একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। মানুষের সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর করা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থের জোগান দেওয়া, আমদানি-রপ্তানি সহজ করা এবং অর্থনীতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে অর্থের প্রবাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা অপরিসীম। তাই ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু ব্যাংকের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, মূলধন ঘাটতি, ঋণ ব্যবস্থাপনার অনিয়ম এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকটের মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্কারের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ব্যাংক পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তির জন্য নতুন আইন, আমানত সুরক্ষার নতুন কাঠামো, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, ঋণ আদায়ের উদ্যোগ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে পরিবর্তনের একটি নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে।
এই পরিবর্তনের সাফল্য অবশ্য শেষ পর্যন্ত একটি জায়গাতেই এসে নির্ভর করবে—গ্রাহক কতটা বিশ্বাস করেন যে ব্যাংকে রাখা তাঁর অর্থ নিরাপদ, প্রয়োজনের সময় তা পাওয়া যাবে এবং কোনো অনিয়ম হলে দায় নির্ধারণ করে প্রতিকার করা হবে। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত গ্রাহকের আস্থা।
খেলাপি ঋণ সংকটের সবচেয়ে বড় চিত্র। ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতা বোঝার জন্য খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর একটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে এর অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ ২০২৬ শেষে এই হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। খেলাপি ঋণের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ। তখন তা রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। জুন ২০২৬-এ সেই হার কিছুটা কমে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু অনুপাত কমলেও মোট খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এটিকে ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না; বরং এটিকে সংস্কারের মধ্য দিয়ে প্রকৃত সমস্যার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠার একটি পর্যায় হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
এখানে আরও একটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। জুন ২০২৬ শেষে মাত্র ১০টি ব্যাংকের হাতে ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, যা পুরো ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ সংকটটি সব ব্যাংকে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই; কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা সামগ্রিক খাতের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
এ কারণেই এখন শুধু নতুন ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে তাকালে হবে না। কোন ঋণ কীভাবে অনুমোদিত হয়েছে, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা কী ছিল, অর্থের ব্যবহার সঠিক হয়েছে কি না এবং ঋণ আদায়ে ব্যাংক কতটা সক্রিয়—এসব প্রশ্নের জবাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
খেলাপি ঋণের উচ্চ হারকে শুধু নতুন করে তৈরি হওয়া সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণিকরণ কঠোর হওয়া, আগে আড়ালে থাকা সমস্যাগ্রস্ত ঋণ প্রকাশ্যে আসা এবং ব্যাংকের হিসাবকে বাস্তব অবস্থার কাছাকাছি আনার প্রক্রিয়াও খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে বড় প্রভাব ফেলেছে।
তাই সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে জুন ২০২৬-এ ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে নামাকে ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত বলা গেলেও, টেকসই উন্নতির প্রমাণ পেতে হলে ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন এবং নতুন ঋণের মান—সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক উন্নতি প্রয়োজন।
এখানেই গ্রাহক আস্থার প্রশ্নটি সামনে আসে। আমানতকারী যখন দেখেন যে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত আসছে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—প্রয়োজনে নিজের সঞ্চয় তিনি কতটা দ্রুত ফেরত পাবেন? এই প্রশ্নের উত্তর যত পরিষ্কার হবে, আস্থাও তত শক্তিশালী হবে।
মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল ব্যাংকের চাপ। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে বেশি সংস্থান রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধনের ওপর চাপ পড়ে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা পৌঁছেছিল। একই সময়ে ৬১টি ব্যাংক মিলিয়ে ব্যবস্থার নিট মূলধন ঘাটতিও ছিল প্রায় প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছিল।
এই চিত্র দেখায়, ব্যাংক খাতের সমস্যাটি শুধু খেলাপি ঋণের হিসাব নয়; এর সঙ্গে ব্যাংকের ক্ষতি শোষণ করার সক্ষমতাও যুক্ত। পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলে একটি ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে সতর্ক হয়ে পড়ে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা সংকুচিত হয়। এ কারণে দুর্বল ব্যাংককে কেবল তারল্য দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে কোথায় পুনর্গঠন প্রয়োজন, কোথায় একীভূতকরণ প্রয়োজন এবং কোথায় নিয়ন্ত্রিত নিষ্পত্তি প্রয়োজন—তা দ্রুত নির্ধারণ করা জরুরি।
ব্যাংক পুনর্গঠন আইনে নতুন কাঠামো। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালের ব্যাংক রেজল্যুশন আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ১০ এপ্রিল ২০২৬ আইনটি কার্যকর হয় এবং আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে পুনর্গঠন, অধিগ্রহণ, পুনঃমূলধনীকরণ ও নিষ্পত্তির মতো ব্যবস্থা নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানকে সময়মতো ব্যবস্থা নিয়ে আমানতকারী ও সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ক্ষতি কমানো।
এই কাঠামোর অধীনে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের মান যাচাইয়ের জন্য বিশেষ পর্যালোচনাও করা হয়েছে। সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—কোনো ব্যাংকের সমস্যা দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি আরও বড় হয়। তাই ভবিষ্যতে আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আমানত সুরক্ষায় নতুন আশ্বাস। গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু ব্যাংককে শক্তিশালী করাই যথেষ্ট নয়; আমানতকারীর জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থাও দরকার। এ কারণে ২০২৬ সালে আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন আইনে প্রতি আমানতকারী, প্রতি প্রতিষ্ঠানের জন্য সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। আইনটি ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় এনেছে।
নতুন ব্যবস্থায় আমানত সুরক্ষা তহবিলকে শুধু আমানত ফেরত দেওয়ার কাজে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যাংক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াতেও ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সংকট দেখা দিলে প্রতিষ্ঠানকে সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্গঠনের জন্যও এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো যাবে। তবে সাধারণ গ্রাহকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের স্বচ্ছতা। কোন অর্থ কতটা সুরক্ষিত, ব্যাংক সমস্যায় পড়লে কী প্রক্রিয়ায় অর্থ পাওয়া যাবে এবং কত সময় লাগতে পারে—এসব তথ্য সহজ ভাষায় গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বৃহত্তর সংস্কার। ব্যাংক খাতের সংস্কার এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের জুনে বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশের আর্থিক খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর অন্যতম লক্ষ্য ক্ষুদ্র আমানতকারীর সুরক্ষা জোরদার করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যাংক পুনর্গঠনের কাঠামো উন্নত করা এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিক করা।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার মতো সমস্যাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা উন্নত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে ঝুঁকি আগে শনাক্ত করা যায়।
এখানে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার আরেকটি আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্পের কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে এটিকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। দুটি উদ্যোগের অর্থায়ন ও প্রকৃতি আলাদা; তাই প্রতিবেদনে সেগুলো পৃথকভাবে বিবেচনা করাই তথ্যগতভাবে নিরাপদ।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নতুন অধ্যায়। ব্যাংক খাতের পরিবর্তনের আরেকটি বড় দিক হলো ডিজিটাল ব্যাংকিং। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে কার্যক্রম প্রস্তুতির জন্য চিঠি দিয়েছে। এগুলো হলো ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক এবং কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক। তবে চিঠি পাওয়া চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স নয়; নির্ধারিত প্রযুক্তিগত, মূলধনী ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের পরই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা যাবে।
ডিজিটাল ব্যাংকের বড় সম্ভাবনা হলো—শাখা স্থাপনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও সহজ সেবা দেওয়া। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তরুণ গ্রাহক এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী এতে উপকৃত হতে পারেন। তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার নিজে থেকেই আস্থা তৈরি করবে না। বরং এর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের মার্চে ব্যাংকের জন্য নতুন সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোও জারি করেছে।
প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক সেবার সমন্বয়। ডিজিটাল সেবা বাড়লেও ব্যাংকিংয়ের মূল সম্পর্কটি থাকবে গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। একটি মোবাইল অ্যাপ কয়েক সেকেন্ডে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে, কিন্তু ভুল লেনদেন হলে গ্রাহক কত দ্রুত সহায়তা পাবেন—সেটিই তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ কারণে ব্যাংকের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তি, গ্রাহকসেবা এবং তথ্য প্রদানের মানও উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হটলাইন ১৬২৩৬ চালু আছে। গ্রাহকের অভিযোগকে শুধু বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। একই ধরনের অভিযোগ বারবার হলে সেটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতার ইঙ্গিত কি না, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মুদ্রানীতি ও বেসরকারি ঋণের চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য সরাসরি সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। জুন ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুন ২০২৬-এ সরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার অংশ হিসেবে আগস্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। তবে শুধু সুদহার কমালেই বেসরকারি ঋণ দ্রুত বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট দুর্বল থাকলে ব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্ক থাকবে। তাই ঋণের গুণগত মান উন্নত না করে শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানোও ঝুঁকিপূর্ণ।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক খাতের স্বস্তি। ব্যাংক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি বৈদেশিক খাতেও কিছু স্বস্তি এসেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিট বৈদেশিক সম্পদ আগের বছরের তুলনায় ২২ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়েছিল।
এই উন্নতি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করার বিকল্প নয়। বৈদেশিক মুদ্রার স্বস্তি সাময়িক চাপ কমাতে পারে; কিন্তু খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের সমস্যা সমাধান করতে হবে ব্যাংকের নিজস্ব কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে। এখন সবচেয়ে প্রয়োজন কী? বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে কয়েকটি বিষয়ে ধারাবাহিক গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রথমত, ঋণ দেওয়ার সময় পরিচয় বা প্রভাব নয়, ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধক্ষমতাকে প্রধান বিবেচনা করতে হবে। ঋণ দেওয়ার পরও অর্থের ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুত করা, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা এবং যেখানে প্রযোজ্য সেখানে অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমানতকারীর অর্থ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে স্বার্থের সংঘাত যাতে প্রভাব ফেলতে না পারে, সে জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ দরকার। চতুর্থত, সাইবার নিরাপত্তাকে ব্যাংকিংয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ নিরাপদ না থাকলে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ওপর আস্থা টেকসই হবে না। পঞ্চমত, ক্ষুদ্র আমানতকারী ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সেবা সহজ করতে হবে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অর্থ শুধু নতুন হিসাব খোলা নয়; প্রয়োজনের সময় সাশ্রয়ী ঋণ, নিরাপদ সঞ্চয়, দ্রুত লেনদেন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির সুযোগও নিশ্চিত করা।
আস্থাই হবে সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে শুধু পুরোনো সমস্যা মেরামত করলেই চলবে না; ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামোও তৈরি করতে হবে। খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া, কয়েকটি ব্যাংকে বিপুল ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকা এবং মূলধন ঘাটতির মতো বাস্তবতা দেখিয়ে দেয় যে পথটি সহজ নয়। অন্যদিকে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, আমানত সুরক্ষা আইন, নতুন তদারকি কাঠামো, বিশ্বব্যাংকের সহায়তা এবং ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোগ সংস্কারের নতুন ভিত্তি তৈরি করছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাফল্য পরিমাপ হবে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায়। একজন শিক্ষক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কিংবা প্রবাসীর পরিবার যখন নিশ্চিন্তে ব্যাংকে টাকা রাখবেন, প্রয়োজনের সময় দ্রুত তা ব্যবহার করতে পারবেন এবং কোনো সমস্যায় ন্যায্য প্রতিকার পাবেন—তখনই বলা যাবে সংস্কারের সুফল বাস্তবে পৌঁছেছে।
ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার মূলধন নয়, মানুষের বিশ্বাস। প্রযুক্তি ব্যাংকিংকে দ্রুত করতে পারে, আইন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আর্থিক সহায়তা দুর্বলতা সাময়িকভাবে সামাল দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ে।
তাই বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের নতুন মোড়ের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু খেলাপি ঋণের হার কমানো নয়—এমন একটি ব্যাংকিং সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে আমানতকারী তাঁর অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাশীল থাকবেন, উদ্যোক্তা ন্যায্য ভিত্তিতে ঋণ পাবেন এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনা জনগণের অর্থ ব্যবহারের জন্য কার্যকরভাবে জবাবদিহি করবে।
গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা তাই কোনো অতিরিক্ত লক্ষ্য নয়; এটিই ব্যাংক খাত সংস্কারের মূল সাফল্যের মানদণ্ড। সেই আস্থা যত শক্তিশালী হবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা তত বেশি সক্ষম হবে অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে।

