নতুন সরকার গঠন সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রিসভা ও প্রতিমন্ত্রীরা গতকাল শপথ গ্রহণ করেছেন। আগের সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের অর্থনীতি মূলত স্থবির ছিল। বিনিয়োগে কোনো আশার বার্তা মিলছিল না, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রেই এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের কাছে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষ সকলের প্রত্যাশা অনেক বেশি। দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন অর্থনীতিবিদ জানিয়েছেন, অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন সরকারের সামনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
গত আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতি স্থবিরতার মধ্যে আছে। প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে, আর সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বেকার। সামাজিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সহিংসতা ও অস্থিরতা দেখা গেছে। এ সব মিলিয়ে মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের মাত্রাও নিচে নেমেছে।
নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার এখন এই পরিস্থিতি মোকাবিলার মুখোমুখি। জনগণের প্রত্যাশা তিন দিক থেকে স্পষ্ট। প্রথমত, অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে মানুষ যেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে পায়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্বস্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুদহার কমিয়ে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। পাশাপাশি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনা নয়, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। দেশের ঋণস্তর উচ্চ, রাজস্ব আয় তুলনায় ব্যয় বেশি, ফলে সরকারি খরচে দক্ষতা আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সুষম উন্নয়নেও নজর দিতে হবে—এক দিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমতা, অন্য দিকে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমানো।
দারিদ্র্যের হার উদ্বেগজনক। প্রায় তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে জীবনযাপন করছে, আর ছয় কোটি মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু আয়ের নয়, সম্পদ এবং সুযোগের অসমতাও বড় সমস্যা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে—উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ, ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোর তুলনায় কিছু অঞ্চলের জনগণ অনেক বেশি বঞ্চিত। সরকারের জন্য এটি সমতা প্রতিষ্ঠার বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরানো অত্যন্ত জরুরি। বিগত কয়েক বছরে আর্থিক খাতে অনিয়ম বেড়েছে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রয়োজন অনুযায়ী নয়, পরিচালনা পর্ষদ অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। ঋণ খেলাপি একটি বড় সমস্যা। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আর্থিক খাতে কিছু বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন আছে। সেগুলো কার্যকর করা ও মানা গেলে সুশাসন ফিরে আসবে।
ব্যাংকের ঋণ প্রদানের হিসাব, ফেরত আদায় ও অনিয়মের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন পুনর্বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচিত সরকার যদি এটি বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে আর্থিক খাতে প্রকৃত সংস্কার সম্ভব হবে।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। তবে মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট—অস্থিরতা কাটানো, বিনিয়োগ বাড়ানো, আর দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধান করে দেশের অর্থনীতিতে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনা।

