বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর ভবিষ্যতের কোনো ধারণা নয়; এটি দ্রুত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। মোবাইল আর্থিক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন এবং সরকারি অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থার বিস্তারে ব্যাংকিং সেবা ধীরে ধীরে শাখাকেন্দ্রিক কাঠামোর বাইরে যাচ্ছে। এর পরবর্তী বড় ধাপ হিসেবে সামনে এসেছে ডিজিটাল ব্যাংক। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, নারী, শ্রমজীবী এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য এর সম্ভাবনা যথেষ্ট।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া কিংবা একটি অ্যাপ চালু করলেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে না। বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তিকে কতটা মানুষের সামর্থ্য, প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও আস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায় তার ওপর। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাও একই বার্তা দিচ্ছে—প্রযুক্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
বিশ্বব্যাংকের Global Findex 2025-এর ২০২৪ সালের তথ্য বাংলাদেশের আর্থিক ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। নতুন এই সংস্করণে আর্থিক হিসাবের পাশাপাশি মোবাইল ফোনের মালিকানা, ইন্টারনেট ব্যবহার, ডিজিটাল লেনদেন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শুধু কতজনের হিসাব আছে তা নয়, মানুষ সেই হিসাব কীভাবে ব্যবহার করছে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সংযোগ কতটা—তাও বোঝা সম্ভব হচ্ছে।
এ থেকে স্পষ্ট যে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী পর্যায়ে শুধু হিসাব খোলার সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারবে, নিরাপদে অর্থ পাঠাতে ও গ্রহণ করতে পারবে, প্রয়োজনের সময় ঋণ পাবে এবং নিজের আর্থিক সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ‘ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নির্দেশিকা’ জারি করে। এর ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট সংশোধিত ও হালনাগাদ ‘ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নির্দেশিকা—দ্বিতীয় সংস্করণ’ প্রকাশ করা হয়।একই সঙ্গে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে শাখাবিহীন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত, নিরাপদ ও আধুনিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা, প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বিস্তারিত কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকের মূল সম্ভাবনা হলো—প্রচলিত শাখা স্থাপনের প্রয়োজন কমিয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে কারা এর গ্রাহক হচ্ছেন তার ওপর। যদি ডিজিটাল ব্যাংক মূলত শহরের মধ্যবিত্ত ও প্রযুক্তিসচেতন জনগোষ্ঠীর আরেকটি সুবিধাজনক ব্যাংকিং মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে এর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য সীমিত থাকবে। প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন প্রত্যন্ত এলাকার কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষও সহজে এর সুবিধা নিতে পারবেন।
মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা ইতোমধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য অর্থ লেনদেনকে অনেক সহজ করেছে। দূরবর্তী এলাকায় বসেও টাকা পাঠানো ও গ্রহণ, বিভিন্ন বিল পরিশোধ এবং অন্যান্য দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ব্যাংকের শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে, সাশ্রয় হয়েছে সময় ও যাতায়াতের ব্যয়।
মোবাইল আর্থিক সেবার আরেকটি বড় সুবিধা হলো দ্রুততা। প্রবাসী বা দেশের অন্য অঞ্চল থেকে পাঠানো অর্থ দ্রুত পরিবারের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ডিজিটাল লেনদেনের এই অভ্যাস ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। আগে ছোট অঙ্কের লেনদেনের জন্য ব্যাংক শাখায় যাওয়া বা নানা কাগজপত্রের প্রয়োজন হতো; ডিজিটাল মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে লেনদেনের তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর নিয়মিত ডিজিটাল আয়-ব্যয়ের তথ্য তার ব্যবসার আর্থিক সক্ষমতার একটি প্রাথমিক চিত্র দিতে পারে। যথাযথ গোপনীয়তা ও গ্রাহকের সম্মতি বজায় রেখে এই তথ্য ব্যবহার করা গেলে ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ মূল্যায়ন সহজ হতে পারে এবং জামানতনির্ভর অর্থায়নের বাইরে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারের G2P ব্যবস্থার বিস্তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, বিভিন্ন সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক বা ডিজিটাল আর্থিক হিসাবে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের Global Findex-এর তথ্যেও বাংলাদেশে সরকারি অর্থ ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ ধরনের ব্যবস্থা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমাতে পারে, অর্থ বিতরণে গতি আনতে পারে এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে সবার নিজস্ব হিসাব ও ডিজিটাল ব্যবহারের সক্ষমতা নিশ্চিত না হলে এই সুবিধার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩০টি ব্যাংক ২০,৫৫৭টি আউটলেটের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছিল। এসব হিসাবের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৮৫.০৮ শতাংশ হিসাব গ্রামীণ গ্রাহকদের এবং ৪৯.৪৯ শতাংশ নারী গ্রাহকদের।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য অনেক। এটি দেখায়, প্রান্তিক মানুষ ব্যাংকিং সেবা নিতে আগ্রহী; কিন্তু তাদের কাছে সেবা পৌঁছানোর পদ্ধতিটি বাস্তবসম্মত হতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত এজেন্টের উপস্থিতি মানুষের আস্থা তৈরি করেছে। তাই ডিজিটাল ব্যাংককে পুরোপুরি মানুষবিহীন কাঠামোর পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী এজেন্ট, মার্চেন্ট ও স্থানীয় সহায়তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা অধিক কার্যকর হতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য অর্থায়নের নতুন পথ তৈরি করতে পারে। প্রচলিত ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের হিসাব, জামানত, কাগজপত্র ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার কারণে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পিছিয়ে থাকেন। ডিজিটাল লেনদেনের ধারাবাহিক তথ্য থাকলে তাদের আর্থিক কর্মকাণ্ডের একটি প্রাথমিক রেকর্ড তৈরি হতে পারে।
এর ভিত্তিতে ছোট অঙ্কের ব্যবসায়িক ঋণ, কার্যকরী মূলধন, কৃষি অর্থায়ন কিংবা জরুরি আর্থিক সহায়তার মতো সেবা তৈরি করা সম্ভব। তবে গ্রাহকের লেনদেনের তথ্য যেন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে কঠোর তথ্য-সুরক্ষা ও গ্রাহকের সম্মতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহারে পুরোপুরি দক্ষ নয়। অ্যাপ পরিচালনা, পাসওয়ার্ড, পিন, ওটিপি, হিসাবের তথ্য যাচাই কিংবা ডিজিটাল লেনদেনের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অনেকেই সেবা নিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন।
ফলে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল ও আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু অ্যাপ ব্যবহার শেখানো নয়—প্রতারণা শনাক্ত করা, নিরাপদ পিন তৈরি, সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলা এবং ভুল লেনদেন হলে কীভাবে অভিযোগ করতে হবে, এসব বিষয়ও শেখাতে হবে।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। ভুয়া ফোন, পিন বা ওটিপি হাতিয়ে নেওয়া, ফিশিং, পরিচয় জালিয়াতি ও সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা কম প্রযুক্তিসচেতন গ্রাহকদের জন্য বড় ঝুঁকি।
বিশ্বব্যাংকের Global Findex 2025-এর বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্যেও মোবাইল মানি ব্যবহারকারীদের কাছে অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে পিন বা পাসওয়ার্ড চাওয়ার অভিজ্ঞতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
তাই ডিজিটাল ব্যাংকের সাফল্যের জন্য প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রাহকের আস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ, তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা, সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
দেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এখনো ডিজিটাল সেবার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে একটি এলাকায় ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় লেনদেন সম্পন্ন করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।
এ কারণে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রযুক্তি এমন হতে হবে, যা তুলনামূলক দুর্বল নেটওয়ার্কেও মৌলিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানো আর্থিক অন্তর্ভুক্তিরও পূর্বশর্ত।
নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংক বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। ঘরে বসে অর্থ গ্রহণ, সঞ্চয় ও হিসাব পরিচালনার সুবিধা নারীর আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান এখনো একটি বাস্তব বাধা।
তাই নারীদের জন্য আলাদা ডিজিটাল শিক্ষা, সহজ ভাষার সেবা, নিরাপদ ব্যবহার এবং প্রয়োজনে নারী এজেন্টের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নারী শুধু হিসাবের মালিক হবেন না, নিজের হিসাব স্বাধীনভাবে পরিচালনাও করতে পারবেন।
একটি ব্যাংক হিসাব খোলা বা মোবাইল আর্থিক অ্যাকাউন্ট তৈরি করাকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। হিসাবটি সক্রিয় কি না, নিয়মিত লেনদেন হচ্ছে কি না, মানুষ সঞ্চয় করতে পারছে কি না, প্রয়োজনের সময় ঋণ পাচ্ছে কি না এবং নিজের অর্থ নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না—এসব বিষয়ই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তির মাপকাঠি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই ‘কতটি হিসাব খোলা হয়েছে’ থেকে ‘কতজন সক্রিয়ভাবে আর্থিক সেবা ব্যবহার করছেন’—এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি।
বাংলাদেশের বাস্তবতার জন্য সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে সম্পূর্ণ শাখাবিহীন, কিন্তু প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মানবিক সহায়তাসম্পন্ন ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ব্যাংকের মূল কার্যক্রম থাকবে অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে; তবে গ্রাহককে সহায়তা করার জন্য অনুমোদিত এজেন্ট, মার্চেন্ট ও স্থানীয় সেবা-কেন্দ্র থাকবে।
অ্যাপ হতে হবে সহজ ভাষার, কম ডেটা-নির্ভর এবং ব্যবহারবান্ধব। দুর্বল নেটওয়ার্কেও মৌলিক সেবা ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বেশি উপকৃত হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও প্রচলিত ব্যাংকের মধ্যে আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা বাড়ানো গেলে গ্রাহকের লেনদেনের সুযোগও বিস্তৃত হবে।
ডিজিটাল ব্যাংককে সত্যিকার অর্থে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হাতিয়ার করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, সেবার খরচ এমন পর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে নিম্নআয়ের মানুষও নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ও আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে দেশব্যাপী কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে। তৃতীয়ত, গ্রাহকের অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, গ্রামীণ এলাকায় এজেন্ট ও স্থানীয় সহায়তা কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। পঞ্চমত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য দায়িত্বশীল তথ্যনির্ভর অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংকের সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রেও শুধু লাইসেন্সের সংখ্যা বা নতুন হিসাব খোলার পরিমাণ যথেষ্ট নয়। সক্রিয় গ্রাহক, নারী ও নিম্নআয়ের মানুষের অংশগ্রহণ, গ্রামীণ লেনদেন, ক্ষুদ্র সঞ্চয়, ক্ষুদ্র ঋণ, লেনদেনের ব্যয় এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির হারকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে বড়। মোবাইল আর্থিক সেবা ও এজেন্ট ব্যাংকিং ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, সঠিক অবকাঠামো ও মানুষের আস্থার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ব্যাংকিং সেবা শহরের সীমানা পেরিয়ে গ্রামেও পৌঁছানো সম্ভব। ডিজিটাল ব্যাংক সেই অগ্রগতিকে আরও বিস্তৃত ও আধুনিক করার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে এই উদ্যোগের সাফল্য প্রযুক্তির আধুনিকতায় নয়, মানুষের জীবনে এর বাস্তব প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে। যে কৃষক ব্যাংক শাখায় যেতে পারেন না, যে নারী নিজের নামে সঞ্চয় করতে চান, যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জামানত নেই, যে শ্রমজীবী মানুষ দূর থেকে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠান—ডিজিটাল ব্যাংক যদি তাদের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সহজ আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।
তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ডিজিটাল ব্যাংকের বিস্তার নয়, ডিজিটালের মাধ্যমে কার্যকর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। প্রযুক্তি হবে মাধ্যম, কিন্তু কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানুষ। এই ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারলেই ডিজিটাল ব্যাংক দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন আর্থিক সুযোগ সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

