আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদ, লেখক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। বর্তমানে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন।
২০১৪ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন সর্বজনকথা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। তার আগে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের জার্নাল সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষায়ও। সম্প্রতি তিনি প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বড় আকারের একটি বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার। নানা কারণে এ বাজেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সংক্ষেপে এবারের বাজেটের ব্যাপারে কী বলবেন?
বাজেট নিয়ে অল্প কথায় কিছু বলা কঠিন। তবে এবারের বাজেটে কিছু বিষয়ে ধারাবাহিকতা আছে। নির্দিষ্টভাবে কিছু খাতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, সেগুলোয় ধারাবাহিকতা রাখা হয়েছে। এখন অনেকে বলছেন, এটি অনেক বড় আকারের বাজেট। কেউ কেউ এর লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী বলছেন। অনেকে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন। কিন্তু বাজেট তো বড়ই হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির পরিসর ও আকার বাড়ছে।
জিডিপি ও প্রয়োজন বাড়ার কারণে পরবর্তী বাজেট বড় হবে এমনটিই স্বাভাবিক। প্রায় সব সরকারই বাজেট উপস্থাপনের আগে বলে থাকে, আমরা আগের চেয়ে বড় বাজেট দিয়েছি। কিন্তু এখন তো মূল্যস্ফীতি রয়েছে, আবার টাকার মূল্যমানও কমছে। এগুলো হিসাব করতে গেলে বাজেট আসলে বড় হয়েছে কিনা সেটা একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। জিডিপির অনুপাতটা যদি কমবেশি একই থাকে তাহলে বাজেট অনেক বড় হয়েছে বলা যায় না। যেহেতু টাকার আসল মান ও মূল্যমানের ফারাকটা সাধারণ মানুষ দেখে না তাই বাজেট অনেক বড় বলে মনে হয়। তবে বাজেটের মাধ্যমে সরকার একটি প্রাক্কলনে আসে। রাজস্ব আয় ও নানা খাতে ব্যয়ের বিষয়গুলোকে হিসাব করতে হয়।
এখন এই দুটোর মধ্যে পার্থক্যের কারণে যে ঘাটতি দেখা দেয়, সেটাকে মোকাবেলা করার জন্য সরকার কোনদিকে এগোচ্ছে বা এগোতে চায় সেটার দিকনির্দেশনা বাজেটে থাকা জরুরি। অর্থাৎ বাজেট কত বড় হচ্ছে সেটা আমার বিবেচনার বিষয় না। বরং বাজেটের গুণগত মান আসলে কতটা রক্ষিত হচ্ছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক থেকে এবারের বাজেটে সেই দিকনির্দেশনা আছে।
এবারের বাজেটের প্রতিপাদ্য ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। বাজেটের মধ্যে কি এ প্রতিপাদ্য পূরণের কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া গেল?
মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ধারণাটি বর্তমান বিশ্বে আসলে অনেকটা পোশাকি বিষয়। গোটা বিশ্বই নিউ লিবারেল ইকোনমিক পলিসি বা নব্য উদারবাদী নীতি অনুসরণ করে। তবে এটিকে উদারবাদী বললেও নীতিমালাটি খুবই রক্ষণশীল। অর্থাৎ মুনাফা ও বাজারের হাতেই সব ছেড়ে দিতে হবে। এখানে মানবিক ও জনগণের স্বার্থের কথা বলা হলেও মূলত করপোরেট স্বার্থই মূল। এখানে সমস্যা হলো এ ধরনের অর্থনৈতিক দর্শনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জাতীয় সম্পদের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিছু কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। গোটা বিশ্বের অর্থনীতিই এভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
এজন্য বৈষম্যহীন ও মানবিক অর্থনীতি গড়ার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো থেকে যায়। যেমন দেশের শিক্ষা খাতের বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। চিকিৎসা খাতের বেসরকারীকরণ হয়েছে। অর্থনীতির বিগত দুই দশকে ভালো অগ্রগতি হয়েছে অথচ সে অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। বিশেষত সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। এজন্য এ অগ্রগতি আসলে কর্মসংস্থানহীন এক ধরনের অগ্রগতি।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা জিডিপি বাড়ানোর জন্য সবসময় মানবিক স্বার্থ অগ্রাধিকার পায় এমন না। বিগত সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে পরিবেশের অনেক বিপর্যয় ঘটানো হয়েছে। এখন ঢাকায় বা দেশের অনেক স্থানে জলাশয় ও বনভূমি ধ্বংস করেও তো অবকাঠামো হয়েছে। এগুলো মানুষের স্বাস্থ্যগত সমস্যা তো বটেই, সামগ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করছে। কিন্তু আমরা জিডিপিকে কেন্দ্র করেই বলতে শুরু করছি যে আমাদের অগ্রগতি হবে। যেমন অর্থমন্ত্রী ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথা বলেন।
এখন বাজেট ঘোষণার আগেই বিবিএস জানিয়েছে আমাদের অর্থনীতি অর্ধেক ট্রিলিয়নে গেছে। প্রথমবারের মতো এ অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। এখন বিবিএসের এ জরিপ নিয়েও অনেক কথা রয়েছে। তথ্য সঠিক কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তাই সরকারের গত দেড় দশকের জিডিপির হিসাবের যথার্থতা মূল্যায়ন করা জরুরি ছিল। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত সামগ্রিক যা কিছু ঘটেছে অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্প, পরিকল্পনা বরাদ্দ এবং পরিসংখ্যানের কাঠামো—এ সবকিছুর সামগ্রিক পর্যালোচনা করা। বাজেটে পর্যালোচনার ভিত্তিতে যদি অস্থায়ী কিছু উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু হতো তাহলে হয়তো আমরা ওই রূপান্তরের আভাস পেতাম।
এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। সরকার এ দুটো খাতকে আমূল পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছে। আপনি কী মনে করছেন, বরাদ্দ বাড়ানোতে ইতিবাচক প্রভাব কেমন পড়বে?
অতীতে প্রায় সব সরকারই এ দুটো খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এবারো সরকার তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে রেখেছে। তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা দিনে দিনে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ৫ ভাগে নিয়ে যাবে। এ প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এদিকে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখা হয়। স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালেও একই দৃশ্য মিলবে।
এখন একটি দেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থা এ দুটো খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এ দুটো খাতের অবাধ বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। বাংলাদেশের মতো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাণিজ্য আর কোনো দেশে আছে বলে মনে হয় না। অধিকাংশ রাষ্ট্রই এগুলোর দায়িত্ব নেয়। যদি শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থে একটা সরকার গুরুত্ব দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায় এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য শিক্ষা অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। বেসরকারি খাত ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি সম্ভব নয়। সরকার শিক্ষা খাতে এরই মধ্যে কিছু কিছু কর্মসূচি রেখেছে।
এর মধ্যে ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব রয়েছে। এ উদ্যোগ শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু বহু স্কুলেরর অবকাঠামো জীর্ণ। আবার অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, লাইব্রেরি নেই, ল্যাবরেটরির মান বাজে। শিক্ষকদেরও অনেক সময় এত কাজ করতে হয় যে ক্লাসে যেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে কী ধরনের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে নিশ্চিত হবে?
আবার শিক্ষা খাতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য তো রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। কোনো সরকারই নিম্ন আয়ের ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়নি। এখন অনেক বেসরকারি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। শিক্ষার আওতা বেড়েছে। কিন্তু এখানে ব্যয় অনেক বেশি। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ বা পরিবারগুলো সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে এখনো শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়। সরকারি বিদ্যালয়ের অভাব রয়েছে দেশের অনেক স্থানে। বেসরকারি স্কুলের খরচ বেশি বলে অনেকে সন্তানদের মাদরাসায় পড়াতে পাঠান।
স্বাস্থ্য খাতেও একই অবস্থা। বেসরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে তো নিম্ন আয়ের মানুষ যেতে পারে না। দেশে দারিদ্র্যের একটি উৎসও এ স্বাস্থ্য। কারণ পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে এবং অসুস্থতার মাত্রা বেশি হলে তাকে প্রচুর ব্যয় করতে হয়। এজন্য অনেকে সহায়-সম্পত্তি হারান, আবার অনেকে ঋণগ্রস্ত হন। অনেকে শুধু চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যান। স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো আছে কিন্তু জনবল সংকট। কোনো সরকারই এ খাত দুটোকে লক্ষ্য ও সিরিয়াস কর্মসূচি হিসেবে নেয়নি। এজন্যই আজ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের এমন বেহাল দশা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাণিজ্যিক চেহারা নিয়ে জাতীয় সক্ষমতা গড়া সম্ভব না। সরকারের এ নিয়ে লক্ষ্য থাকলেও তার ভিত তৈরি হবে কী দিয়ে? সরকার বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও প্রাথমিক যে কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা সেগুলো আনতে পারেনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের একটা বড় ধরনের পুনর্গঠন করতে হবে। জনগণকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নের দর্শন দাঁড় করাতে গেলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে রাষ্ট্রের দায়িত্বই প্রধান হতে হবে।
গোটা বিশ্বেই রাষ্ট্র শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব নেয়। এখানে ভালো প্রকল্প থাকলে এবং উপযুক্ত দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা থাকলে মানবসম্পদ উন্নয়ন করা যায়। আর মানবসম্পদ উন্নয়ন করলে অর্থনৈতিক উন্নতি হতে বাধ্য। আমরা বরাবরই অনুসরণ করার পদ্ধতিতে আছি। যেমন আমাদের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা বৈশ্বিক কোনো মডেল বা প্রতিষ্ঠানের কথা বলি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও একই চিন্তা। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমাদের চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব নেয়। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বরাদ্দ জিডিপির ১০ শতাংশ। ইউরোপের অনেক দেশই এ দুটো খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে রাখে। তাদের উন্নয়ন এজন্য আটকে গেছে এমন নয়। জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতেই এ দুটো খাতে গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্নে এটাও কিন্তু ভাবতে হবে যে বাজেটের বরাদ্দ সঠিকভাবে বণ্টন করা হচ্ছে কিনা। এখানে আমাদের সমস্যা আসলে কোথায়?
শুরুতেই বলেছি এটা নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক দর্শনের অংশ। এখানে করপোরেট বিভিন্ন লবিস্ট গ্রুপই বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বাংলাদেশে দশকের পর দশক বিভিন্ন খাতের প্রকল্পের বিষয়টি দেখা যাক। যে খাতে প্রভাবশালী লবিস্ট আছে সে খাতে বরাদ্দ বেশি যায়। এটি আন্তর্জাতিক অংশের। আর দেশের ভেতর সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বড় করপোরেট গ্রুপ এবং আইএমএফ নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
এখন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বলতে শুধু নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকার ভাবলে হবে না। এর মাধ্যমে জনগণের সম্পদে ও নীতিনির্ধারণের কর্তৃত্ব আছে কিনা তাও নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনা করে যে বড় চুক্তি ও নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে তার অধিকাংশ বিষয় সম্পর্কেই সাধারণ মানুষ কিছু জানে না। তার জীবন, প্রাণপ্রকৃতি এমনকি সম্পদ নিয়ে চুক্তি হচ্ছে। অথচ সাধারণ মানুষই কিছু জানেন না। এভাবে বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন রেখে শুধু লবিস্ট আর স্থায়ী কিছু প্রতিষ্ঠান নীতিনির্ধারণ করলে বরাদ্দ বাড়ানো বা কমানোর বিষয়টি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে না। বণ্টনের এ প্রসঙ্গে তাই জনগণকে প্রকৃত তথ্য দিতে হবে। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। নীতিনির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। ভেতরকার অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে হবে। এগুলো নিয়ে প্রতিনিয়তই আসলে কথা হয়।
বর্তমানে আমরা জ্বালানি সংকটের মধ্যে রয়েছি। যদি আমদানিনির্ভর নীতিই অনুসরণ করা হয় তাহলে সামনে আমরা আরো বড় বিপদে পড়তে পারি। তবে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিকে জোর দিয়েছে। এ নিয়ে কিছু প্রস্তাবও আছে। আপনি এটিকে কীভাবে দেখছেন?
এ বাজেটে এ নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, কারণ জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের অর্থনীতিতে উৎপাদন নানাভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছে। বিষয়টা এখানেই বিস্ময়কর। কারণ আমরা অনেক পড়ে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি। এতদিন নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর সরঞ্জাম আমদানি করার ক্ষেত্রে শুল্ক ছিল। অথচ কয়লার ওপর শুল্ক ছিল না। এখন শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি ভালো। কিন্তু এটাও মনে রাখা জরুরি, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল প্রকল্পগুলো কিন্তু এখনো রয়ে গেছে। সেগুলোর সঙ্গে নতুন আরো কিছু যুক্ত হচ্ছে। এখন সরকার বলছে, আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাব। কিন্তু বাস্তবে অনবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের পরিকল্পনার পথে এগোচ্ছে।
জাতীয় সক্ষমতার ওপর জোর না দেয়ার সমস্যায় এ সরকারকে ভুগতে হচ্ছেই। তবে অতীতের জ্বালানি নীতির ক্ষেত্রে যে চুক্তি ও অংশীদারত্ব আছে সেগুলো থেকেও তো রাতারাতি বের হওয়া সম্ভব না। তবে আমরা শুরু করতে পারি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলো এ খাতে বড় ভূমিকা রাখবে। সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূতও জানিয়েছেন তাদের প্রতিষ্ঠান এলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। কিন্তু এখানে তো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের কাজ করারও ইতিহাস আছে। বরং এক্ষেত্রে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার বিষয়টিকে বেশি জোর দেয়া দরকার ছিল।
আমাদের নিজস্ব সক্ষমতার কথা জানাতে আমরা একবার একটি বিকল্প মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭ সালে দিয়েছিলাম। আমাদের গ্যাস যদি অনুসন্ধান-উত্তোলন করতে পারি ও পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তৈরি করতে পারি তাহলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি আমাদের ঝুঁকিতে ফেলবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গ্যাসভিত্তিক অর্থনীতি—এ দুইটা যদি আমাদের জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়ায়, তাহলে আমরা সুলভে, পরিবেশবান্ধব উপায়ে এবং টেকসই উপায়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের একটা টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ একটা ব্যবস্থা করতে পারব। সেই নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন পূরণ কঠিন। তবে সরকার বাজেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে এ ব্যাপারে। জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উদ্যোগের কথা আছে। এগুলো ভালো যদি বাস্তবায়ন করা যায়।
এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়ানোর বিষয়ে অনেকগুলো প্রস্তাব আছে। আবার নতুন করে বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহার পূরণের লক্ষ্যে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড চালু হয়েছে। মূল্যস্ফীতির এ সময়ে এগুলো মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি আনতে পারে?
বিএনপি সরকারের এসব উদ্যোগের পেছনে একটা প্রতীকী গুরুত্ব আছে। অর্থাৎ সরকারও বুঝতে পারছে বা স্বীকার করছে কোন কোন গোষ্ঠীকে সহযোগিতা দেয়া উচিত। ভারতে বিগত কয়েক দশকে এমন উদ্যোগ দেখা গেছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তারা এটিকে সফলও করেছে। এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটা অন্য রকম। বাংলাদেশে যাদের কাছে এসব সুবিধা যাবে তাদের জীবনের ওপর এর প্রভাবের কথা চিন্তা করা জরুরি।
অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানহীনতা, বেকারত্ব এমনকি তাদের আর্থিক অবস্থার মধ্যে এগুলো বড় পরিবর্তন আনতে পারবে না। এক্ষেত্রে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা তৈরি করলে আরো ভালো সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত বড় পরিসরে। একটা নির্দিষ্ট দামে ন্যূনতম পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে ভালো হতো। এখন অনেকে এও বলেন, এক্ষেত্রে অর্থায়ন বড় সমস্যা। সেটা কার্ড কর্মসূচির ক্ষেত্রেও। যেসব বিষয় সাধারণ মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো জরুরি।
রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য সরকারের কিছু পরিকল্পনা আছে। আবার কর ছাড়ের সুবিধাও দেয়া হয়েছে। এগুলোর কি কিছুটা সুফল পাওয়া যাবে?
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য বহুদিনের। করজাল বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রশ্ন আসে, কারা আসলে কর দিচ্ছেন? সমস্যা হলো কিছু কিছু বিষয় ইতিবাচক হলেও অর্থনৈতিক নীতিমালায় একটা বড় পরিবর্তন দরকার। সেক্ষেত্রে আমাদের বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামোটা রাখলে হবে না। বরং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চিন্তা করে নীতিমালা সাজাতে হবে।
কারণ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আদায় করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা চেপে বসতে পারে। সরকার পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর করের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলো পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ ফেলবে। সমাজে যারা ধনী তাদের ওপর প্রগতিশীল কর আরোপ করতে হবে। আবার সরকারের আরেকটা বড় ঝুঁকি বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়া। এগুলোর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমবে। তখন তার প্রভাবও কিন্তু অর্থনীতিতে পড়বে। বাজেটে সরকারের অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে বরাদ্দের গুণগত বাস্তবায়ন ছাড়া বাস্তবে কোনো ভালো ফল মিলবে না।

