একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হলো একটি শক্তিশালী ও কার্যকর শেয়ারবাজার। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের ভূমিকা অপরিসীম।
উন্নত বিশ্বের অর্থনীতিতে শেয়ারবাজার শুধু বিনিয়োগের ক্ষেত্র নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতা, তারল্য সংকট, দুর্বল সুশাসন এবং নানা কাঠামোগত সমস্যার কারণে প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক (DSEX) প্রায় ৫,৮০০ পয়েন্টের আশপাশে অবস্থান করছে। যদিও কিছু কার্যদিবসে সূচক এই মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে, তবু সামগ্রিকভাবে এটি ৫,৭৫০ থেকে ৫,৮৫০ পয়েন্টের মধ্যেই ওঠানামা করছে।
একই সময়ে বাজারে লেনদেনেও কিছুটা গতি ফিরে এসেছে। দৈনিক গড় লেনদেন প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ কোটি টাকার মধ্যে থাকায় বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভালো মৌলভিত্তির কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি এবং বাজারে কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হলেও এটিকে এখনো স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যায় না। কারণ বাজারের গভীরে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট, তারল্যের সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বারবার অস্বাভাবিক উত্থান-পতন, মূল্য কারসাজি এবং দীর্ঘমেয়াদি মন্দার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। এসব ঘটনার ফলে লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাজারে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো, গুজব ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার (ইনসাইডার ট্রেডিং) এবং কিছু দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির অনিয়ম বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে দুর্বল করেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলেও দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো তারল্যের ঘাটতি। বিগত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক সাধারণ বিনিয়োগকারী বাজার থেকে সরে যাওয়ায় বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক পুরোনো বিনিয়োগকারীও লোকসানের কারণে বাজারে সক্রিয় নন। ফলে লেনদেনের পরিমাণ কমে যায় এবং বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় সূচক কিছুটা বাড়লেও মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে প্রভাবিত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় নতুন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (IPO) কম হওয়ায় বাজারে নতুন ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির সংখ্যা বাড়েনি। ফলে বিনিয়োগের ক্ষেত্র সীমিত হয়েছে এবং বাজারের বৈচিত্র্যও প্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পায়নি।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের নিয়ম আরও আধুনিক করা, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কারসাজি দমন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হলে সর্বপ্রথম আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস পুনর্গঠনের জন্য বাজার কারসাজি, গুজবনির্ভর লেনদেন, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে দ্রুত, স্বচ্ছ ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা যত শক্তিশালী হবে, বাজার তত বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে বাজারে আরও বেশি মৌলভিত্তিসম্পন্ন, লাভজনক, বহুজাতিক এবং রাষ্ট্রীয় বড় প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এতে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে এবং দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের হিসাবনীতি অনুসরণ করা এবং সময়মতো নির্ভুল আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের প্রাধান্য বেশি, যা বাজারকে অনেক সময় অস্থিতিশীল করে তোলে। তাই মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা কোম্পানি, পেনশন ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাজারে স্থিতিশীলতা আনে, অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা কমায় এবং বাজারের প্রতি আস্থা বাড়াতে সহায়তা করে।
বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি করাও সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। অনেক বিনিয়োগকারী এখনো গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার কিংবা অন্যের পরামর্শের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করেন। অথচ একটি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, লভ্যাংশের ইতিহাস, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং মৌলভিত্তিক বিশ্লেষণ বিবেচনা করে বিনিয়োগ করাই হওয়া উচিত সঠিক পদ্ধতি। শেয়ারবাজারকে দ্রুত মুনাফার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
বাজারকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের করতে নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ, ডেরিভেটিভস মার্কেট, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF), করপোরেট বন্ড এবং অন্যান্য আধুনিক আর্থিক পণ্য চালু করা গেলে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার নজরদারি এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করলে বাজার আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
এর পাশাপাশি অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা, বিনিয়োগবান্ধব করনীতি, লভ্যাংশ নীতির ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। নীতির ঘন ঘন পরিবর্তনের পরিবর্তে পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল নীতি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক ইতিবাচক প্রবণতা বাজারের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তাই কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ানোর পরিবর্তে প্রয়োজন টেকসই সংস্কার, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই আস্থার সংকট কাটিয়ে একটি আধুনিক, শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব। একটি স্থিতিশীল ও আস্থাভিত্তিক শেয়ারবাজার শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য।

