জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রোরি মুনগোভেন। জুলাই–আগস্টে বাংলাদেশে তৎকালীন সরকারের নৃশংসতার ঘটনাগুলোর তদন্তে জাতিসংঘের যে তথ্যানুসন্ধানী দল কাজ করেছে, সেই দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল রোরি মুনগোভেনের। গতকাল বুধবার এই তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় জেনেভা থেকে প্রথম আলোর সঙ্গে জুমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন রোরি মুনগোভেন। সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হল:
প্রশ্ন: ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ৫৮তম অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এ অধিবেশনে কি বাংলাদেশের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হবে?
রোরি মুনগোভেন: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অনুরোধে এই তথ্যানুসন্ধান পরিচালিত হয়েছিল। অর্থাৎ সদস্যদেশের অনুরোধে এই তদন্ত হয়েছে। এটা কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। যেটা অতীতে বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ। আসন্ন অধিবেশনে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার সাধারণ আলোচনার অংশ হিসেবে প্রতিবেদনের বিষয়টি সম্পর্কে সদস্যদেশগুলোকে অবহিত করবেন। তবে আমরা এই প্রতিবেদন নিয়ে ব্রিফিংয়ের পাশাপাশি সদস্যদেশ ও নাগরিক সমাজকে যুক্ত করে একাধিক আলোচনার আয়োজন করতে পারি।
প্রশ্ন:গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করা হয়েছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে। তাঁদের দুজনই তো এখন ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁদের ফেরানোর বিষয়ে কিছু করার আছে?
রোরি মুনগোভেন: অপরাধী যদি দেশের বাইরে থাকেন, তখন সর্বজনীন এখতিয়ার (ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন) ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যে দেশে অপরাধী অবস্থান করছেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙঘনের অপরাধের বিচার করতে সে দেশকে সম্মত হতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এ বিষয়ে তদন্তের জন্য বলতে পারে। কিন্তু ভারত নির্যাতনবিরোধী সনদ অনুসমর্থন করেনি। ফলে তাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে ভারতের জন্য ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন প্রযোজ্য হবে না। আবার ভারত রোম সনদ সই না করায় আইসিসির তদন্তের বিষয়টি কাজে আসবে না। তবে আমরা মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে সবাইকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের অনুরোধ জানাই।
প্রশ্ন: তাহলে তো ভারত থেকে তাঁদের ফেরানোর ক্ষেত্রে বাধা রয়ে গেছে। কারণ, ভারত তো দুটি প্রক্রিয়ার একটিতেও পক্ষ নয়।
রোরি মুনগোভেন: আমরা বাংলাদেশকে তদন্তে সহায়তার পাশাপাশি টাকা পাচার ও দুর্নীতি দূর করার কাজে সহায়তার জন্য বিভিন্ন দেশকে অনুরোধ জানাই।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি সই হয়েছে। এখন ভারত থেকে তাঁদের ফেরানোর ক্ষেত্রে কি বাধা দেখেন?
রোরি মুনগোভেন: বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছে। আমাদের বার্তা হচ্ছে, যথাযথ প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে যদি বিচার এগিয়ে যায়, তাতে যেন বাংলাদেশকে সহায়তা করা হয়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ তো এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিচারপ্রক্রিয়ায় সহায়তা পেতে বাংলাদেশ চাইলে কি জাতিসংঘ তাদের তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্যপ্রমাণ দেওয়ার জন্য তৈরি আছে?
রোরি মুনগোভেন: প্রায় দুই মাসের তদন্ত পরিচালনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সাক্ষ্যপ্রমাণ আমরা সংগ্রহ করেছি। কয়েক শ সাক্ষাৎকার নিয়েছি। কয়েক হাজার ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেছি। জোগাড় করেছি বিপুল পরিমাণ সরকারি নথি। বেশ সতর্কতার সঙ্গে এসব মহাফেজখানায় সযত্নে রেখেছি। এমনভাবে এসব রেখেছি, যাতে প্রয়োজন হলে এসব সাক্ষ্যপ্রমাণ ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু কোনো দেশের বিচারপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করার ক্ষেত্রে আমাদের কয়েকটি মানদণ্ড মেনে চলতে হয়।
প্রথমত, যাঁরা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং নথিপত্র দিয়েছেন, তাঁদের অনুমতি আমাদের নিতে হবে। এর পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে সাক্ষীর সুরক্ষার বিষয়টি। বিশেষ করে আমাদের তদন্তে যাঁরা সহায়তা করেছেন, তাঁরা যেন ভবিষ্যতে কোনো প্রতিহিংসার শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে জাতিসংঘ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না। অর্থাৎ জাতিসংঘ এমন কোনো বিচারপ্রক্রিয়াকে সমর্থন করে না, যেখানে চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এটা জাতিসংঘের সব সদস্যদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
প্রশ্ন: বিষয়টা কি এমন যে মৃত্যুদণ্ড রহিত না হলে বিচারপ্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে না?
রোরি মুনগোভেন: মৃত্যুদণ্ডের বিধানটি আমাদের সহায়তার পথে বড় বাধা। আর অন্তর্বর্তী সরকারও আমাদের এই অবস্থানের বিষয়ে অবগত। আমরা এরই মধ্যে আমাদের প্রতিবেদনেও তা উল্লেখ করেছি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ এরপর কী পদক্ষেপ নেবে?
রোরি মুনগোভেন: বাংলাদেশের জটিল এই সময়ে এই প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। বিশেষ করে সংস্কারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, সবচেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে সহায়তা করা। এ বিষয়গুলোতে সরকারকে সহায়তার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন তৈরি আছে।
ধন্যবাদ।

