গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই কোর্ট অব কাসেশন, যা দেশটির সুপ্রিম কোর্ট হিসেবে বিবেচিত, একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে। বাংলাদেশে এই রায় নিয়ে তেমন আলোচনার সুযোগ হয়নি কিন্তু তা শুধুমাত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত নয়, পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স জগতের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ইসলামী ব্যাংকিং পণ্য ও চুক্তি আন্তর্জাতিক আইন ও শরিয়ার সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। এটি ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য একটি মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ ইসলামী ফাইন্যান্স দ্রুত বর্ধমান ক্ষেত্র হিসেবে ভাবছে, তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রায় ইসলামী ব্যাংকিং পণ্য ডিজাইন এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে। ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা এখন আরও সতর্কভাবে চুক্তি তৈরি এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে হবে।
দুবাই কোর্ট অব কাসেশন (দুবাইয়ের সুপ্রিম কোর্ট হিসেবে গণ্য) গত মাসে যে রায় দিয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় তেমন আলোচনা না হলেও শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত নয়, বরং পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স বিশ্বের জন্য একটি যুগান্তকারী বিষয় হয়ে উঠতে পারে। রায়ে ঘোষণা করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক, ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান ও তাকাফুল (ইসলামী বীমা) কোম্পানিগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে দেরিতে অর্থ পরিশোধের কারণে কোনো ধরনের জরিমানা, ফি বা ক্ষতিপূরণ নিতে পারবে না। দুবাইয়ের আদালত বিষয়টিকে পাবলিক অর্ডার”বা জনগণবিধির আওতায় এনেছে—মানে এটি এতটাই মৌলিক নীতি যে, কোনো চুক্তিতে বিপরীত শর্ত থাকলেও বা আগে কোনো রায়ে এর অনুমোদন দেয়া হলেও আদালত তা কার্যকর করবে না।
এখানে আসল আলোচনার জায়গা হলো, যে বিষয়টি বহু বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি ‘শরিয়াহসম্মত’ প্রথা হিসেবে গৃহীত ছিল, তা হঠাৎ করে আদালতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ শরিয়াহবিরোধী হিসেবে ঘোষিত হলো কীভাবে? এখানে বিশেষভাবে আলোচ্য বিষয় দেরিতে অর্থ পরিশোধের জরিমানা, আর সাধারণ বিষয় হচ্ছে কেমন করে এতদিন একটি বিষয় শরিয়াহসম্মত হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হিসেবে চলে এসেছে আর তা কীভাবে হঠাৎ করে এখন শরিয়াহসম্মত নয়। অর্থাৎ শরিয়াহসম্মত অথবা নয়, এ নিয়ে কি আরো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক এখনো রয়ে গেছে? থাকলে কেন?
কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ইসলামী ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সঙ্গে অর্থায়নের চুক্তিতে একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করে আসছে, যদি গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ ফেরত না দেয়, তবে একটি নির্দিষ্ট অংকের জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ব্যাংকগুলো দাবি করে, এ অর্থ কোনোভাবেই তাদের আয়ে যোগ হয় না; বরং শরিয়ত-অসম্মত আয়ের উৎস হিসেবে তহবিল পরিশুদ্ধ (পিওরিফিকেশন) হিসেবে দাতব্য কাজে ব্যয় করা হয়। যুক্তি ছিল, এর মাধ্যমে সময়মতো অর্থ ফেরত দেয়ার শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং গ্রাহক ইচ্ছাকৃত দেরি করার প্রবণতা থেকে বিরত থাকে। বহু দেশের শরিয়াহ বোর্ড এ যুক্তিকে সমর্থন করেছে। শর্ত ছিল জরিমানার অর্থ ব্যাংকের মুনাফায় না গিয়ে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে।
দুবাই কোর্ট অব কাসেশন যুক্তি দিয়েছে, যে মুহূর্তে ব্যাংক চুক্তির শর্তে দেরির জন্য আর্থিক জরিমানার বিধান রাখছে, তখন সেটি মূল অর্থের ওপর একটি অতিরিক্ত দাবি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা অর্থোডক্স শরিয়াহর পরিভাষায় ‘রিবা’-র মূল নিষিদ্ধ কাঠামোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সমতুল্য। শরিয়াহর মূল নীতিতে ঋণ দেয়ার বিনিময়ে কোনো অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা নেয়া যাবে না, তা সে সুবিধা আয় হিসেবে থাকুক বা দাতব্য খাতে ব্যয় হোক। আদালত আরো বলেছে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এমন কোনো শর্তই বৈধ নয়, যা মূল অর্থের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
এ রায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি মৌলিক সমস্যা সামনে এনেছে, শরিয়াহ সম্মতির ক্ষেত্রে ফিকহি ব্যাখ্যা ও আইনি বাস্তবায়নের পার্থক্য। দীর্ঘদিন ধরে অনেক শরিয়াহ বোর্ড বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা ছাড় দিয়ে এসেছে, যাতে ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিকভাবে টেকসই থাকতে পারে এবং ঋণ ফেরতের শৃঙ্খলা বজায় থাকে। কিন্তু আদালত দেখিয়ে দিল শরিয়াহসম্মত কোনো আপসের বিষয় নয়; এটি আইন, নীতি ও শরিয়াহর প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ রায়ের মাধ্যমে গ্রাহকের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রচলিত অর্থনৈতিক যুক্তি ভেঙে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অনুপ্রেরণা হবে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আস্থা, আর্থিক শাস্তি নয়।
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স খাত এখন একটি বিশাল শিল্প। এখানে আটটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক, ২০টিরও বেশি ইসলামী শাখা পরিচালনাকারী প্রচলিত ব্যাংক এবং একাধিক তাকাফুল প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। গ্রাহকের মধ্যে ধারণা যেহেতু এসব প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ বোর্ড আছে, তাই তাদের সব কার্যক্রম শতভাগ অথবা সামগ্রিকভাবে শরিয়াহসম্মত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ব্যাংক চুক্তিতে ‘বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ’ ধার্য করে, যদিও তা সদকা হিসেবে দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকে।
দুবাইয়ের এ রায় বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি কারণে গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত, এটি একটি সতর্কবার্তা—দীর্ঘদিনের প্রচলিত কোনো প্রথা, যতই প্রচলিত হোক না কেন, যদি শরিয়াহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোকে এখনই তাদের চুক্তিপত্র ও নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংকিং মানদণ্ড ক্রমেই কঠোর ও স্ট্যান্ডার্ডাইজড হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো যদি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী ও অংশীদারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য থাকতে চায়, তবে তাদের নীতি আন্তর্জাতিক শরিয়াহ মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তৃতীয়ত, এটি গ্রাহকের আস্থার প্রশ্ন।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল চালিকাশক্তি হলো আস্থা। গ্রাহক যদি বুঝতে পারে ব্যাংক কার্যত রিবার মতো কোনো শর্ত প্রয়োগ করছে, তবে সে আস্থা ক্ষুণ্ন হবে। দুবাইয়ের রায়ের উদাহরণের ব্যাপারে হয় তাদের প্রমাণ করতে হবে যে এ রায় ভ্রান্ত অথবা দেখাতে হবে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো নিজেদের নীতিগত প্রতিশ্রুতি কার্যকরীভাবে প্রদর্শন করতে পারে। চতুর্থত, বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বৃদ্ধি এখন এমন এক পর্যায়ে যে এটি জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি আন্তর্জাতিক অডিট বা রেটিং সংস্থা ভবিষ্যতে এ ধরনের ধারাকে শরিয়াহবিরোধী বলে ঘোষণা করে, তাহলে এর প্রভাব পুরো খাতেই পড়বে। পঞ্চমত, শরিয়াহ মানদণ্ড শুধু নাম বা বোর্ডের অনুমোদনের বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত ফিকহি, আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। এ ধরনের রায় প্রমাণ করে ইসলামী ফাইন্যান্সের সফলতা নির্ভর করে বাস্তব প্রয়োগের সততা ও স্বচ্ছতার ওপর।
দুবাইয়ের রায় আমাদের শেখায় ইসলামী অর্থনীতি কেবল বাণিজ্যিক কাঠামো নয়, বরং এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। এর সাফল্য নির্ভর করে মূলনীতির প্রতি অটল থাকা, এমনকি ব্যবসায়িক স্বার্থে কিছুটা ছাড় দেয়ার প্রলোভন থাকলেও। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর উচিত হবে সব চুক্তি ও নীতি পুনর্মূল্যায়ন করা; শরিয়াহ বোর্ডকে শুধু অনুমোদনদাতা নয়, বরং সক্রিয় অভিভাবক হিসেবে ক্ষমতায়ন করা; গ্রাহক ও কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য শুধু সুদমুক্ত বা প্রচলিত অর্থে রিবাভিত্তিক লেনদেন নয়, বরং ন্যায্যতা, নৈতিকতা ও সামাজিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা; এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি সংস্কার করা।
দুবাইয়ের এ সিদ্ধান্ত একটি বিশ্বব্যাপী বার্তা—ইসলামী ব্যাংকিং তখনই টিকে থাকবে, যখন এটি নামমাত্র শরিয়াহসম্মত নয়, বরং প্রকৃত শরিয়াহর চেতনা ও নৈতিক ভিত্তিকে আঁকড়ে ধরবে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি সুযোগ। নিজেদের ইসলামী ব্যাংকিংকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, গ্রাহকের আস্থা সুদৃঢ় করা এবং বৈশ্বিক ইসলামী অর্থনীতিতে নেতৃত্বের অবস্থান নেয়া। তবে এ প্রসঙ্গে আলোচনা-বিতর্ক এত সহজেই শেষ হবে না, কারণ দুবাই থেকে ঘোষিত রায়ের মধ্যেও আইনসর্বস্বতা (লিগ্যালিজম), তার আভাস পাওয়া যায়। অর্থাৎ এ রায়ের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রি কী সমস্যা বা চ্যালেঞ্জে পড়বে তা নিয়ে ভাবা হয়নি, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ফিকহ-তাড়িতে এবং আদালতের দিক থেকে প্রাসঙ্গিক সমস্যা ও সমাধান নিয়ে তারা ভাববে এটাও প্রত্যাশিত বা যুক্তিযুক্ত নয়।
কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিংয়ে এ বিলম্বজনিত অর্থ পরিশোধের জরিমানাটা এমনিতেই চালু হয়নি। ইসলামী ব্যাংকগুলো দেরি করে পরিশোধ বা ডিফল্ট”সমস্যার সমাধান করতে লেট পেমেন্ট পেনাল্টি চালু করেছিল। এটি ছিল এক ধরনের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে শরিয়াহ নীতির সমন্বয় (কেউ কেউ বলবেন, গোঁজামিল) করার চেষ্টা। এর পেছনে প্রথম কারণ ছিল ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি। যখন গ্রাহক জানে, সময়মতো অর্থ ফেরত না দিলে কোনো আর্থিক শাস্তি বা পরিণাম নেই, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ বিলম্ব করে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, গ্রাহক অন্যত্র টাকা বিনিয়োগ করে বেশি লাভ করতে চাইতে পারে, যেহেতু দেরির কোনো সরাসরি আর্থিক ক্ষতি তার হবে না। এ প্রবণতা ইসলামী ব্যাংকের অর্থের প্রবাহ ও পুনঃঅর্থায়ন সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দ্বিতীয়ত, নগদ প্রবাহ ও তারল্য বা লিকুইডিটির সমস্যা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইসলামী ব্যাংকগুলো সাধারণত জমাকৃত আমানত দিয়ে অর্থায়ন করে, যা নির্দিষ্ট মেয়াদে ফেরত দিতে হয়। যদি ঋণগ্রহীতা দেরি করে অর্থ ফেরত দেয়, ব্যাংকের নগদ প্রবাহ ব্যাহত হয়। ফলে ব্যাংককে অন্য গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে সমস্যা হয় এবং বিনিয়োগকারীর আস্থাও কমে যায়।
তৃতীয়ত, বাজার প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও এখানে প্রভাব ফেলেছিল। প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলো সময়মতো অর্থ ফেরত না দিলে জরিমানা ধার্য করত। ইসলামী ব্যাংকগুলো যদি কোনো শাস্তি আরোপ না করে, তবে অনেক গ্রাহক মনে করত এটি ‘ফ্রি ক্রেডিট’ পাওয়ার একটি সুযোগ। ফলে ইসলামী ব্যাংক তুলনামূলকভাবে বেশি ডিফল্ট ঝুঁকির মুখে পড়ত এবং সৎ গ্রাহকদের ওপর চাপ বাড়ত।
চতুর্থত, শরিয়াহ বোর্ডগুলো এ সমস্যার একটি সমাধান খুঁজে বের করেছিল। তারা অনুমোদন দিয়েছিল জরিমানার টাকা ব্যাংকের মুনাফায় যোগ হবে না, বরং সদকা বা দাতব্য কাজে ব্যবহার করা হবে। এভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে জরিমানাটি রিবার পর্যায়ে পড়ে না, বরং একটি শৃঙ্খলাবিধানমূলক শাস্তি হিসেবে গণ্য হয়। এ যুক্তি ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো আইনগতভাবেও চুক্তিতে এ ধারা অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল।
পঞ্চমত, আইনগত সুরক্ষা ও ঋণ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশে যদি চুক্তিতে দেরির জন্য কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ ধারা না থাকে, আদালতে ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। তাই ইসলামী ব্যাংকগুলো আইনি শক্তি বাড়াতে এ ধারা যুক্ত করেছিল, যেন গ্রাহক সময়মতো অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হয় এবং আদালতও সে শর্ত কার্যকর করতে পারে।
অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকগুলো মূলত গ্রাহকের সময়মতো অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করা, অপারেশনাল খরচ ও ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা—তিনটি উদ্দেশ্য পূরণে লেট পেমেন্ট পেনাল্টিকে একটি ‘শরিয়াহসম্মত’ কাঠামোয় আইনি বৈধতা দিয়েছিল। এ সমস্যার সমাধান কী হবে? মুসলিম গ্রাহকরা তো আর ফেরেশতা নন বা হয়ে উঠবেন না। তাদের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধে বিলম্বকে উৎসাহ দেয়ার নৈতিক ঝুঁকি ইসলামী ব্যাংকগুলো কীভাবে সমাধান করবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং এ রায়ের বাস্তব প্রায়োগিক তাৎপর্য নিয়ে আরো আলোচনার অবকাশ রয়ে যাচ্ছে।
তবে এ বিলম্বজনিত পরিশোধের ক্ষেত্রে জরিমানা নির্ধারণের কিছু ইসলামী দিক উপেক্ষিত হয়েছে। কারণ ইসলামী ব্যাংকের নির্ধারিত ব্যবস্থা এই যে জরিমানা করা হবে, কিন্তু তা মুনাফার অংশ হবে না বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানও নিজেরা তা থেকে কোনোভাবে উপকৃত হবে না। বরং তা সদকা বা চ্যারিটি হিসেবে সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হবে। এ সমাধানের ক্ষেত্রেও ইসলামী দিক থেকে কিছু কথা থাকে। কারণ জরিমানাটি নিজেরা নেবে না, কারণ এটি অর্থোডক্স ইসলামী ব্যাখ্যায় হারাম হিসেবে গণ্য। কিন্তু এটাও ইসলামের একটি নির্দেশনা যে হারাম কোনো উৎস থেকে সদকা হয় না। তাহলে সমস্যার আমরা কী সমাধান বের করলাম?
প্রকৃতপক্ষে, আগের প্রচলিত জরিমানার ব্যবস্থা শরিয়াহসম্মত বিবেচনা করা আর দুবাই আদালতের রায় যে তা শরিয়াহসম্মত নয় রায় দেয়া, এ দুটোর আলোকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আবার ভাবার প্রয়োজন হবে। এ প্রেক্ষাপটেই আলোচনাটিও হয়তো প্রাসঙ্গিক হবে যে বিলম্বিত পরিশোধে যেকোনো ধরনের জরিমানা ‘রিবা’ আর তাই ‘হারাম’ এটা ইসলামের আলোকে সঠিক অবস্থান কিনা। আমাদের ইসলামী বিশারদরা এ ব্যাপারে আরো পরিষ্কার, দ্বন্দ্বমুক্ত ব্যাখ্যা ও সমাধান দেবেন এটাই প্রত্যাশা থাকবে।
ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ এবং ডিরেক্টর, ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। সূত্র: বনিক বার্তা

