দেশের প্রকৌশল খাতে কাজের কাঠামো মূলত তিন স্তরের জনশক্তির ওপর নির্ভর করে। শীর্ষ স্তরে রয়েছেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। তারা প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা ও তত্ত্বীয় কাজ দেখভাল করেন। মধ্য স্তরে রয়েছেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। তারা সাইটে বাস্তবায়ন, তদারকি ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমন্বয় কাজ করেন। সবশেষে, গোড়ার স্তরে কাজ করে টেকনিশিয়ান বা স্কিল্ড ম্যানপাওয়ার। তারা সরাসরি যান্ত্রিক কাজ ও দৈনন্দিন অপারেশন সম্পাদন করেন।
অর্থাৎ প্রকৌশল খাতে কাজের ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরের অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। কাউকেই অবহেলা করা যায় না। প্রতিটি স্তর একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প সফল করে। এক্সিকিউশন (কর্ম সম্পাদন), মেইনটেন্যান্স ও সুপারভিশনের কাজ সাধারণত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা করেন। রিসার্চ, প্ল্যানিং ও ডিজাইন করেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা। অর্থাৎ বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা যে পরিকল্পনা দেন, তা বাস্তবায়ন করেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা। এখন বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা কোন যুক্তিতে বলছেন যে, ডিপ্লোমাধারীরা ইঞ্জিনিয়ার লিখতে পারবেন না? ডিপ্লোমাদের ডিগ্রির নামই হলো ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং, তবে কেন তারা লিখতে পারবেন না? এর আগেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারের সঙ্গে আমাদেরও কাজের সুযোগ হয়েছে। আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম– দুটিই ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশল শিক্ষা।
এবার আসি দশম গ্রেডের জটিলতায়। বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা বর্তমানে দশম গ্রেডে উপসহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে চাকরিতে প্রবেশ করেন। এটা তাদের জন্য নির্ধারিত। আর বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এন্ট্রি পদ হলো সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের নবম গ্রেড। তারা এর চেয়ে নিম্নপদ তথা উপসহকারী প্রকৌশল পদের জন্য আবেদন করতে পারেন না। তবে তাদের মধ্যে কেউ ডিপ্লোমা করে থাকলে আবেদন করতে পারেন। যেমন– ডুয়েটে যারা ডিপ্লোমা করে ভর্তি হন, তারা সেখানে আবেদন করেন। এখন কীসের ভিত্তিতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা উপসহকারী পদে আবেদনের সুযোগ চাইছেন? তারা তাদের পদমর্যাদা কিংবা সহকারী প্রকৌশল পদের সংখ্যা বাড়ানো কিংবা প্রমোশনের বেশি সুযোগ নিয়ে কথা বলতে পারেন। কিন্তু দশম গ্রেডের সুযোগ চাওয়া অযৌক্তিক এবং তাদের মর্যাদার জন্যও শোভনীয় নয়।
১৯৭৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনে উপসহকারী প্রকৌশলী পদ সৃষ্টি এবং সহকারী প্রকৌশলী পদে ৩৩ শতাংশ পদোন্নতির সুযোগ দেওয়া হয়। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা ৩৩ শতাংশকে কোটা হিসেবে আখ্যায়িত করে এটি বাদ দেওয়ার কথা বলছেন। এটা আসলে কোটা নয়; ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সংরক্ষিত পদ। উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা যে কাজ করছেন, তাদের কি পদোন্নতির প্রয়োজন নেই? ৩৩ শতাংশ হলেও বাস্তবে তারা ১৭-১৮ শতাংশ পান। সে জন্য ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এখানে তাদের জন্য ৫০ শতাংশ পদ দাবি করেছেন। আমি মনে করি, তাদের এ দাবি অযৌক্তিক নয়। হাজার হাজার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার সরকারের বিভিন্ন বিভাগে যে কাজ করছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়লেও কি একই পদে থাকতে হবে? এর আগে যেসব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার পদোন্নতি পেয়েছেন, কেউ বলতে পারবেন না, তারা সেখানে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাই তাঁকে পদোন্নতি দিচ্ছে।
এখানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার দ্বন্দ্ব দুঃখজনক। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা যেভাবে ডিপ্লোমাদের কাজ সংকুচিত করছেন, তার সমাধান হতে পারে ক্ষেত্র ভাগ করে দেওয়া। এর আগে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা ডেস্ক ও ফিল্ডে এই দুই ভাগে কাজ ভাগ করার দাবি জানিয়েছেন। যেখানে ডেস্কের কাজ তথা গবেষণা, প্ল্যানিং ও ডিজাইন করবেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা, আর মাঠ পর্যায়ের কাজ করবেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা। এখনও তারাই মাঠ পর্যায়ে বেশির ভাগ কাজ করছেন। এভাবে ভাগ করে দেওয়া হলে উভয় ক্ষেত্রেই উভয় পক্ষ স্ব স্ব বিভাগে সেভাবে পদোন্নতি পাবেন। এতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পদোন্নতি আরও সহজ হবে এবং অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাগুণে তারা আরও বড় পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের বর্তমানে উচ্চশিক্ষার পথ সংকুচিত। সে জন্য তাদের অন্যতম দাবি হলো ডিপ্লোমা থেকে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে বুয়েট, চুয়েট, রুয়েট, শাবিপ্রবি, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সুযোগ দেওয়া। অর্থাৎ তারা চার বছরের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে যেসব বিষয় পড়ে এসেছেন, সেগুলো নতুন করে না পড়ে অন্য কোর্সগুলো তারা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে পড়বেন। এ ক্ষেত্রে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরীক্ষার মাধ্যমেই তাদের আগের জ্ঞান যাচাই করতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের সুযোগ দেওয়া। অন্যান্য দেশেও এ নিয়ম আছে। তা ছাড়া আমাদের ডিপ্লোমা কোর্স সেভাবে স্ট্যান্ডার্ড করে প্রণয়ন করা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন পলিটেকনিক– সেখানে তারা বাংলাদেশের ডিপ্লোমা কোর্স ম্যাপিং করে দেখেছে, বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই এবং তারা সে অনুযায়ী বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পড়ার সুযোগও করে দিয়েছে। অর্থাৎ তারা সেখানে দুই বছরে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করতে পারছে। তাহলে বাংলাদেশের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কেন পারবে না?
সরকার দুই পক্ষের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সমস্যা নিরসনে দুটি কমিটি গঠন করেছে। একটি আট সদস্যের, যারা বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সভা করেছে। সে বৈঠক থেকে তারা আবার ১৪ সদস্যের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে, যেখানে সব পক্ষকে তাদের বক্তব্য এই গ্রুপের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কমিটি কিংবা গ্রুপকে মনে রাখতে হবে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রুট লেভেলের প্রায় সব কাজই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা করে থাকেন। কমিটিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষের মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য বিবেচনায় নিতে হবে। যার জন্য যে পদবি ও স্কেল নির্ধারিত, সেটা না রাখলে এখানে সমস্যার সৃষ্টি হবে। পদোন্নতির বিষয়ও কোনোভাবে উপেক্ষা করা যাবে না; হ্রাস করলেও সংকট তৈরি হবে।
প্রকৌশল পেশা নিয়ে বিএসসি ও ডিপ্লোমাদের মধ্যকার সংকট উভয় পক্ষকে আস্থায় নিয়েই সমাধান করতে হবে; কোনো পক্ষই যাতে বঞ্চিত না হয়। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা কখনও বঞ্চিত হয়েছে বলে আমরা জানি না। তারপরও তারা কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হলে সেটা দেখে সেভাবে তাদের মূল্যায়ন করা দরকার। কিন্তু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সুযোগ সংকুচিত করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। ডিপ্লোমা শিক্ষাকে জনপ্রিয় করতে তাদের আরও সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি ভাবতে হবে। সে জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর উচিত হবে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সাত দফা দাবি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা।
মো. শামসুর রহমান: সাবেক বিভাগীয় প্রধান, কেমিক্যাল ও ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, নর্থ প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। সূত্র: সমকাল

