মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- দায়িত্ব গ্রহণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। যদিও বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি, তবে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই এই যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগ দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে এক টেলিফোন আলোচনার পর ‘যুদ্ধের কারণে প্রাণহানি রোধের’ বিষয়ে একমত হওয়ার ঘোষণা আসে। এর পরপরই সৌদি আরবে একটি সম্ভাব্য শীর্ষ সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৩ ফেব্রুয়ারি, ব্রাসেলসে ন্যাটো সদর দপ্তরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলগত অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনের পক্ষে তার সম্পূর্ণ ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয় এবং আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখতে ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টিও বাদ দিতে হবে।
এই অবস্থানের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত ২০০৮ সালের মার্কিন-ইউক্রেন কৌশলগত অংশীদারত্ব সনদকে অকার্যকর ঘোষণা করেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো একে ‘ইউক্রেনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। যদিও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে পশ্চিমা সম্পর্কের গতিপথ বিবেচনায় এটি প্রত্যাশিতই ছিল।
পশ্চিমাদের প্রতিশ্রুতি ও ইউক্রেনের বাস্তবতা-
পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনকে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যা ইউক্রেনকে আপসের পথ পরিহার করে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ জেতা ইউক্রেনের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
গত তিন বছরে পশ্চিমা দেশগুলো অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে রাশিয়াকে মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। তবে রাশিয়া সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ হওয়ায় সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলাই যুক্তিযুক্ত মনে করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
ন্যাটোর অবস্থান পরিবর্তন-
ন্যাটোর নতুন মহাসচিব মার্ক রুটে ১৪ ফেব্রুয়ারি জানান, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। অথচ ডিসেম্বরে তিনি ইউক্রেনের সদস্যপদ পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, ন্যাটো ইউক্রেন নিয়ে তার পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে আসছে।
শান্তিরক্ষী মোতায়েন ও ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা-
ট্রাম্প প্রশাসন পুরোপুরি ইউক্রেনকে উপেক্ষা করছে না। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপীয় এবং অন্যান্য অঞ্চলের শান্তিরক্ষী মোতায়েনের পরিকল্পনা বিবেচনাধীন। তবে কোনো মার্কিন সেনা পাঠানো হবে না এবং ন্যাটো বাহিনীও সরাসরি এতে জড়াবে না।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একাধিক বিকল্প উপস্থাপন করছেন। তিনি ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে নতুন ইউরোপীয় সামরিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনকে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা ইউক্রেনের সম্পদ দখলের মতো নীতিতে আগ্রহী।
নিষ্কর্ষ-
ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান গতিধারা ও পশ্চিমা বিশ্বের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইউক্রেনের সামনে ভালো কোনো বিকল্প নেই। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা থাকলেও, এটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। ইউক্রেনের নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করা এবং রাশিয়া ও পশ্চিমাদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাই একমাত্র স্থায়ী সমাধান হতে পারে।
লেখক- লিওনিড রাগোজিন; ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। সূত্র: আল-জাজিরা। ভাষান্তর- এফ.আর. ইমরান

