সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যকার গোপন সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওয়াশিংটনে চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, প্রায় তিন বছর ধরে উভয় দেশের মধ্যে গোপন সম্পর্ক রয়েছে। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
যদি নেতানিয়াহুর দাবি সত্য হয়, তাহলে এটি স্পষ্ট যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনের অংশ হিসেবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পশ্চিমা সমর্থন নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
২০১৭ সালে গোপনে ইসরায়েল সফর করেছিলেন যুবরাজ সালমান। এরপর থেকেই ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ফিলিস্তিনের উচিত ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করা অথবা চুপ থাকা।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের ইসরায়েলে হামলার আগ মুহূর্তে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করার ব্যাপারে সৌদি আরব ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও হামাসের হামলার পর কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে দেশটি। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে রিয়াদ।
ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মধ্যেও সৌদি আরবে ফিলিস্তিনপন্থী কোনো বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। গাজার পরিস্থিতির অবনতি হলেও দেশটিতে একের পর এক উৎসব চলতে থাকে। তবে সম্প্রতি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলে সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। রিয়াদ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার অবিচল।
এছাড়া, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে না বলে জানানো হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সৌদি ভূখণ্ড ব্যবহারের প্রস্তাব দিলে আরব বিশ্বে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মিসর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানায়। সৌদি আরবও এটিকে ‘নাটকীয় অপপ্রচার’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সূচনা থেকেই ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে ইসরায়েল। তবে সৌদি আরব এখন ফিলিস্তিনের অধিকারের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুবরাজ সালমানের নীতি পরিবর্তনের ফলে আরব বিশ্বও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল ফিলিস্তিনি রুমাল গলায় জড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছেন যে, শুধু আরব ও মুসলিম বিশ্ব নয়, ইউরোপকেও সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘সম্মিলিত পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ২৭ ফেব্রুয়ারি মিসরের আহ্বানে আরব লিগের জরুরি বৈঠক বসছে, যেখানে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব বিশ্বের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হবে। সৌদি আরবের বর্তমান নীতিগত পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তকে প্রধান্য দেবে।
সূত্র: বিশ্লেষণ; Middle East Eye. ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

