কোনো প্রকল্পের গোড়ায়ই যদি গলদ থাকে ও সেই গলদপূর্ণ প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর চলতে থাকে, সেটা জনগণের উপকারে না এসে উল্টে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া চারটি প্রকল্পই এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
সূত্র অনুযায়ী জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চার প্রকল্পের কাজ চলছে ৫ থেকে ১১ বছর ধরে। দুটি প্রকল্পের মেয়াদ গত বছরের জুনে শেষ হলেও কাজ চলমান। বাকি দুটির মধ্যে একটির মেয়াদ আছে ছয় মাস, অন্যটির দেড় বছর। শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ২৬টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে চার প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ৮ হাজার ৩১২ কোটি টাকা খরচ করার পরও ভারী বৃষ্টি হলে তলিয়ে যায় নগর। নতুন করে দুটি সমস্যা দেখা দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া এবং খাল ও খালের পাড়ে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আইনি জটিলতা। এই পটভূমিতে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলায় একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, যাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাজে সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা সমস্যা দীর্ঘদিনের। সেখানে এক মেয়র গিয়ে আরেক মেয়র আসেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও এক চেয়ারম্যানের স্থলে আরেকজন চেয়ারম্যান আসেন। উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়; কিন্তু চট্টগ্রামবাসীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতার অবসান হয় না।
এবার বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক বলেই মনে করি। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনায় ৫ জানুয়ারি জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে করণীয় নির্ধারণ করতে একটি বৈঠক হয়, যাতে তিনটি সংস্থার দায়িত্ব ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে সব ধরনের পাহাড় কাটা বন্ধের কাজ করবে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তর; খাল ও নালা-নর্দমা পরিষ্কারের কাজ সিটি করপোরেশন; জোয়ার প্রতিরোধক ফটকগুলো কার্যকরে কাজ করবে সিডিএ, পাউবো, সেনাবাহিনীর ৩৪ ইসিবি। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ও গভীরতা বজায় রাখতে ড্রেজিং বা খননকাজ করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সার্বিক সমন্বয়ের কাজটি করবেন কাজের বিভাগীয় কমিশনার। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ৪ জন উপদেষ্টা চট্টগ্রাম সফর করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
সূত্র অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজেও প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যায়নি। আছে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ জটিলতা। ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ।
এ অবস্থায় যত উচ্চপর্যায়েই বৈঠক ও পরামর্শ হোক না কেন, অর্থের সংস্থান না হলে প্রকল্পের কাজ এগোবে না। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলো ছিল ত্রুটিপূর্ণ। প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধান করতে না পারলে আগামী বর্ষা মৌসুমেও জলাবদ্ধতা কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
এসব উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা মনে করেন, তাঁরাই সবজান্তা। বাইরের কোনো বিশেষজ্ঞের দরকার নেই। এর পেছনে আসল কারণটি হলো বাইরের বিশেষজ্ঞরা এলে ভেতরের ফাঁকফোকরগুলো জেনে যাবেন এবং জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের সুফল পেতে হলে বিভিন্ন সংস্থার কাজে সমন্বয় ও তদারকি বাড়ানোর বিকল্প নেই। (খবর: প্রথম আলো)

