২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি নোটিশে যে তথ্যটি সামনে এসেছিল, সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সংকটের খবর নয়; বরং বাংলাদেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের একটি গভীর কাঠামোগত প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়।
দেশের ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩০টিতে তখন আইনসম্মতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ছিল না।
অথচ আইন অনুযায়ী উপাচার্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী। তাঁর নেতৃত্বেই একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা। তাঁর স্বাক্ষরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষার্থীর সনদ, তাঁর নেতৃত্বেই সমাবর্তনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
কিন্তু কোথাও মাসের পর মাস, কোথাও বছরের পর বছর পদটি শূন্য।তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় থেমে নেই।
ভর্তি চলছে। ক্লাস চলছে। পরীক্ষা হচ্ছে। ফল প্রকাশ হচ্ছে। সনদও দেওয়া হচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—প্রধান নির্বাহী ছাড়াই যদি বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে, তাহলে আসলে বিশ্ববিদ্যালয় চালায় কে?
উত্তরটি খুঁজতে হলে যেতে হবে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কাছে।
আর এখানেই বাংলাদেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আসে:
বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক কে?
দাতা আর মালিকের মধ্যে পার্থক্য আছে
পৃথিবীর উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসে বড় বড় দাতার অভাব নেই।
জন ডি. রকফেলার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল অর্থ দিয়েছিলেন। অ্যান্ড্রু কার্নেগি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। লেল্যান্ড স্ট্যানফোর্ডের অর্থে গড়ে উঠেছে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। জেমস বি. ডিউকের অর্থ থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। তারা টাকা দিয়েছেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সম্পত্তি বানাননি। অর্থের বিনিময়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ দাবি করেননি। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় আর একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। ব্যবসা টিকে থাকে মালিকের পুঁজিতে।
বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকে তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতায়। এই কারণেই পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় দাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
এমনকি দাতার অর্থে পরিচালিত কোনো অধ্যাপক নিয়োগে দাতার অতিরিক্ত প্রভাবের অভিযোগ উঠলেও সেখানে তা কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখা হয়।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটিকে ঘিরে এমনই একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। দাতার অর্থে পরিচালিত কিছু অধ্যাপক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দাতার মনোনয়নের সুযোগ থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পাঁচ সদস্যের কমিটিতে দাতার পক্ষ থেকে দুইজনকে মনোনয়নের সুযোগ—এটুকুই যথেষ্ট ছিল বিতর্কের জন্য।
আর বাংলাদেশে?
এখানে মূল উদ্যোক্তারাই বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কেন্দ্রে থাকেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অর্থ দেন, তিনিই প্রতিষ্ঠানের শাসন কাঠামোর অংশ। এখানেই পার্থক্যটা গুরুতর।
বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতেই দ্বৈততা
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। উদ্যোক্তারা অর্থ দেবেন। কিন্তু ব্যক্তিগত মুনাফা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ নেওয়ার কথা নয়। কাগজে কাঠামোটি তাই খুব সুন্দর।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষমতা কার হাতে?
আইন অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগ দেন আচার্য বা রাষ্ট্রপতি। তবে উপাচার্য নিয়োগের জন্য তিনজনের নামের তালিকা পাঠায় বোর্ড অব ট্রাস্টিজ।
অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থদাতা উদ্যোক্তারাই ট্রাস্টি বোর্ডে থাকেন, আবার উপাচার্য নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
এখানে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিক বাছাইয়ের ক্ষমতা থাকে উদ্যোক্তা-নিয়ন্ত্রিত বোর্ডের হাতে।
এই কাঠামো থেকেই প্রশ্ন আসে—
বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই অলাভজনক, যদি এর আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা একই গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে?
মুনাফা না থাকলেও সুবিধা থাকতে পারে
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা আইন ভেঙে সরাসরি টাকা আত্মসাৎ করছেন—এমন সাধারণীকরণ করা ঠিক নয়।
কিন্তু ব্যক্তিগত মুনাফা না থাকলেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্যোক্তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, আসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থের প্রবাহ।
বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা উচ্চশিক্ষার বিপুল চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য অপেক্ষা করে।
এই ঘাটতির জায়গা পূরণ করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে টিউশন ফি থেকে তৈরি হচ্ছে বিশাল আর্থিক প্রবাহ।
প্রশ্ন হলো—এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে?
কার কাছে যাচ্ছে?
কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পণ্য ও সেবা কিনছে? কত দামে কিনছে?
বোর্ডের সদস্য বা তাদের স্বজনদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন হলে সেটি কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোই হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কেন্দ্রে।
নর্থ সাউথের মামলা: সতর্ক হওয়ার কারণ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাগুলো এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
২০২২ সালে ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েকজন সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। অভিযোগ ছিল স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি কেনার ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং অর্থের অসঙ্গতি।
পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যবহার করে ট্রাস্টিদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভিযোগেও মামলা হয়েছে।
এখানে আবারও বলা দরকার—এসব অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। মামলাগুলো বিচারাধীন।
কিন্তু অভিযোগগুলোর প্রকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। একটি অলাভজনক বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের ওপর ট্রাস্টিদের ব্যক্তিগত সুবিধা কতটা গ্রহণযোগ্য?
আর যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তে জমি কেনার ক্ষেত্রে বাজারদরের সঙ্গে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠে থাকে, তাহলে সেই হিসাব কি শুধু একটি মামলার বিষয়?
নাকি এটি বৃহত্তর ব্যবস্থার দুর্বলতার লক্ষণ?
জমি: শিক্ষা না সম্পদ?
- বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্থায়ী ক্যাম্পাস দরকার।
- জমি দরকার।
- ভবন দরকার।
- কিন্তু জমি এমন একটি সম্পদ, যার মূল্য শুধু ক্রয়ের সময়ে নির্ধারিত হয় না।
- একটি বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে যায়, সেখানে ধীরে ধীরে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠে।
- হাজার হাজার শিক্ষার্থী মানে পরিবহন।
- শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য মেস।
- খাবারের জন্য রেস্তোরাঁ।
- ক্যাম্পাস ঘিরে দোকানপাট।
- নতুন আবাসন।
- আর এর সঙ্গে বাড়ে আশপাশের জমির মূল্য।
এখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর যদি একই সঙ্গে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ও সম্প্রসারণের সঙ্গে সেই ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্পর্ক আছে কি না—এ প্রশ্ন করা অস্বাভাবিক নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় তখন শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকে না। সে হয়ে ওঠে একটি অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমের কেন্দ্র।
বিশ্ববিদ্যালয় একা নয়, সঙ্গে থাকে পুরো ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য
একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে।
- ভবন নির্মাণ হয়।
- ভাড়া নেওয়া হয়।
- কম্পিউটার কেনা হয়।
- সফটওয়্যার কেনা হয়।
- বই ছাপা হয়।
- খাবার সরবরাহ করা হয়।
- পরিবহন পরিচালিত হয়।
- ব্যাংকিং সেবা নেওয়া হয়।
- নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, প্রযুক্তি—সবকিছুর জন্য অর্থ ব্যয় হয়।
এখন উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর যদি এসব খাতে নিজেদের ব্যবসা থাকে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় ও সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লেনদেন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এখানেই দরকার স্বচ্ছতা।
যে প্রতিষ্ঠান টাকা দিচ্ছে, তার মালিক কি একই সঙ্গে সেই টাকা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানেরও মালিক?
যদি হয়, তাহলে লেনদেনটি স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি না? এটাই স্বার্থের সংঘাতের মূল প্রশ্ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, বৈধতা
একজন ব্যবসায়ীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়।
- বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক মর্যাদা দেয়।
- প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দেয়।
- একটি ব্র্যান্ড তৈরি করে।
প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সনদে সেই নাম লেখা থাকে। অর্থাৎ একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
এটি কোনো ছোট অর্জন নয়।
এই কারণেই ড্যাফোডিল, ইউনাইটেড কিংবা অন্যান্য ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডের সঙ্গেও পরিচিতি তৈরি করে।
এখানে প্রশ্নটা নাম নিয়ে নয়।
প্রশ্ন হলো—একটি বিশ্ববিদ্যালয় কি কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্র্যান্ড সম্প্রসারণের মাধ্যম হওয়া উচিত, নাকি তার নিজের একটি স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় থাকা উচিত?
ভেবলেনের আশঙ্কা, বাংলাদেশের বাস্তবতা
১৯১৮ সালে অর্থনীতিবিদ থর্স্টেইন ভেবলেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাব নিয়ে লিখেছিলেন।
তার আশঙ্কা ছিল, ব্যবসায়িক মানসিকতা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় প্রবল হয়ে ওঠে, তাহলে শিক্ষার পরিবর্তে সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
- বেশি শিক্ষার্থী।
- বেশি ভর্তি।
- বেশি প্রচার।
- বেশি আয়।
- বেশি ব্র্যান্ড ভ্যালু।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখন জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে বাজারনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন হলো—ভেবলেন যে আশঙ্কা এক শতাব্দী আগে করেছিলেন, বাংলাদেশ কি সেই ঝুঁকির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে?
রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়া
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা শুধু ক্যাম্পাসের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়।
- এর সঙ্গে ব্যবসা আছে।
- রাষ্ট্র আছে।
- রাজনীতি আছে।
- প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতি আছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠনেও বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিরা নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংগঠনটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হয়তো বড় কিছু মনে হবে না।
কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে রাখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—
বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড কি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ড, নাকি এটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের। আর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান যদি দুর্বল হয়, তাহলে কোনো আইনই যথেষ্ট নয়।
সমস্যার সমাধান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা নয়
এই খাতকে খারাপ বলে পুরো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাকে বাতিল করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ সত্যিটাও আমাদের স্বীকার করতে হবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা সীমিত। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার বাইরে থেকে যায়।
এই শূন্যতা পূরণ করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থী এখান থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছে। অনেক শিক্ষক গবেষণা করেছেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের কিছু কার্যক্রমও গড়ে তুলেছে। একজন পরিবারের প্রথম গ্র্যাজুয়েটের সনদ কোনো ট্রাস্টি বোর্ডের অনিয়মের অভিযোগে মূল্যহীন হয়ে যায় না।
সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বে নয়। সমস্যা হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে। মালিকানা, অর্থ ও পরিচালনার ক্ষমতা যদি একই হাতে থাকে, তাহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঝুঁকি বাড়ে।
তাহলে কী করা উচিত?
সমাধান হতে পারে একটি নতুন শাসন কাঠামো। যেখানে—
প্রথমত, ট্রাস্টি বোর্ডে স্বাধীন সদস্য বাধ্যতামূলক করা হবে।
দ্বিতীয়ত, উদ্যোক্তা বা দাতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো আর্থিক লেনদেনে স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে।
তৃতীয়ত, জমি, নির্মাণ ও বড় অঙ্কের ক্রয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন এবং তৃতীয় পক্ষের অডিট নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
পঞ্চমত, উপাচার্য নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
ষষ্ঠত, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের সম্পদ ও স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কিত ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
সপ্তমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা ও পরিচালনার মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি করতে হবে।
শেষ প্রশ্নটি সবচেয়ে কঠিন
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বদলাতে পারেন। ট্রাস্টি বদলাতে পারেন। সরকার বদলাতে পারে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হতে পারে। একজন উদ্যোক্তা মারা যেতে পারেন।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়?
বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কথা। হার্ভার্ড আমেরিকার চেয়ে পুরোনো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছে ব্রিটিশ শাসনের অবসান, পাকিস্তানের জন্ম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং একাধিক রাজনৈতিক যুগের পরিবর্তন।
বিশ্বের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে আছে কারণ তারা কোনো এক ব্যক্তির সম্পত্তি হয়ে ওঠেনি।
মালিক মারা গেলে প্রতিষ্ঠান মারা যায়নি।রাজা বদলালে প্রতিষ্ঠান বদলে যায়নি। ব্যবসায়ী দেউলিয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয় দেউলিয়া হয়নি।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই।
একজন মালিকের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য যদি কোনোদিন ভেঙে পড়ে, তার বিশ্ববিদ্যালয় কি স্বাধীনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়। তার জমি নয়। তার ব্যাংক ব্যালান্স নয়। তার ব্র্যান্ডও নয়।
তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো—তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা।
আর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই, কিন্তু মালিক আছে—সেখানে আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি তাই উপাচার্যকে নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি আরও গভীর—এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক কে?
এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—মালিক বদলালে বিশ্ববিদ্যালয় কি টিকে থাকবে?
কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের মালিকানা কোনো এক ব্যক্তি, পরিবার বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে থাকা উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মালিক হওয়া উচিত তার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
লেখক: মিজান মাজনুন
আইনজীবী ও সাংবাদিক

