জার্মানির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে দেশটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ২৩ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল শুধু নয়, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) নতুন শক্তি সঞ্চার করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চরম ডানপন্থিদের প্রতিহত করতে যে রাজনৈতিক নীতিমালা কার্যকর ছিল, সেটিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি জার্মান গণতন্ত্রকে এক নতুন অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীদলীয় নেতা ফ্রেডরিখ মার্জের কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই পরিবর্তনের পথ সুগম করেছে। মার্জ মধ্য-ডানপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস (সিডিইউ) দলের নেতা ও জার্মানির পরবর্তী চ্যান্সেলর হওয়ার দৌড়ে অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী। তিনি ইউরোপপন্থী, বাজার অর্থনীতির সমর্থক এবং ন্যাটোর ঘনিষ্ঠ, তবে জনতুষ্টিবাদ বা জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের অনুসারী নন। তবুও, এএফডির জনপ্রিয়তাকে ঠেকাতে গিয়ে তিনি কিছু রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছেন, যা তাঁর বিশ্বস্ততা ও নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন তুলেছে।
ইতিহাস বলছে, জার্মানির খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) দল গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার অন্যতম স্তম্ভ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই দল গঠিত হয়েছিল, যাতে অতীতের চরমপন্থী ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সিডিইউর প্রথম নেতা কনরাড অ্যাডেনাউয়ার ছিলেন রক্ষণশীল, তবে তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে দলটির কিছু অংশ ডানপন্থি চাপে নতি স্বীকার করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চরম ডানপন্থিদের উত্থান ও তাদের রাজনৈতিক আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা নতুন নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি এই প্রচারণাকে আরও উৎসাহিত করেছে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের বক্তব্য। ২৫ জানুয়ারি এএফডির এক প্রচারণা ভিডিওতে তিনি বলেন, অতীতের অপরাধের প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগ না দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি এই মন্তব্য করেন আউশভিৎস মুক্তির ৮০তম বার্ষিকী উদযাপনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, যা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, মূলধারার দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বিতর্কে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা মার্জকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন এবং অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি চরম ডানপন্থিদের জন্য সুযোগ তৈরি করছেন। যদিও মার্জ সরাসরি চরম ডানপন্থিদের সমর্থন করেন না, তবুও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি কিছুক্ষেত্রে তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, যদি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জার্মানি অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি রক্ষণশীল সংখ্যালঘু সরকারের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যেখানে এএফডির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এটি শুধু জার্মানির জন্য নয়, পুরো ইউরোপের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জর্গ লাউ: জার্মান সাপ্তাহিক ‘ডাই জেইট’-এর আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা; দ্য গার্ডিয়ান। ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান।

