বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ষাণ্মাসিকের (ছয় মাস) বদলে ত্রৈমাসিক (তিন মাস অন্তর) মুদ্রানীতি পর্যালোচনা শুরু করেছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে তাল মেলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে শুধু মুদ্রানীতি বা নীতিসুদ দিয়ে অর্থনীতির সার্বিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে তিনি মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাড়াতে নানামুখী সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন।
চলতি ২০২৬ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য ঘোষিত প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে নীতিসুদ হার ৯.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে মূল্যস্থিতি বজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহায়তা করা যাবে এবং তারল্য পরিস্থিতির উন্নতির ফলে এই প্রান্তিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে জুলাইয়ে ৮.৩২ শতাংশ এবং আগস্টে ৮.২৬ শতাংশে নেমেছে। তবে ড. ফাহমিদার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি। জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং নতুন বেতন কাঠামোর মতো সরবরাহ ও ব্যয়জনিত ঝুঁকিগুলো অর্থনীতিতে বড় চাপ হিসেবে রয়ে গেছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগেও স্থবিরতা বিরাজ করছে। আগস্টে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ, যা অতীতের তুলনায় অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিবৃতিতে নিজেই স্বীকার করেছে যে, শুধু নীতিসুদ দিয়ে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। উৎপাদন খাতে ঋণ পৌঁছাতে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও অবকাঠামোগত বাধা মোকাবিলা জরুরি। এই প্রসঙ্গের সাথে একমত পোষণ করে সিপিডির এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি থাকলে নীতিসুদ কমানো হলেও তা প্রকৃত উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাবে না।
ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিকে আরও কার্যকর করতে ড. ফাহমিদা খাতুন বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাসের মান ও তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। বাজার ও ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে ঠিক কী কারণে নীতি বদল হচ্ছে বা আগের পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব ফলের কেন পার্থক্য হলো, তা বাংলাদেশ ব্যাংককে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
পাশাপাশি, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি বা নিত্যপণ্যের দাম সরাসরি কমানো যায় না বলে মত দেন তিনি। এক্ষেত্রে মুদ্রানীতির সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ও সরবরাহ নীতির সঠিক সমন্বয়ের বিকল্প নেই। খাদ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের বাধা দূর করা, সরবরাহ পরিস্থিতি নজরে রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান তিনি।
পরিশেষে ড. ফাহমিদা খাতুন তার বিশ্লেষণে জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন ত্রৈমাসিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অর্থনীতির পরিবর্তনে দ্রুত সাড়া দেওয়ার একটি দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে তথ্যের সময়োপযোগিতা, পূর্বাভাসের বিশ্বাসযোগ্যতা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর। বাজেট ঘাটতি বা সরকারি ঋণ যেন মুদ্রানীতির মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত না করে, সেদিকেও কড়া নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।

