ডেঙ্গু ২০২৪ সালেও অন্যান্য বছরের মতোই ভয়াবহ রূপে ফিরে এসেছিল, কমানো যায়নি হাসপাতালে ভর্তির হার। অথচ ওই বছরই ডেঙ্গু নিয়ে কোনো গবেষণা প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ের অনেক গবেষণা সারা বছর চলে, বিভিন্ন ঋতুতে তার পরিবর্তন, অভিযোজন ও বৃদ্ধি দেখার জন্য। এ রকম গবেষণাগুলোও বাধাগ্রস্ত কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে গত ছয় মাসে কোনো অনুদান না থাকার কারণে। নতুন বছর শুরু হয়েছে গবেষণা সচল করার একটা চ্যালেঞ্জ বিজ্ঞান উপদেষ্টার সামনে রেখে।
দেশের অধিকাংশ গবেষণা চলে বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান কিংবা স্বাস্থ্য কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুদানে। এই অনুদানগুলো বন্ধ আছে সাত মাস ধরে। বাংলাদেশে গবেষণা নেই—এ অভিযোগ প্রায় সবার। উদ্ভাবনও নেই এটাও সত্য। কিন্তু কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, ভেটেরিনারি, সমুদ্রবিজ্ঞান, অ্যাপস উদ্ভাবন, ডায়রিয়া, কলেরা—এসব ক্ষেত্রে গবেষকেরা যে সাফল্য দেখাচ্ছেন। তাহলে গবেষণা ও বিজ্ঞানচর্চা কেন কোনো সরকারেরই লক্ষ্য ও কাজের প্রাধান্যের তালিকায় থাকে না?
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক আর প্রশাসনিক সংস্কার, এসব দেখে আমরা আশাবাদী হই। কিন্তু বিজ্ঞানক্ষেত্রে গবেষণা ও পড়াশোনার পদ্ধতিকে ‘হাই প্রায়োরিটি’ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ঢেলে সাজানোর কথা কোথাও আমরা শুনছি না কেন?
নতুন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে কথা হচ্ছে। গত বছর শুরু হওয়া এবং সমালোচিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কতটুকু রাখা হবে, এটা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা এগোচ্ছে না। বিজ্ঞানশিক্ষা নিয়ে পরিবর্তন ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের জন্য ৩০ বছর ধরে সবাই বলে আসছে। ২০২৩-২৪–এ চালু হওয়া পদ্ধতি নিয়েও অনেক অনেক প্রশ্ন আছে। সে ক্ষেত্রে এর মাঝামাঝি কিছু দরকার। এটা নিয়ে কতটুকু ভাবা হচ্ছে? সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মুক্ত আলোচনা হয়েছে? জেলায় জেলায় আগে এর প্রাথমিক ধারণা নিয়ে কথা বলে বসার ভাবনাগুলো এক করে তারপর সিদ্ধান্তে আসতে হবে। না হলে বিতর্ক, হতাশা বাড়তেই থাকবে। আমরা আশা করি, পাঠ্যবই নিয়ে ৩০ বছর ধরে যেভাবে মশকরা করা হচ্ছে, তা বন্ধ হবে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার গিনিপিগ বানানো বন্ধ হবে। পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে হাজির করা শিক্ষা উপদেষ্টার জন্য একটা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ।
কোভিড-১৯ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুরু হয়েছে সেশনজট। একের পর এক হাজির হচ্ছে বিভিন্ন সমস্যা আর দীর্ঘায়িত হচ্ছে সেশনজট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত বছর তৈরি হওয়া তিন থেকে চার মাসের সেশনজট। এই জট নিরসনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না। সরকারিভাবে মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা আসা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও ধরেই নেওয়া হয় তাঁদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা লাগবে না। ভালো গবেষণাগার, প্রেজেন্টেশন, প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ—এসব তাঁদের প্রয়োজন নেই। বছরে এক দিন ক্লাস করেই পরীক্ষা দেওয়া যাবে। এ কেমন অদ্ভুত শিক্ষাপদ্ধতি? একটা দেশের লাখ লাখ ছেলেমেয়ের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এ কেমন মশকরা? তার ওপর সাত কলেজকে কী এক অদ্ভুত কারণে যুক্ত করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। একই ধারা অব্যাহত রাখতে বিচিত্র কোনো এক রাজনৈতিক কারণে গত বছর ৯টি কলেজকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে। এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে হলে পাঠদান, গবেষণা, সুযোগ-সুবিধা—সবকিছুতে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপর্যায়ে আগে উন্নীত করা হোক।
একটি কলেজ ইতিমধ্যে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছে, যদিও সরকারি অনুমোদন নেই এখনো। কিন্তু যদি বাকি ১৬টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হতে চায়, সে ক্ষেত্রে এই ধারা কীভাবে বন্ধ করা যায় তা নিয়ে খুব গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতেই হবে। আমরা কি জেলায় জেলায়, পাড়ায় পাড়ায় আর মহল্লায় মহল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির যে অদ্ভুত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা অব্যাহত রাখব নাকি উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করব এবং সীমিত আকারে যোগ্য ও দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করব? শিক্ষা উপদেষ্টা, একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে আপনার সুদক্ষ ভূমিকা দেখে আমরা আশাবাদী হতে চাই, আপনি শিক্ষার মান নিশ্চিতের এ চ্যালেঞ্জকে অন্যতম প্রাধান্য হিসেবে দেখবেন।
মেধাবী শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীদের স্বীকৃতি না দিলে কখনোই অন্য বিজ্ঞানী ও পরবর্তী প্রজন্ম উৎসাহিত হবে না। তিন বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে সেরা শিক্ষার্থী ও সেরা গবেষকদের পুরস্কার প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ও ইউজিসি স্বর্ণপদক। এই স্বর্ণপদকের যাঁরা যোগ্যতা অর্জন করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই চলে যাচ্ছেন দেশের বাইরে। যাকে দেওয়া হবে এই পুরস্কার, সে–ই যদি না থাকে, তাহলে কী লাভ পাঁচ–ছয় বছর পর এই আয়োজন করে? প্রতিবছর একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, রোকেয়া পদক, পরিবেশ পদক একদম নিয়ম অনুযায়ী হয়। কিন্তু গবেষকদের জন্য প্রবর্তিত পদকগুলো কেন তিন–চার বছর স্থগিত করে রাখা হয়? কেন রাষ্ট্রীয়ভাবে গবেষকদের উৎসাহিত করা হয় না?
দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে এখনো স্থবিরতা চলছে। অনেক গবেষণা প্রকল্প থমকে গেছে। অনেক ল্যাবের প্রধানকে বদলি করে দেওয়ায় ল্যাবরেটরি কীভাবে চলবে, সেটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি, বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টসের মতো বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো চলছে অস্থিরতা। বিজ্ঞান গবেষণাকে নিয়মিত যাত্রায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে দেশের অনেক দৈনন্দিন গবেষণাকাজ মুখ থুবড়ে পড়বে। বিজ্ঞান উপদেষ্টাকে ভাবতে হবে, কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়।
একটা দেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে সামগ্রিকভাবে ‘শিক্ষা’কে। তার সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণাকে। যত কম গবেষণা হবে, তত কম উদ্ভাবন আসবে, সমস্যা সমাধানে দেশের গবেষকদের অবদান তত কমে যাবে। আর আমরাও ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাব। আফ্রিকার কিছু দেশের মতো সবকিছুর জন্য অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ব। কনফুসিয়াস বলেছিলেন, প্রতিটি জিনিসেরই একদম নিজস্ব একটি সৌন্দর্য আছে। গবেষণার সৌন্দর্যটাও আমাদের সরকারকে অনুধাবন করতে হবে।
ড. আদনান মান্নান (অধ্যাপক ও গবেষক), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
(সূত্র: প্রথম আলো)

