণয়নের দিকনির্দেশক। তাই ন্যায্য মজুরি আইনি অর্থে অধিকার-দাবির চেয়ে রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়। মজুরি বোর্ড সেই দায় পূরণের একটি মাধ্যম।
সমাবেশের অধিকার, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা
শান্তিপূর্ণ সমাবেশ সংবিধান স্বীকৃত অধিকার; সহিংসতা সেই সুরক্ষার বাইরে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ফৌজদারি অপরাধ, আর দায়ীদের আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত।
তবে ব্যক্তির দায় আর সমষ্টির আন্দোলন এক নয়। কিছু ব্যক্তির সহিংসতা পুরো আন্দোলনকে বেআইনি করে না; আবার আন্দোলনের ন্যায্যতা সহিংসতার দায় মুছে দেয় না। পুলিশের “পরিকল্পিত নাশকতা”র অভিযোগ আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ।
বলপ্রয়োগেও আনুপাতিকতা ও প্রয়োজনীয়তার নীতি মানতে হয়, যা জাতিসংঘের মূলনীতিতেও আছে। কাঁদানে গ্যাস বা সাউন্ড গ্রেনেড কখন ও কতটা সংগত ছিল, সংঘর্ষ কীভাবে শুরু হয়েছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো যথেষ্ট নয়। নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এই দুই দিকই খতিয়ে দেখতে পারে।
কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ভূমিকা
কল্যাণরাষ্ট্র হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সরকার শুধু আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও পালন করে।
- বেসরকারি খাতে মজুরি দেয় মালিকপক্ষ; রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ন্ত্রক ও মধ্যস্থতাকারীর।
- রাষ্ট্রের কাজ একদিকে ন্যূনতম মান ঠিক করা, অন্যদিকে শিল্পের সামর্থ্য বিবেচনা করা।
- রেশন, গণপরিবহন ও আবাসনের মতো সহায়তা বাড়ালে মালিকের একক চাপ কমে এবং শ্রমিকের প্রকৃত আয় বাড়ে।
- আলোচনার জায়গা সীমিত মনে হলে সংকট রাস্তায় গড়ায়। ত্রিপক্ষীয় আলোচনা, প্রকাশ্য তথ্য ও নির্দিষ্ট সময়সীমা আস্থা গড়ার প্রচলিত উপায়।

পক্ষগুলোর অবস্থান ও সীমাবদ্ধতা
প্রতিটি পক্ষের যুক্তিরই জোরের জায়গা ও সীমা আছে। মালিকপক্ষ ও ক্রেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য যাচাই করা যায়নি; তাই তাদের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে যেসব বিবেচনা বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সেগুলোই রাখা হয়েছে।
- শ্রমিক: ১২,৫০০ টাকা অপর্যাপ্ত; মজুরির অঙ্ক ঘোষণা চাই। যাচাই: ৩০,০০০ টাকার ব্যয়কাঠামো।
- মালিকপক্ষ: দ্রুত মজুরি বৃদ্ধি প্রতিযোগিতায় চাপ ফেলতে পারে। যাচাই: কারখানাভেদে সামর্থ্য।
- সরকার: আইনি প্রক্রিয়ায় বোর্ড গঠন; শৃঙ্খলা রক্ষা তার দায়িত্ব। যাচাই: সময়সীমা ও বলপ্রয়োগের আনুপাতিকতা।
- ক্রেতা ও ব্র্যান্ড: মূল্য ও মান নির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খল। যাচাই: ক্রয়মূল্য ও মজুরির সম্পর্ক।
করণীয়
আস্থা ফেরাতে প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপই সবচেয়ে দ্রুত কাজ করতে পারে।
- মজুরি বোর্ডের কর্মপদ্ধতি, সদস্য ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময়সীমা প্রকাশ করা।
- শ্রমিকদের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
- ঢাকা, আশুলিয়া ও গাজীপুর সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয়ের নিরপেক্ষ সমীক্ষা প্রকাশ করা।
- সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তার সম্ভাব্যতা বিবেচনা করা।
- সহিংসতা ও বলপ্রয়োগ, দুটিরই স্বাধীন তদন্ত করা এবং আটক ব্যক্তিদের আইনানুগ প্রক্রিয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
- আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কালো তালিকাভুক্তি বা অন্যায্য ছাঁটাই হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা।
- মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি, সরকার ও ক্রেতাদের আলোচনা চালু রাখা।
ন্যায্যতা, আইন ও আস্থার পথে
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন কয়েকটি সত্য সামনে এনেছে। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি ও বাজার বাস্তবতার চাপে ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন রাষ্ট্রের জরুরি দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, সহিংসতা অপরাধ এবং তার স্বচ্ছ বিচার দরকার, তবে তা গোটা আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বানায় না; বলপ্রয়োগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
তৃতীয়ত, এর জবাব শক্তিপ্রয়োগে নয়, আলোচনার টেবিলে বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ায়। ৩০ হাজার টাকার অঙ্ক সব পক্ষের আলোচনা ও তথ্যভিত্তিক সমীক্ষায় ঠিক হবে। তার আগে বোর্ডের কর্মপদ্ধতি, প্রতিনিধিত্ব ও সময়সীমা স্পষ্ট করে আস্থা ফেরানোই প্রথম কাজ। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের শক্তি শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানুষের ন্যূনতম জীবননিরাপত্তা নিশ্চিত করার সামর্থ্যেও।

