মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, কানাডা, মেক্সিকো এবং চীনের ওপর ব্যাপকহারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যে ২৫ শতাংশ এবং চীনের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিতে বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন ও মাদক প্রবাহ, বিশেষ করে ফেন্টানাইলের হুমকির বিরুদ্ধে নেওয়া জরুরি পদক্ষেপ।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার দাবি, এসব শুল্ক আরোপের ফলে মার্কিন অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং কর ব্যবস্থার পরিবর্তে এটি আয় বৃদ্ধির বিকল্প পথ হবে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কানাডা, মেক্সিকো ও চীন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। চীন মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়, যার মধ্যে ছিল অপরিশোধিত তেল, এলপিজি এবং কৃষিজাত পণ্য। পাশাপাশি, চীন গুগলের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ট্রাস্ট তদন্তের ঘোষণা দেয় এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানায়।
ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক বাজারে। এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন ঘটে, বিনিয়োগকারীরা সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ জানান।
বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ী পল ক্রুগম্যান ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘গিয়ারে বালি ঢেলে দেওয়ার মতো ক্ষতিকর’ বলে অভিহিত করেন। তবে মেক্সিকো ও কানাডার ওপর শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে, উভয় দেশের নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প এক মাসের জন্য শুল্ক আরোপ স্থগিত করেন। উভয় দেশও সীমান্তে মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসন রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ট্রাম্পের এই অনির্দিষ্ট দোলাচলমূলক নীতি তার দর-কষাকষির কৌশলেরই অংশ, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা হয়। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে চীনের কম মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের এই শুল্ক যুদ্ধ সহজে শেষ হবে না এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উচ্চ শুল্কের কারণে আমেরিকায় ভোক্তা দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া এবং রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে কৃষি ও অটোমোবাইল শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ইতোমধ্যে এসব খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো শুল্ক বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
শুধু অর্থনৈতিক প্রভাবই নয়, কূটনৈতিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানকে দুর্বল করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তারা পাল্টা ব্যবস্থা নেবে এবং প্রযুক্তি খাতের ওপর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলতে পারে। ‘দি ইকোনমিস্ট’ বলেছে, ‘সাধারণত বুলিরা নিজেদের সমান শক্তিধর প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করে না।’ ট্রাম্প এখনও চীনের ওপর ৬০ শতাংশ শুল্ক বসানোর ঘোষণা কার্যকর করেননি, যা তিনি নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বিশ্ব এখন বহুমেরুভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বজায় রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা ট্রাম্পের নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। যদি নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে ইইউ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে প্রস্তুত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। এতে মার্কিন অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
লেখক- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সূত্র: DAWN. ভাষান্তর- এফ. আর. ইমরান

