শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি সম্পন্ন বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে প্রচলিত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি।
বর্তমানে দেশে আইপিও ছাড়া সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। বিএসইসির এই নতুন উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পেলে নির্দিষ্ট আর্থিক ও করপোরেট মানদণ্ড পূরণকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনেও পুঁজিবাজারে প্রবেশের বিকল্প একটি পথ খুলে যেতে পারে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানান, ডাইরেক্ট লিস্টিং কার্যকর করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে, যারা বিদ্যমান নিয়মকানুন বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ কমিশনের কাছে জমা দেবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই গঠিত এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন একজন কমিশনার, আর সদস্য হিসেবে রয়েছেন আরেকজন কমিশনারসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। কমিটিকে গঠনের এক মাসের মধ্যে অর্থাৎ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মূলত ডাইরেক্ট লিস্টিং হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো কোম্পানি প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথ পাড়ি না দিয়ে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে নিজেদের শেয়ার তালিকাভুক্ত করতে পারে। এই কাঠামো চূড়ান্ত করতে হলে ঠিক করতে হবে—কোন ধরনের কোম্পানি এই সুবিধা পাবে, শেয়ারের ন্যায্যমূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং মোট শেয়ারের কত অংশ বাজারে ছাড়তে হবে। পাশাপাশি তালিকাভুক্তির পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হলে কোম্পানির আর্থিক তথ্য প্রকাশ, স্বচ্ছতা ও শেয়ারমূল্য নির্ধারণে যথাযথ মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির ওপরই মূলত নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা।
একই সঙ্গে ২০১৫ সালের বিদ্যমান তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত প্রবিধানমালার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে জারি হওয়া বিভিন্ন নীতিমালার সমন্বয়সাধনের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে বিএসইসি। এ লক্ষ্যে দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী একত্র করে সমন্বিত প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে একটি স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির জন্য ডাইরেক্ট লিস্টিং চালুর পাশাপাশি কোম্পানি পরিদর্শনে পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা এবং দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় বা নিয়ম না মানা কোম্পানিগুলোকে তালিকাচ্যুত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভালো ব্যবসায়িক ভিত্তি ও মুনাফা করা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে প্রবেশের পথ সহজ হবে, যা বাজারে নতুন ও মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলছেন, যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং তালিকাভুক্তি-পরবর্তী কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই উদ্যোগ পুঁজিবাজারের জন্য প্রকৃত অর্থে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারবে।

