মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজায় জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান, বিশেষ করে সৌদি আরবের আপাত কঠোর প্রতিক্রিয়ার পরেও, আগামী সপ্তাহে বোঝা যাবে যে এটি শুধুই কথার কথা ছিল নাকি বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক গাজা থেকে উচ্ছেদ করে একটি নতুন পর্যটন এলাকা- ‘মিডল ইস্টের রিভিয়েরা’ গড়ে তোলার ধারণা রয়েছে।
আগামী বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের নেতৃত্বে কাতার, মিসর, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি ‘আরব পরিকল্পনা’ নিয়ে বৈঠক করবে, যা মিসর প্রস্তুত করছে ২৭ ফেব্রুয়ারির কায়রোতে অনুষ্ঠিতব্য আরব সম্মেলনের আগে। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো গাজায় শান্তি ও পুনর্গঠন নিশ্চিত করা, তবে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ছাড়া।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল ওতাইবা দুবাইয়ে এক বক্তব্যে বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের পরিকল্পনার কোনো বিকল্প দেখছেন না। এর ফলে আরব বিশ্বের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে সন্দেহ আরো বেড়েছে। বিশেষ করে: আব্রাহাম চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইসরায়েলি সেনাদের আইনগত ঝামেলা ছাড়াই সেখানে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকায় এই সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, আরব ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের অবস্থান আসলে দ্বিমুখী। একদিকে তারা গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর বিবৃতি দিচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। ইসরায়েল যখন গাজায় কঠোর অবরোধ জারি করেছে এবং সেখানে কেবলমাত্র সামান্য পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশ করতে দিয়েছে, তখনই সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও জর্ডান ইসরায়েলের দাবি অনুসারে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাদের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলে মালবাহী সরবরাহে কোনো বাধা দেয়নি (যদিও জর্ডান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে)।
তুরস্কও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়েছে, তবে আজারবাইজান থেকে জর্জিয়া ও তুরস্কের সেহান বন্দর হয়ে বাকি-তিবলিসি-সেহান পাইপলাইনের মাধ্যমে ইসরায়েলে তেল সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, যা তাদের মোট তেল চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণ করে।
এছাড়া, এরদোয়ান সরকার সিরিয়ায় তার প্রক্সি গোষ্ঠী HTS-এর উত্থানকে সহায়তা করেছে, যার ফলে ইসরায়েল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোলান মালভূমির অংশ এবং মাউন্ট হেরমন দখল করতে সক্ষম হয়েছে। এই স্থান থেকে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন, বেকা উপত্যকা এবং দামেস্ক পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
তবে, কিছু আরব দেশ ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। মিসর স্পষ্টভাবে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে দুটি প্রধান কারণে-
(এক) এটি মুসলিম ব্রাদারহুড ও হামাসের উত্থানকে উৎসাহিত করতে পারে, যা প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকার কঠোরভাবে দমন করেছে।
(দুই) গাজা থেকে আসা যোদ্ধারা ভবিষ্যতে কোনো অভিযান চালালে ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণ করলে মিসর তাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
জর্ডানও উদ্বিগ্ন- কারণ দেশটির ৩৫ শতাংশ জনসংখ্যা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। যারা গাজায় গণহত্যা, পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে ইসরায়েলের দমন-নীতিতে ক্ষুব্ধ। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের আরেকটি ঢল পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
সৌদি আরবের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। দেশটি বরাবরই ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’কে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে।
সৌদি আরবের সরকারি নীতিমালা, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও কূটনীতিকরা বারবার বলছেন, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব নয়।
কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুৎলাক আল-মুতাইরি বলেছেন, সৌদি আরব ‘আরব পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের জন্য ইজিপ্ট ও জর্ডানের ক্ষতিপূরণ দিতেও প্রস্তুত- যদি ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সাহায্য বন্ধ করে দেয়।
তবে ট্রাম্পের কৌশল বরাবরই কঠোর অবস্থান নিয়ে দরকষাকষি করা, তাই তার পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু যা স্পষ্ট, তা হলো ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূমি রক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আপনজনদের হারিয়েও তারা বলছে, ‘আমরা কোথাও যাব না।’
এরই মধ্যে মিসরের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিশাম তালাত মোস্তাফা গাজায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন, যা ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তার প্রস্তাব অনুযায়ী, তিন বছরে ২০০,০০০ নতুন আবাসন নির্মাণ করা হবে। যেখানে ১.৩ মিলিয়ন মানুষ থাকতে পারবে। এর জন্য ৪০-৫০টি নির্মাণ কোম্পানিকে কাজে লাগানো হবে এবং ২০ বিলিয়ন ডলার শুধুমাত্র আবাসন নির্মাণের জন্য ব্যয় করা হবে। অবকাঠামোর জন্য ৪ বিলিয়ন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্য খাতে ৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ থাকবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিকল্পনা কি মিসরের আগে থেকেই প্রস্তুত করা পরিকল্পনার অংশ? আরব নেতারা কি প্রমাণ করতে পারবেন যে ১৯১৯ সালে মিসরের জাতীয়তাবাদী নেতা সাদ জাগলুল ভুল বলেছিলেন, যখন তিনি আরব ঐক্যের ধারণাকে ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন করেছিলেন—‘‘শূন্য যোগ শূন্যের ফলাফল কী?’’
লেখক: ডন-এর সাবেক সম্পাদক। সূত্র: DAWN. ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

