প্রযুক্তি আমাদের গতি, উদ্ভাবন, তথ্যের বিস্তৃত প্রবাহ এবং সংযুক্তি এনে দিয়েছে। তবে এটি আমাদের মানবিক গুণাবলির উপর কী প্রভাব ফেলছে- সে বিষয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।
সামাজিক মূল্যবোধ সবসময় পরিবর্তনের মুখে পড়ে, তবে অতীতে এই পরিবর্তন ছিল ধীর। আমাদের পূর্বপুরুষদের মূল্যবোধ স্থির মনে হতো। কিন্তু ডিজিটাল যুগ সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেছে। অতীতে আমাদের জন্মস্থান বা বেড়ে ওঠার স্থানগুলোর প্রতি একধরনের আবেগী বন্ধন ছিল, যা আজকের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে স্থানীয়তা ও আনুগত্যের অনুভূতি হ্রাস পেয়েছে।
বাড়তে থাকা স্ক্রিন-টাইম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সুস্থ আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগও কমে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামনে এমন সব মূল্যবোধ উপস্থাপন করছে, যা প্রথাগত পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এটি সম্পর্ক, বিবাহ এবং সন্তান লালন-পালনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাস্তব সাফল্য ও সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি হওয়ায় ব্যক্তি ও পরিবারে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের ডিজিটাল জগতে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ততা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, যা মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে প্রযুক্তি সংযোগ বাড়ালেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুণগত মান অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।
তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এটি দূরবর্তী পরিবারের সদস্যদের ভিডিও কল ও বার্তার মাধ্যমে সংযুক্ত রেখেছে, যা পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় রাখতে সহায়ক। অভিভাবকেরা এখন অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল টিউটরিং ও শিশুদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুবিধা পাচ্ছেন।
প্রযুক্তি নারী ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে। এটি নারীদের জন্য শিক্ষালাভ, ক্যারিয়ার গঠন ও আর্থিক স্বাধীনতার সুযোগ উন্মুক্ত করেছে। একইভাবে- প্রযুক্তির মাধ্যমে বঞ্চিত সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করার সুযোগ পাচ্ছে। কর্মজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে বৈবাহিক সম্পর্কের ধরণেও পরিবর্তন আসছে, যার ফলে দেরিতে বিবাহের প্রবণতা বাড়ছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
গ্লোবালাইজেশন এবং প্রযুক্তির প্রসার বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিকে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মধ্যে বিয়ের হার বেড়েছে, যা পরিবার কাঠামোকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
প্রযুক্তি সময় সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন সুবিধা এনেছে, যেমন অনলাইন বিল পরিশোধ, ই-ব্যাংকিং ও অনলাইন কেনাকাটা ইত্যাদি। এতে দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমেছে এবং সামাজিক কার্যক্রমের জন্য বেশি সময় পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মানুষকে মানসিক সমর্থন ও উদ্বুদ্ধ করার জন্য নতুন নতুন সম্প্রদায় তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে।
প্রযুক্তি ও গোপনীয়তা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ গোপনীয়তাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার ব্যক্তিগত তথ্যের সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা কখনো কখনো অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো ও ডিজিটাল সচেতনতা অপরিহার্য।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তবে এটি নৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। গোপনীয়তা ও সুবিধার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তা সত্ত্বেও- গোপনীয়তা রক্ষার প্রচেষ্টা মানব মর্যাদার স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অবশ্যই, বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ছাড়া মানবজীবন কষ্টসাধ্য। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো- নতুন প্রজন্ম কিভাবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে। এটি তাদের মানবিক সম্পর্ক বোঝার সুযোগ ও সময় সীমিত করে দিচ্ছে।
লেখক- পাকিস্তান: ইন বিটুইন এক্সট্রিমিজম অ্যান্ড পিস গ্রন্থের লেখক। সূত্র: DAWN. ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

