প্রতি বছরই বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে যেসব আলোচনা হয় তার বিষয়বস্তুতে আশ্চর্য মিল থাকে। সংখ্যাগুলোয় সেটা জিডিপি প্রবৃদ্ধি হোক বা খাতভিত্তিক বরাদ্দ হোক হয়তো কিছু তফাৎ হয়।
প্রতি বছরই বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে যেসব আলোচনা হয় তার বিষয়বস্তুতে আশ্চর্য মিল থাকে। সংখ্যাগুলোয় সেটা জিডিপি প্রবৃদ্ধি হোক বা খাতভিত্তিক বরাদ্দ হোক হয়তো কিছু তফাৎ হয়। এবারো সেগুলো আলোচিত হচ্ছে। তার দুই-তিনটি দিক এখানে পুনর্ভাবনার জন্য উল্লেখ করা হবে। কারণ এখন দেশের পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। বর্তমান সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক। উন্নয়ন কৌশল গ্রহণে এ সরকারের সামনে প্রতিবন্ধকতা যেমন আছে, তেমনি অতীতের রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত বাধ্যবাধকতা ভনিতা অপসারিত হয়েছে। সেটা মনে রেখে এ আলোচনার অবতারণা।
প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ও বিগত বছরের অর্জন এ বাজেটে কীভাবে আসবে। অতীতে অর্জন বাড়িয়ে দেখানো হতো, লক্ষ্যমাত্রাও এত উঁচুতে রাখা হতো সবাই ধরেই নিত সেটা নিছক বলার জন্যই বলা।
এ সরকার অন্তত গত দুই বছরের প্রকৃত প্রবৃদ্ধির নতুন হিসাব দিলে সবাই আশ্বস্ত হবে প্রবৃদ্ধির অতিরঞ্জন বিষয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তা এ সরকার গ্রহণ করেছে। সেটা করলেই সম্ভব হবে তার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ, যেখানে থাকবে আগামী বছরের জন্য অর্জনযোগ্য বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ। বিগত বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঠিক ও সংশোধিত হিসাব না দিয়ে সামনের বছরে অর্জনযোগ্য নিম্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে সেটা নিয়ে কথা হবে যে এ বাজেট স্বপ্ন দেখানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ।
বিগত অনেক বছর ধরেই কয়েকটি জরুরি বিষয় মনোযোগ পায়নি। তার মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়ন। প্রথম দুটির জন্য যথাযথ কৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বাজেট বরাদ্দের অভাবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রয়ে গেছে অব্যবহৃত, আর তরুণরা হয়েছে বঞ্চিত। তরুণরা দেখছে জাজ্বল্যমান বৈষম্য। সেই বঞ্চনার বোধ রূপ নিয়েছে ‘বিপ্লবে’। কাজেই এবারের বাজেটে তরুণদের প্রতি মনোযোগের মাধ্যমে পরিবর্তন প্রত্যাশিত। সেটা সম্ভব হবে কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে।
সেই সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো শুধু নয়, সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে তা ব্যবহার করে তরুণদের প্রস্তুত করার আশু পদক্ষেপ লাগবে। উৎপাদনশীলতা না বাড়ালে উদ্যোক্তারা কেনইবা তাদের নিয়োগ দিতে আগ্রহী হবেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের বৃহত্তর অংশ বরাদ্দ করা দরকার ও মোট বরাদ্দ গত কয়েক বছরে যা ছিল তার দ্বিগুণ করা উচিত। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে প্রাক-বাজেটে আলোচনার নামে যে অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে, সেখানে এগুলো প্রতি বছরই জোরেশোরে বলা হয়। আমি যখন অংশগ্রহণ করতাম তখনো বলেছি। কিন্তু কে বা শোনে ধর্মের কাহিনী। তবে এ বছরে প্রেক্ষিত যখন ভিন্ন, তখন এ পরিবর্তনের আশা করাই যায়। এ বছরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ আরেকটি কারণে দেয়া যায়। এবার এটা বাড়লে ভবিষ্যতে যখন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসবে, তখন তারা এটা কমাতে দ্বিধান্বিত হবে। কাজেই এখনই সময় নতুন কিছু করার। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই শিক্ষার মানোয়ন্নয়ন হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়। সেখানে এ বাজেট ব্যবহার করে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এবারের বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। গত দেড়-দুই দশকে দেশে বৈষম্য বেড়েছে অব্যাহতভাবে। সেই বৈষম্য শুধু আয়বৈষম্য নয়, সেই সঙ্গে সুযোগের বৈষম্যও। সর্বোপরি ব্যক্তি হিসেবে যা প্রত্যাশিত সম্মান ও স্বীকৃতি, উন্নয়নে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রে বৈষম্য মানুষের জীবন অর্থপূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তরুণদের স্বপ্ন হরণ করা হয়েছে। তাদের নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে বিপরীতমুখী করার মতো উপকরণ এ বাজেটে প্রত্যাশিত।
সেটা শুধু কথা আর আশ্বাস নয়, হতে হবে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য। এক বছরে কতটুকু করা যাবে, সেখানে সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। তবে অন্তত দুই বা তিন বছরের জন্য কর্মপরিকল্পনা, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তার প্রথম অংশের বাস্তবায়নের জন্য এবারে বরাদ্দ রাখা যায়। বাকিটা তার যুক্তিসংগত পদাঙ্ক অনুসরণ করে এগিয়ে যাবে ধরে নেয়া যায়।
বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক সবচেয়ে সরাসরি পদক্ষেপ হিসেবে অর্থনীতির পাঠ্যবই থেকে শুরু করে সব আলোচনাতেই প্রগ্রেসিভ (উচ্চ আয়ের সঙ্গে সঙ্গে করহার বৃদ্ধি) আয়কর প্রথার কথা আসে। আর পরোক্ষ করের বোঝা সেই সঙ্গে কমানো। রাজনৈতিক বাস্তবতা সেসব পথে ছিল প্রতিবন্ধকতা। এখনো প্রতিবন্ধকতা আছে—এ ধরনের আয়করের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উদ্যোক্তাদের উৎসাহে। কাজেই একই সঙ্গে সবদিক মিলিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলের পথে হাঁটতে হবে।
ক্রমবর্ধমান যে বৈষম্য, তা সবচেয়ে জাজ্বল্যমান গ্রাম ও শহরের মধ্যে। সহজ ভাষায় বললে, ভালো স্কুল, কলেজ শহরে। ভালো হাসপাতাল দূরবর্তী শহরে। শুধু শহর-গ্রামের বৈষম্য বললেও পুরো পার্থক্য সুস্পষ্ট হয় না। আসলে সব সুযোগ দুই-তিনটি বড় শহরে। সব অবকাঠামো গ্রামে পাওয়া সম্ভব নয়, বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু অন্তত জেলা শহর আর বিভাগীয় শহরগুলো উন্নত হলে তাতে একদিকে সব এলাকায় মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুষম বণ্টনের সুযোগ থাকত, আর উন্নত পরিষেবা সহজে পাওয়া যেত। শহর-গ্রামের বৈষম্য কমানোর কিছু প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হওয়া দরকার।
সেই সঙ্গে জড়িত কৃষির প্রশ্ন, যেটা আসলে কৃষকের প্রশ্ন। বাজেটে কৃষির জন্য, বরাদ্দ থাকে অবশ্যই, সেগুলোর বেশখানিকটা ভৌত অবকাঠামোর জন্য থাকে সাধারণভাবে ভর্তুকি, যন্ত্রপাতির জন্য কর রেয়াত ইত্যাদি। সেগুলোর সুফল রয়েছে। কভিডকাল থেকে শুরু করে চলমান বছর পর্যন্ত কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। এখন ভাবার সময় হয়েছে যে এ প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন কিনা। অনেক ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না। ভরা মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর। কাজেই কৃষির যান্ত্রিকীকরণে প্রণোদনা দিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। কিন্তু কৃষি মজুর, যারা কাজ হারাচ্ছেন, তাদের কী হবে, সেটাও ভাবতে হবে।
কৃষি, ডিম-মুরগি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে করপোরেট সংস্থাগুলো হাত বাড়াচ্ছে। তাতে হয়তো উৎপাদনশীলতা বাড়বে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র কৃষক এবং অন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তরা সেই প্রভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। করপোরেট সংস্থাগুলোর এবং বিবিধ খাতে বিনিয়োগ-সমৃদ্ধ বৃহৎ উদ্যোক্তাদের সরকারের নীতিকে সপক্ষে আনার প্রভাব বলয় রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় গ্রামের ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষি মজুরদের মতো দুর্বল পক্ষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করতে হবে।
কর্মসংস্থান, বিশেষত উন্নত মানের কর্মসংস্থান বাড়ানো ও শিল্প খাত প্রসারের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল প্রয়োজন। সেই কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে গত দশকে নানাভাবে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। যেমন কর রেয়াত, নগদ প্রণোদনা থেকে শুরু করে সুদহার দমিয়ে রাখা। কিন্তু তাতে পুঁজি ঘনত্ব বেড়েছে, কর্মসৃজনের হার নিম্নগামী হয়ে প্রায় স্থবির হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার সংখ্যা কমে গেছে। মোট কর্মসংস্থানে সেগুলোর অংশও তাই কমেছে। অন্যদিকে বৃহৎ উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থানের অংশ বেড়েছে। শ্রমবাজারে তাদের আধিপত্য বেড়েছে, যা বৈষম্য বাড়ার প্রক্রিয়ায় ইন্ধন জোগাচ্ছে।
বৈষম্য হ্রাস করার পদক্ষেপ হিসেবে তাই অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। যারা আছে তাদের চালু রাখতে সচেষ্ট হতে হবে।
এটা উল্লেখ করার কারণ হলো যে উদ্যোক্তা তহবিল গঠন করা হচ্ছে, সেখানে যেন শুধু বড়রা প্রাধান্য বিস্তার না করে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার হবে।
বৈষম্য কমানোর যদি আন্তরিক আগ্রহ থাকে, তাহলে এ বাজেট সুযোগ দিচ্ছে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার। সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (অকৃষি ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রে) সৃষ্টি ও তাদের সুযোগ বৃদ্ধি, যা স্বল্পমেয়াদে সুফলদায়ক হবে। আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি মধ্যমেয়াদের জন্য কার্যকর হবে।
- রুশিদান ইসলাম রহমান: সাবেক গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস); মতামত সূত্র: বণিক বার্তা

