একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এ দেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এই বাস্তবতায় উন্নয়ন বলতে শুধু উৎপাদন ও আয় বাড়ানো আর যথেষ্ট নয়; উন্নয়নকে হতে হবে পরিবেশসম্মত, জলবায়ু-সহনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই। আর সেই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থায়ন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোন খাতে অর্থ দেবে, কোন প্রকল্পকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করবে এবং কোন প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করবে—তার ওপর ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চরিত্র অনেকটাই নির্ভর করে। এখানেই গ্রিন ব্যাংকিং বা সবুজ ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব।
গ্রিন ব্যাংকিং কোনো আলাদা প্রচারণামূলক ব্যাংকিং পদ্ধতি নয়; এটি অর্থায়নের সিদ্ধান্তে পরিবেশ, জলবায়ু ও সামাজিক প্রভাবকে যুক্ত করার একটি বিস্তৃত কাঠামো। বাংলাদেশের জন্য এটি একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, শিল্পের আধুনিকায়ন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক ঝুঁকি কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
গ্রিন ব্যাংকিংয়ের ধারণা: ব্যাংকিং থেকে অর্থায়নের সবুজ রূপান্তর। সাধারণভাবে গ্রিন ব্যাংকিংয়ের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমকে পরিবেশবান্ধব করা—যেমন কাগজের ব্যবহার কমানো, ই-স্টেটমেন্ট, অনলাইন ও ডিজিটাল ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। দ্বিতীয়ত, এমন প্রকল্প ও ব্যবসায় অর্থায়ন করা, যেগুলো পরিবেশগত ক্ষতি কমায় বা জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ায়।
দ্বিতীয় অংশটি মূলত সবুজ অর্থায়ন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি ও সম্পদ-দক্ষ প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তরল বর্জ্য শোধন, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন, সবুজ কৃষি, সবুজ ভবন, চক্রাকার অর্থনীতি, নীল অর্থনীতি এবং পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এর আওতায় পড়তে পারে। অর্থাৎ আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সাফল্য শুধু কত মুনাফা হলো, তার ওপর নির্ভর করবে না। অর্থায়নের মাধ্যমে মানুষ, পরিবেশ ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে—সেটিও বিবেচ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গিই টেকসই অর্থায়নের ভিত্তি।
বাংলাদেশের পথচলা: এক দশকের বেশি সময়ের নীতিগত ভিত্তি। বাংলাদেশে সবুজ ব্যাংকিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি । বাংলাদেশ ব্যাংক ওই বছর পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য নীতিগত কাঠামো প্রণয়ন করে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাঠামোবদ্ধ প্রতিবেদন ও পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়। ২০১৬ সাল থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ বিতরণ বা বিনিয়োগের ন্যূনতম ৫ শতাংশ সরাসরি সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশবান্ধব পণ্য ও প্রকল্পে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, টেকসই অর্থায়ন নীতি, সবুজ বন্ডের নীতি, পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত আর্থিক তথ্য প্রকাশের মতো উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২০ সালের টেকসই অর্থায়ন নীতি ২০২৩ সালে হালনাগাদ করা হয়। ফলে বাংলাদেশে গ্রিন ব্যাংকিং এখন শুধু পরিবেশবান্ধব ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।
সবুজ অর্থায়নে অগ্রগতি কতটা? সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সবুজ অর্থায়নের বিস্তার সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৩০ হাজার ৬৫৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা সবুজ অর্থায়ন বিতরণ করেছে। ২০২৫ সালে এই পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজার ৩৬৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সবুজ অর্থায়ন বিতরণ সামান্য কমেছে।
তবে সামগ্রিক প্রবণতা বিবেচনা করলে সবুজ অর্থায়নের বিস্তার উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে যেখানে সবুজ অর্থায়নের বিতরণ ছিল প্রায় ৭ হাজার ২৩২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, পরবর্তী বছরগুলোতে তা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে ফলে এক বছরের ওঠানামাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিস্তারের দিকটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ইতিমধ্যে বড় অঙ্কে পৌঁছালেও এর প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী নয়। ফলে শুধু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানোর পরিবর্তে অর্থায়নের গুণগত মান, প্রকল্পের বাস্তব পরিবেশগত সুফল এবং অর্থায়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। সবুজ অর্থায়নের বিতরণ, মোট ঋণের স্থিতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা—এই তিনটি আলাদা সূচক। তাই বিভিন্ন বছরের পরিসংখ্যান তুলনা করার সময় একই ধরনের সূচক ব্যবহার করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবুজ অর্থায়নের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরাসরি সবুজ অর্থায়নের ন্যূনতম ৫ শতাংশ লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতে কার্যকর রয়েছে।
এই লক্ষ্যমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নকে ব্যাংকিং খাতের একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে আনা হয়েছে। ফলে কোনো ব্যাংক তার সামগ্রিক ঋণ কার্যক্রমে সবুজ প্রকল্পকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটি পরিমাপ করার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই শেষ কথা নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অর্থায়নের মাধ্যমে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে, কতটা বর্জ্য কমেছে, কতটা পানি সংরক্ষণ হয়েছে কিংবা কতটা পরিবেশগত ঝুঁকি কমেছে—তার ওপর।
সবুজ অর্থায়নের প্রসারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। পরিবেশবান্ধব পণ্য, প্রকল্প ও উদ্যোগে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল পরিচালনা করে আসছে। এই ব্যবস্থার আওতায় শুরুতে মাত্র কয়েকটি পরিবেশবান্ধব পণ্য থাকলেও সময়ের সঙ্গে যোগ্য পণ্য ও উদ্যোগের সংখ্যা বেড়ে ৭০টিতে পৌঁছেছে। অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে এসব সবুজ প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারে। সৌর সেচ পাম্পের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সুদের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এ ধরনের পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থা সবুজ প্রযুক্তির উচ্চ প্রাথমিক ব্যয়ের একটি অংশ সামাল দিতে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, তরল বর্জ্য শোধনাগার ও সম্পদ-দক্ষ প্রযুক্তির মতো প্রকল্পে কম খরচের অর্থায়ন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে সহজ করতে পারে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে পরিবেশবান্ধব পণ্য, প্রকল্প ও উদ্যোগের জন্য আরও একটি ৪০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করে। এ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ১ শতাংশ হারে পুনঃঅর্থায়ন দেয় এবং গ্রাহক পর্যায়ে সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের সবুজ রূপান্তরেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সবুজ অর্থায়ন এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট ঋণখাত নয়; শিল্পের প্রযুক্তিগত রূপান্তরেও এর ভূমিকা বাড়ছে।
কোন খাতে যাচ্ছে সবুজ অর্থায়ন? বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের ক্ষেত্র এখন আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। নবায়নযোগ্য ও বিকল্প জ্বালানি, জ্বালানি ও সম্পদ দক্ষতা, কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন, সবুজ কৃষি, সবুজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, চক্রাকার অর্থনীতি এবং নীল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থায়ন হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচ পাম্প, বায়োগ্যাস ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়ন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সৌরভিত্তিক সেচ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ডকে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য শোধন এবং পরিবেশবান্ধব কারখানায় বিনিয়োগ শুধু পরিবেশের জন্য নয়, রপ্তানি প্রতিযোগিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডও রপ্তানিমুখী উৎপাদনকারীদের সবুজ প্রযুক্তি ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চক্রাকার অর্থনীতি। শিল্প ও নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ, জৈব সার বা শক্তি উৎপাদনের প্রকল্পে অর্থায়ন করলে একই সঙ্গে দূষণ কমানো ও নতুন অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব। শিল্পকারখানায় তরল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনেও সবুজ অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশবান্ধব ভবন, জ্বালানি-সাশ্রয়ী অবকাঠামো এবং বিকল্প নির্মাণ উপকরণে অর্থায়ন নগরায়ণের পরিবেশগত চাপ কমাতে পারে। বিশেষ করে ইট উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের চাপ ও বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
জলবায়ু ঝুঁকি এখন ব্যাংকেরও আর্থিক ঝুঁকি। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা শুধু পরিবেশগত কারণে নয়, ব্যাংকের আর্থিক নিরাপত্তার কারণেও। একটি বন্যায় কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উৎপাদন বন্ধ হতে পারে; ঘূর্ণিঝড়ে কৃষি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঋণগ্রহীতার আয় কমতে পারে; দীর্ঘস্থায়ী লবণাক্ততা কোনো এলাকার জমির উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। এর প্রতিটি ঘটনাই শেষ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ব্যাংকের সম্পদের মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই কারণে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়ন এখন ঋণ অনুমোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, সামাজিক ঝুঁকি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী হতে পারে।
গ্রিন ব্যাংকিংয়ের অর্থনৈতিক সুফল। সবুজ অর্থায়নকে শুধু পরিবেশ রক্ষার ব্যয় হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ধরা পড়ে না। জ্বালানি-দক্ষ প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে পারে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। পরিবেশবান্ধব শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের নতুন পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে সহায়তা করতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যাংকের জন্যও সুফল রয়েছে। পরিবেশগত ঝুঁকি আগে থেকে শনাক্ত করা গেলে উচ্চঝুঁকির প্রকল্পে ভুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা কমতে পারে। অর্থাৎ সবুজ অর্থায়ন শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও অংশ।
ডিজিটাল ব্যাংকিং: সবুজ রূপান্তরের আরেক দিক। ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমও পরিবেশবান্ধব করা জরুরি। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-স্টেটমেন্ট ও ডিজিটাল নথি ব্যবহারের ফলে কাগজের ব্যবহার এবং শাখাভিত্তিক কিছু পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ভবন, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব অফিস ব্যবস্থাপনাকে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ করা দরকার। তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ সবুজ হয়ে যায় না। তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো পরিচালনায় বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং যন্ত্রপাতির জীবনচক্রের পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই প্রকৃত সবুজ রূপান্তর হতে হবে সামগ্রিক।
অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। প্রথমত, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক সময় প্রচলিত প্রযুক্তির তুলনায় বেশি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, অনেক উদ্যোক্তার কাছে সবুজ প্রযুক্তি ও অর্থায়ন সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও প্রকল্পের পরিবেশগত সুফল এবং প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের প্রয়োজন। অথচ ব্যাংকিং ব্যবস্থার অর্থায়ন কাঠামোতে স্বল্পমেয়াদি তহবিলের ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সবুজ প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো গ্রিনওয়াশিং। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশগত সুফল না থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রকল্পকে সবুজ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে অর্থায়নের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই প্রকল্পের দাবি নয়, পরিমাপযোগ্য ফলাফলই হতে হবে সবুজ অর্থায়নের ভিত্তি।
গুণগত পরিবর্তন: শুধু টাকার অঙ্ক নয়, অর্থের গন্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ কয়েক দশক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং অর্থায়নের পর প্রকল্পগুলো কতটা পরিবেশগত ফল তৈরি করছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পানি সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ কিংবা জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে অর্থের ব্যবহার যত বাড়বে, অর্থনীতির সবুজ রূপান্তর তত শক্তিশালী হবে। বিপরীতে কেবল হিসাবের খাত পূরণ করতে প্রকল্পকে সবুজ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই প্রতিটি প্রকল্পে অর্থায়নের আগে ও পরে পরিবেশগত ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কত বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছে, কত পানি কম ব্যবহার হয়েছে, কত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হয়েছে বা কত কার্বন নিঃসরণ এড়ানো গেছে—এসব সূচককে ভবিষ্যৎ প্রতিবেদনের অংশ করা উচিত।
সবুজ অর্থায়নের গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শুধু ঋণ দেওয়ার সময়ের আনুষ্ঠানিকতা হলে চলবে না। ঋণ অনুমোদনের পর প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ এবং প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জিত হচ্ছে কি না—সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং টেকসই অর্থায়নের প্রতিবেদনের উদ্দেশ্যও হলো অর্থায়নের ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিবেচনায় আনা। তাই নিয়মিত নিরীক্ষা, তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রিনওয়াশিং প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবুজ অর্থনীতির রূপান্তর শুধু ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়। উদ্যোক্তাদেরও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী হতে হবে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে অর্থায়ন, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, প্রকল্প প্রস্তুতিতে কারিগরি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থের ব্যবস্থা করা গেলে উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি কমবে।
অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের উচিত শুধু কম সুদের ঋণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে সবুজ প্রকল্পের পরিচয় ব্যবহার না করে বাস্তব পরিবেশগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা। প্রকল্পের প্রযুক্তি, জ্বালানি ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়া হলে ব্যাংকের প্রকল্প মূল্যায়নও সহজ হবে। অর্থাৎ ব্যাংক ও উদ্যোক্তার সম্পর্ককে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে পরিণত করা প্রয়োজন।
প্রথমত, সবুজ বন্ড ও টেকসই বন্ডের বাজার আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহে এসব উপকরণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ইসলামি অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সবুজ সুকুকের সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য নতুন বিনিয়োগকারী পাওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, সবুজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, আংশিক ঋণ-নিশ্চয়তা ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে ছোট উদ্যোক্তারাও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। তৃতীয়ত, সবুজ প্রকল্পের ফলাফল পরিমাপের জন্য অভিন্ন সূচক প্রয়োজন। কত টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে—তার পাশাপাশি কত বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছে, কত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হয়েছে, কত পানি সাশ্রয় হয়েছে কিংবা কত কার্বন নিঃসরণ এড়ানো গেছে—এসব তথ্যও প্রকাশ করা উচিত।
চতুর্থত, ব্যাংকার, উদ্যোক্তা ও প্রকল্প মূল্যায়নকারীদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। কারণ অর্থায়ন সবুজ করতে হলে অর্থের পাশাপাশি সঠিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানও প্রয়োজন। পঞ্চমত, গ্রিনওয়াশিং ঠেকাতে নিয়মিত নিরীক্ষা ও স্বাধীন যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। সবুজ অর্থায়নের স্বচ্ছতা যত বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের আস্থাও তত বাড়বে।
সামনে যে বাস্তবতা। বাংলাদেশের সবুজ ব্যাংকিং কাঠামো এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং অর্থায়নের গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৪ সালে সবুজ অর্থায়ন বিতরণ ছিল ৩০ হাজার ৬৫৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে তা ৩০ হাজার ৩৬৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিতরণ সামান্য কমেছে। এই পরিস্থিতি দেখায় যে নীতিগত লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তব অর্থায়নে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক, উদ্যোক্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থাগুলো সবুজ প্রকল্পে তুলনামূলক কম খরচে অর্থপ্রবাহের সুযোগ তৈরি করছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প ও পণ্যের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম থেকে ২১২ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৩২ কোটি ৪২ লাখ টাকা বিতরণ হয়েছে।
২০২৬ সালেও সবুজ অর্থায়নের কাঠামো সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জুন ২০২৬-এ ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি ভবন ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি’ উন্নয়নের জন্য নতুন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করেছে। এটি দেখায় যে সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্য এখন শুধু পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ দেওয়া নয়; বরং শিল্প উৎপাদনের কাঠামোগত সবুজ রূপান্তর ঘটানোও এর অংশ হয়ে উঠছে।
একই সঙ্গে সবুজ অর্থায়নের ন্যূনতম ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যাগত হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রকল্পগুলো সত্যিই পরিবেশগত সুফল তৈরি করছে কি না, অর্থায়নের পর সেগুলোর কার্যকারিতা বজায় আছে কি না এবং পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
গ্রিন ব্যাংকিং কোনো বিলাসিতা নয়, আবার শুধু পরিবেশ রক্ষার একটি আলাদা ব্যাংকিং পণ্যও নয়। এটি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণের একটি মাধ্যম। বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ইতিমধ্যে কয়েক দশক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং ব্যাংকিং খাতে পরিবেশগত ঝুঁকি ও টেকসই অর্থায়নের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
তবে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু অর্থের পরিমাণ নয়; সেই অর্থের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ফলাফল। যে অর্থায়নে কারখানা জ্বালানি সাশ্রয়ী হয়, বর্জ্য কমে, পানি সংরক্ষিত হয়, নবায়নযোগ্য শক্তি বাড়ে, কৃষি জলবায়ু-সহনশীল হয় এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের সুযোগ পায়—সেই অর্থায়নই সত্যিকার অর্থে টেকসই অর্থায়ন।
বাংলাদেশের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের মূলধন যদি পরিকল্পিতভাবে সবুজ শিল্প, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও চক্রাকার অর্থনীতির দিকে প্রবাহিত করা যায়, তাহলে অর্থায়ন শুধু প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হবে না; এটি হয়ে উঠবে জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশের নির্মাণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
আজকের অর্থায়নের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের অর্থনীতির চরিত্র নির্ধারণ করবে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু আরও বেশি ঋণ নয়—সঠিক খাতে, সঠিক শর্তে এবং পরিমাপযোগ্য পরিবেশগত ফলসহ অর্থায়ন। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের হাতছানি সেই পরিবর্তনেরই আহ্বান। টেকসই আগামীর সন্ধানে তাই আমাদের অর্থায়নের প্রবাহকে হতে হবে আরও সবুজ, আরও স্বচ্ছ, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সর্বোপরি—দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বশীল।

