পুঁজিবাজারে টাকা ঢুকলেই কি বাজারের প্রাণ ফিরে আসে? নাকি ধার করা টাকার স্রোত বাজারকে কিছুদিন চাঙা রাখার পর উল্টো বড় ঝুঁকি তৈরি করে? এই প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ বাজারে তারল্য বাড়াতে মার্জিন ঋণের নিয়ম বেশ কিছুটা সহজ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
নতুন ব্যবস্থায় মার্জিন ঋণের যোগ্য শেয়ারের সর্বোচ্চ পিই রেশিও ৪০ করা হয়েছে, ব্যাংক ও নন-লাইফ বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিবি রেশিওর শর্ত তুলে দেওয়া হয়েছে এবং শেয়ার জোরপূর্বক বিক্রির আগে বিনিয়োগকারীদের কিছুটা বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে বাজারে লেনদেন ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অতীত বলছে, শুধু টাকার প্রবাহ বাড়ানো আর একটি সুস্থ, টেকসই বাজার তৈরি করা এক বিষয় নয়। ২০১০ সালের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে তাই এবার আসল পরীক্ষা হবে মার্জিন ঋণের মাধ্যমে বাজারে গতি আনার এই উদ্যোগ কতটা নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং বাড়তি ঋণের টাকা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়ায়, নাকি আবারও অতিরিক্ত ঝুঁকির চক্র তৈরি করে।
১১ আগস্ট কমিশনের সভায় সংশোধিত মার্জিন ঋণ বিধিমালা অনুমোদন করেছে বিএসইসি। আগের খসড়ার তুলনায় চূড়ান্ত কাঠামোতে বেশ কিছু জায়গায় বিনিয়োগকারীদের জন্য শর্ত সহজ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শেয়ারের মূল্যায়নের মাপকাঠিতে। ব্যাংক ও নন-লাইফ বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে আগে যে পিবি বা মূল্য-টু-বুক রেশিওর সীমা প্রস্তাব করা হয়েছিল, চূড়ান্ত নিয়মে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন এসব কোম্পানিসহ অন্যান্য যোগ্য কোম্পানির জন্য ট্রেইলিং পিই রেশিওকে প্রধান মাপকাঠি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ পিই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০। অর্থাৎ কোনো কোম্পানির বর্তমান শেয়ারদরকে গত ১২ মাসের শেয়ারপ্রতি আয়ের সঙ্গে তুলনা করে পাওয়া পিই ৪০ এর মধ্যে থাকলে, অন্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে শেয়ারটি মার্জিন ঋণের যোগ্য হতে পারে। নতুন প্রান্তিক আর্থিক ফল প্রকাশ হলে এই হিসাবও হালনাগাদ হবে। জীবন বিমা কোম্পানির জন্য অবশ্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু কয়েকটি শেয়ারের ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত ১:১ রাখা হয়েছে। সহজভাবে বললে, একজন বিনিয়োগকারীর নিজের ১ লাখ টাকা থাকলে তিনি সমপরিমাণ ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকার শেয়ার কিনতে পারবেন। ফলে নিজের অর্থের তুলনায় বিনিয়োগের সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়। অনেক বিনিয়োগকারী একসঙ্গে এই সুবিধা ব্যবহার করলে বাজারে শেয়ারের চাহিদা এবং লেনদেন বাড়তে পারে। বিএসইসির নতুন কাঠামোর পেছনে তাই বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল তারল্য পরিস্থিতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠার একটি চেষ্টা রয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার উল্টো দিকও আছে, শেয়ারদর কমতে শুরু করলে ধার করা অর্থের কারণে বিনিয়োগকারীর ক্ষতি নিজের বিনিয়োগের তুলনায় দ্রুত বাড়তে পারে।
বিএসইসির সিদ্ধান্তের আগে থেকেই মার্জিন ঋণের নিয়ম শিথিল হওয়ার প্রত্যাশা বাজারে প্রভাব ফেলেছিল। ১০ আগস্ট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২২ পয়েন্ট বা ০.৩৮ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৮৪৪ পয়েন্টে উঠেছিল। সেদিন শেষ দিকে ব্যাংক ও বিমা খাতের শেয়ারে কেনার চাপ বাড়ে। তবে সূচক বাড়লেও মোট লেনদেন ৬ শতাংশ কমে ৯০৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ শুধু ঋণসুবিধা বাড়ার প্রত্যাশায় বাজারে তাৎক্ষণিক আগ্রহ তৈরি হলেও, সেটিকে এখনই শক্তিশালী ও ব্যাপকভিত্তিক বাজার পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
এখানেই ফিরে আসে ২০১০ সালের অভিজ্ঞতা। ওই সময় দ্রুত বাড়তে থাকা শেয়ারদর এবং অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ বাজারে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরে শেয়ারদর পড়তে শুরু করলে অনেক বিনিয়োগকারী ঋণের কিস্তি বা মার্জিন ঘাটতি পূরণ করতে পারেননি। তখন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে, আর সেই জোরপূর্বক বিক্রিই বাজারে আরও বিক্রির চাপ তৈরি করে। অর্থাৎ দাম কমে মার্জিন ঘাটতি তৈরি হয়, ঘাটতি পূরণে শেয়ার বিক্রি হয়, আর সেই বিক্রির চাপে দাম আরও কমে যায় এভাবে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়েছিল। ২০১০ সালের বাজার ধস নিয়ে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন মার্জিন ঋণকে ওই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০১০ সালের সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব অবশ্য এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বিএসইসির নথির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল, মার্জিন ঋণ নেওয়া হিসাবগুলোর নেতিবাচক ইকুইটি ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি ছিল। এর অর্থ হলো, কোনো বিনিয়োগকারীর নিজের অর্থের তুলনায় শেয়ারের মূল্য এতটাই কমে গেছে যে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পাওনা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সম্পদ আর হিসাবটিতে নেই। এমন পরিস্থিতি শুধু বিনিয়োগকারীকেই নয়, মার্জিন ঋণ দেওয়া ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকেও দুর্বল করে।
এবারের নিয়মে অবশ্য ঝুঁকি সামলানোর জন্য আগের তুলনায় আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো বিনিয়োগকারীর ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন অর্থদাতাকে আগে নোটিশ দিতে হবে। এরপর ইকুইটি আরও কমে ২৫ শতাংশের নিচে গেলে আগাম নোটিশ ছাড়াই সিকিউরিটিজ বিক্রি করার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ বাজারে সাময়িক দরপতন হলেই সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার বদলে বিনিয়োগকারীকে কিছুটা সময় দেওয়া হবে। তবে ক্ষতির মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পাওনা রক্ষায় জোরপূর্বক বিক্রির ব্যবস্থা চালু করা যাবে। আগের খসড়ায় ইকুইটি ৭০ শতাংশের নিচে নামলে মার্জিন কল এবং ৫০ শতাংশের নিচে নামলে আগাম নোটিশ ছাড়াই বিক্রির প্রস্তাব ছিল। চূড়ান্ত নিয়ম সেই তুলনায় বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশি নমনীয়।
তবে নিয়ম শিথিল হলেও ঝুঁকিপূর্ণ সব শেয়ারকে মার্জিন ঋণের আওতায় আনা হয়নি। জেড, এন ও জি ক্যাটাগরির কোম্পানি এবং এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ এই সুবিধার বাইরে থাকবে। মূল বোর্ডের এ ও বি ক্যাটাগরির শেয়ারই মার্জিন অর্থায়নের জন্য যোগ্য হবে। এই সীমাবদ্ধতার উদ্দেশ্য হলো দুর্বল আর্থিক অবস্থার বা তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির শেয়ারে ধার করা অর্থের ব্যবহার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থাৎ বিএসইসি একদিকে ঋণের সুযোগ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ অংশের জন্য দরজা পুরোপুরি খুলে দেয়নি।
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, মার্জিন ঋণ বাড়িয়ে কি সত্যিই পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব? লেনদেন বাড়ানো এবং তারল্য বাড়ানো এক বিষয়, আর ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো আরেক বিষয়। কোনো বাজারে শুধু ধার করা অর্থের প্রবাহ বাড়লে সাময়িকভাবে শেয়ার কেনাবেচা বাড়তে পারে, কিন্তু কোম্পানির আয়, মুনাফা, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগকারীর আস্থা না বাড়লে সেই গতি টেকসই নাও হতে পারে। বরং বাজার অতিরিক্ত চাঙা হয়ে গেলে পরে সংশোধনের সময় ঋণনির্ভর বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপ আরও বেশি পড়তে পারে।
তাই নতুন মার্জিন বিধিমালার সাফল্য শুধু দৈনিক লেনদেন কত কোটি টাকায় উঠল, সেটি দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে, এই ঋণসুবিধা ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে কি না, বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ আসছে কি না এবং নতুন করে ঋণগ্রহীতাদের নেতিবাচক ইকুইটি তৈরি হচ্ছে কি না। একই সঙ্গে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো কতটা সতর্কতার সঙ্গে ঋণ দিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মার্জিন ঋণ নিজে ভালো বা খারাপ কিছু নয়; ঝুঁকি তৈরি হয় যখন ঋণের পরিমাণ, শেয়ারের মূল্য এবং বিনিয়োগকারীর পরিশোধক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকে না।
শেষ পর্যন্ত বিএসইসির নতুন সিদ্ধান্তকে তাই বাজার সচল করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু এটিকে ২০১০ সালের অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাজারে তারল্য দরকার, বিনিয়োগকারীর আস্থাও দরকার। কিন্তু সেই তারল্য যদি অতিরিক্ত ধারনির্ভর হয়, তাহলে বাজার বাড়ার সময় যতটা স্বস্তি দেবে, পতনের সময় তার চেয়ে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে এবার মূল পরীক্ষা মার্জিন ঋণের দরজা কতটা খোলা হলো তা নয়; বরং সেই দরজা দিয়ে ঢোকা অর্থ কতটা সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং বাজার পড়ে গেলে ঝুঁকি সামলানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকে, সেটিই হবে আসল বিষয়।

