আগামী সপ্তাহে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এর বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হবে, যা বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিল। তবে, সেই নির্বাচনের প্রভাব এখনও বিদ্যমান রয়েছে। দেশ ক্রমাগত স্বৈরশাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বৈধতা সংকটে থাকা একটি সরকার সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। গত এক বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার ‘প্রিভেনশন অফ ইলেকট্রনিক ক্রাইমস অ্যাক্ট’ (পেকা)-এ সংশোধনী এনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এই বিতর্কিত আইন কার্যকর হওয়ার ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়েছে।
দেশজুড়ে সাংবাদিকরা এই কঠোর আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে, যা শুধুমাত্র সাংবাদিকদের নয়, বরং সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এমনকি ব্যক্তিগত বার্তা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, যা সামরিক শাসনকালেও দেখা যায়নি।
সরকার দাবি করছে, পেকার উদ্দেশ্য ভুয়া খবর ও মানহানিকর তথ্য রোধ করা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের মূল উদ্দেশ্য হল বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করা, কারণ প্রচলিত গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পাওয়ায় জনগণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছে।
রাজনৈতিক দলগুলো ভুলে যাচ্ছে যে, ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে এই আইন ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত অনেক তথ্য সত্যিই ক্ষতিকারক, তবে এই আইনের মূল লক্ষ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা।
সরকার পেকার অধীনে একাধিক নতুন বিভাগ চালু করেছে এবং তাদের ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছে, যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিচারপতি এবং সামরিক কর্মকর্তাদের সমালোচনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব বিধিনিষেধ মূলত স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। 
এই আইনের আওতায় গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল যেকোনো নাগরিককে তিন বছরের কারাদণ্ড দিতে পারবে, এমনকি আপিলের সুযোগ থাকবে শুধুমাত্র সুপ্রিম কোর্টে। আইনের সমর্থনে বর্তমান জোট সরকারের অবস্থান অত্যন্ত দ্বিমুখী, কারণ বিরোধীদলে থাকাকালীন তারা এই আইনটির বিরোধিতা করেছিল।
বিশেষত, পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ভূমিকা সন্দেহজনক। একদিকে দলটি সংসদে এই আইনের পক্ষে ভোট দিয়েছে, অন্যদিকে জনগণের সামনে তারা পরামর্শমূলক আলোচনার পক্ষে কথা বলেছে।
ইসলামাবাদ হাইকোর্টে সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নষ্ট করার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ। রাতারাতি বিচারকদের রদবদলের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারকদের সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করা হয়েছে, যাতে সরকার মনোনীত প্রধান বিচারপতিকে দায়িত্ব দেওয়া যায়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পাঁচজন হাইকোর্ট বিচারক তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তা উপেক্ষিত হয়েছে।
এই স্বৈরাচারী মনোভাব শুধু বিচার ব্যবস্থাকেই নয়, জাতীয় নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে জানুয়ারি মাসেই নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৬০ জন সদস্য নিহত হয়েছে। শুধুমাত্র জানুয়ারির শেষ দিনে বেলুচিস্তানের কালাত জেলায় ১৮ জন সেনা সদস্য নিহত হন, যা বিদ্রোহীদের শক্তি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
প্রায় ২৫ বছর ধরে চলমান বেলুচিস্তানের কম মাত্রার সংঘাত এখন পূর্ণমাত্রার বিদ্রোহে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় জনগণ ক্রমেই রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে, বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত প্রাদেশিক প্রশাসন কার্যত ভেঙে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে, যা জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে।
ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী দমননীতি জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে, যা ভবিষ্যতে শাসক দলগুলোর জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক- সাহিত্যিক ও সাংবাদিক; এক্স (টুইটার):@hidhussain সূত্র: DAWN. ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

