একটি ঠান্ডা বুধবার বিকেলে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তিনি এককভাবে এক শতাব্দীকাল ধরে চলা বৈশ্বিকীকরণকে ধ্বংস করবেন। এটি তার ক্ষমতা এবং অহংকারের প্রতিফলন ছিল, যা বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাণিজ্যব্যবস্থাকে এক নতুন দিক দিয়ে চালিত করতে পারে। ট্রাম্পের ভাষণটি শুরু হয়েছিল সেসব পুরনো অভিযোগ দিয়ে, যা তিনি প্রায়ই তাঁর প্রথম মেয়াদে তুলেছিলেন—দেশের দুরবস্থা, কর্মসংস্থানের অভাব, শুল্ক এবং অর্থনৈতিক সমস্যাগুলির কথা। তিনি বলেছিলেন যে, দেশের শহর ও গ্রামগুলি ধ্বংস হয়েছে, কারখানাগুলো লুঠ হয়েছে, এবং দেশটি প্রতারিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে এক ধরনের ক্রোধ এবং ক্ষোভ ছিল, যা বহু মানুষকে তার প্রতি আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল।
তবে, ভাষণের মাঝামাঝি সময়ে, ট্রাম্প একটি নতুন ঘোষণা দেন। তিনি তার বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিককে মঞ্চে ডেকে একটি চার্ট উপস্থাপন করেন, যেখানে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে কী ধরনের শুল্ক আরোপ করা হবে তা উল্লেখ ছিল। ট্রাম্প একে একে সেই শুল্কের পরিমাণ ঘোষণা করেন, যা ছিল আগের চেয়ে অনেক বড়। এই ঘোষণা সারা বিশ্বের জন্য একটি ভয়াবহ সংকেত হয়ে দাঁড়ায়। যখন ট্রাম্প এসব শুল্ক ঘোষণা করেন, তখন অর্থনৈতিক বাজারের প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ। শেয়ার বাজারে বিশাল পতন ঘটে, ডলার অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে নিচে চলে যায়, এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজার তার সবচেয়ে বড় পতন দেখেছিল। হাজার হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়ে যায় এবং অনেক কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করতে শুরু করে।
এছাড়া, ট্রাম্পের এই শুল্কবৃদ্ধির নীতি নতুন কিছু ছিল না। তিনি প্রায়ই তাঁর প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় এসব শুল্কের কথা বলতেন। তাঁর মতে, “এক চোখের বদলে এক চোখ, এক শুল্কের বদলে আরেক শুল্ক” হওয়া উচিত। এক কথায়, তিনি বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করতে থাকে, তাহলে তারা অবশ্যই পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে। তিনি আরো বলেন, “শুল্ক হল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ।” তার ভাষণে দেশটির অর্থনীতির উন্নতি এবং নতুন চাকরি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই পদক্ষেপের ফলে আসলেই দেশের জনগণের কী উপকার হবে?
বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য এই শুল্কবৃদ্ধি এক বড় ধরনের বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশের জন্য শুল্কের ফলে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শুল্কের ফলে অনেক দেশের জন্য আমদানি এবং রপ্তানির খরচ বেড়ে গেছে। অন্যান্য কিছু দেশ অবশ্য এই শুল্কের ফলে লাভবান হতে পারে, কারণ তারা নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে বা কিছু নতুন বাজারের সন্ধান পেতে পারে। তবে, একে সারা পৃথিবীজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে, ট্যাক্স এবং শুল্কের কারণে অনেক দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারে, যা তাদের অর্থনীতির উপর চাপ ফেলবে।
এখন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে আরও চিন্তা করতে হবে। প্রথম মেয়াদে, ট্রাম্প শুধু সরকারী খরচ ও অভিবাসন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, কিন্তু তার দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি অনেক বেশি কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি একের পর এক তাঁর আগের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত করছেন, যা বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাণিজ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিবর্তন করে ফেলেছে। ট্রাম্পের আশেপাশের মানুষদের আচরণও অনেক বদলে গেছে। আগে যেসব কর্মকর্তারা তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, আজ তারা তার সিদ্ধান্তে সমর্থন জানাচ্ছেন।
এখন প্রশ্ন উঠছে, একজন প্রেসিডেন্ট কি এতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন? ট্রাম্প যেভাবে এককভাবে শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে পৃথিবীর বাণিজ্য ব্যবস্থা পরিবর্তন করেছেন, তা তার ক্ষমতার প্রকাশ। একদিনেই, তিনি পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছেন, যা তাঁর অহংকার এবং ক্ষমতার একটি চূড়ান্ত প্রদর্শন। তার এ ধরনের পদক্ষেপে বিশ্বের অনেক দেশের মধ্যে অস্থিরতা ও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তবে, এটা স্পষ্ট যে, তার এই ক্ষমতার প্রয়োগ শুধু তাঁর দেশের জন্যই নয়, বরং পুরো পৃথিবীর জন্য বিপদজনক হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি এবং মার্কিন অর্থনীতির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারি, ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলো আসলে একটি শক্তিশালী ও বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই শুল্কবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ধ্বংসের ফলে আমাদের পৃথিবী কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? হবে কি, আমরা একটি নতুন পৃথিবী দেখতে পাবো, যেখানে ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্ত সবকিছু বদলে দিয়েছে?
সূত্র: দি নিউ ইয়র্কার

