সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে অর্থেরও বদল ঘটেছে। পণ্য বিনিময় থেকে কড়ি, ধাতব মুদ্রা, সোনা-রুপা এবং পরবর্তী সময়ে কাগজের মুদ্রা—প্রতিটি পর্যায়েই মানুষের লেনদেনের প্রয়োজন প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন রূপ পেয়েছে। একসময় হাতে থাকা নোটই ছিল সম্পদের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। এখন সেই ধারণায় যুক্ত হয়েছে নতুন বাস্তবতা।
স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েকটি স্পর্শেই হাজার কিংবা লাখ টাকা এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে চলে যাচ্ছে; দোকানে কাগজের নোটের পরিবর্তে কিউআর কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে; বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও বাণিজ্যিক লেনদেনও ক্রমশ ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি এসে তাই বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গভীর পরিবর্তন স্পষ্ট—নগদ অর্থ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, এমন নয়; বরং নগদের পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নেই। বরং মোবাইল আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড, জাতীয় পেমেন্ট অবকাঠামো এবং বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে একটি অধিক ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, এই রূপান্তর কি শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন, নাকি এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কৃতিরও বড় পরিবর্তনের সূচনা? বাস্তবতা বলছে, দ্বিতীয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নগদ থেকে ডিজিটালে যাওয়া মানে শুধু টাকা পাঠানোর পদ্ধতি বদলানো নয়; এর সঙ্গে বদলে যায় লেনদেনের স্বচ্ছতা, ব্যবসার হিসাব, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ভোক্তার অভ্যাস এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ধরন।
ক্যাশলেস অর্থনীতি ও স্মার্ট অর্থনীতি কী? সহজ ভাষায়, ক্যাশলেস অর্থনীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে লেনদেনের বড় অংশ নগদ নোট ও কয়েনের পরিবর্তে বৈদ্যুতিন বা ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কিউআর কোড, আন্তঃব্যাংক অর্থ স্থানান্তর এবং অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা।
তবে ‘ক্যাশলেস’ শব্দটির অর্থ আক্ষরিকভাবে সব নগদ অর্থের অবসান নয়। বাস্তব পৃথিবীর কোনো অর্থনীতিতেই সব ধরনের নগদ লেনদেন একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা সহজ নয়। বরং এর লক্ষ্য হলো যেখানে ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ, দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে করা সম্ভব, সেখানে নগদের ওপর নির্ভরতা কমানো।
অন্যদিকে স্মার্ট অর্থনীতি আরও বিস্তৃত ধারণা। ডিজিটাল পেমেন্ট এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও স্মার্ট অর্থনীতির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল পরিচয়, স্বয়ংক্রিয় সেবা, আধুনিক আর্থিক অবকাঠামো এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণও অন্তর্ভুক্ত। ফলে কেবল কাগজের টাকা কমলেই কোনো দেশ স্মার্ট অর্থনীতিতে পরিণত হয় না; প্রয়োজন দক্ষ, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল অবকাঠামো।
বৈশ্বিক পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের শিক্ষা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ভারতীয় ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই ক্ষুদ্র দোকান থেকে বড় ব্যবসা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার ঘটিয়েছে। চীন ডিজিটাল ইউয়ান বা ই-সিএনওয়াইয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সমর্থিত ডিজিটাল মুদ্রার পরীক্ষামূলক ব্যবহার এগিয়ে নিয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে নগদ ব্যবহারের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ক্যাশলেস অর্থনীতি তৈরির কোনো একক মডেল নেই। কোথাও কার্ড প্রধান মাধ্যম, কোথাও তাৎক্ষণিক ব্যাংক স্থানান্তর, কোথাও মোবাইল ওয়ালেট বা কিউআর পেমেন্ট। ফলে বাংলাদেশের জন্য অন্য দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করার চেয়ে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো, বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত এবং গ্রামীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মোবাইল আর্থিক সেবা এই রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি তৈরি করেছে। ব্যাংক শাখা থেকে দূরে থাকা মানুষও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, গ্রহণ, বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি বড় ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে বড় উল্লম্ফন। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ইন্টারনেট ব্যাংকিং। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের মোট মূল্য মে মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিং লেনদেন আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
এই প্রবৃদ্ধি দেখায়, ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন শুধু তরুণ বা শহুরে গ্রাহকের সুবিধা নয়; ব্যবসায়িক ও উচ্চমূল্যের অর্থ স্থানান্তরেও এর ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভান্ডারে ইন্টারনেট ব্যাংকিং গ্রাহক, কার্ড, কিউআর, মোবাইল আর্থিক সেবা ও আন্তঃব্যাংক লেনদেনের পৃথক পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে—যা দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই প্রতিফলন।
অবশ্য ইন্টারনেট ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা সামান্য ওঠানামা করলেও লেনদেনের মূল্য বাড়তে পারে। তাই শুধু গ্রাহকসংখ্যা দিয়ে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সাফল্য বিচার না করে সক্রিয় ব্যবহার, লেনদেনের পরিমাণ, নিরাপত্তা ও গ্রাহক সন্তুষ্টির মতো সূচকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলা কিউআর: ছোট দোকান থেকে বড় পরিবর্তন। বাংলাদেশের ক্যাশলেস রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর একটি হলো বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণ। এর উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার গ্রাহকদের জন্য একটি আন্তঃপরিচালনযোগ্য কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করা।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে একক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিউআরের পরিবর্তে সর্বজনীন বাংলা কিউআর ব্যবহারের দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ফলে একই ধরনের কিউআর অবকাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহকের অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা ও পেমেন্ট-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোও এই আন্তঃপরিচালনযোগ্যতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
এর ফলও দ্রুত দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, জুনে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ১ লাখ লেনদেন হতো, যার মূল্য ছিল ২৮ কোটি টাকার বেশি। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দৈনিক লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজারে এবং মূল্য বেড়ে ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ তিন মাসের মধ্যে দৈনিক লেনদেনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন গুণ এবং মূল্য প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে। প্রতি লেনদেনের গড় পরিমাণ জুন মাসের ২,৮০০ টাকা থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বর মাসে ৪,১০১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এর অর্থ হলো, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তার মধ্যেও কিউআরভিত্তিক অর্থ পরিশোধের অভ্যাস দ্রুত তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যবস্থায় ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআরের লেনদেনে ব্যবসায়ীদের অর্থ তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ১ শতাংশ ন্যূনতম মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট হার তুলে দেওয়া এবং ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আন্তঃপরিশোধ মাশুল শূন্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বাংলা কিউআর লেনদেনে প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে—টাকা কত দ্রুত হাতে বা হিসাবে আসে এবং লেনদেনে কত খরচ হয় তার ওপর।
বাংলাদেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেনও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৯৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে এসব কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ ৯১ শতাংশ বেড়ে জুন ২০২৬-এ ৪৪ হাজার ৮১৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
শুধু ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রেই জুনে দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেন ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এক বছর আগের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লেনদেনের অধিকাংশই কেনাকাটার কাজে হয়েছে। অর্থাৎ কার্ড ধীরে ধীরে কেবল নগদ উত্তোলনের বিকল্প নয়, সরাসরি পণ্য ও সেবা কেনার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
নগদ কমানোর অর্থনৈতিক সুফল। ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে প্রথম সুবিধা আসে লেনদেনের গতি ও হিসাব ব্যবস্থাপনায়। টাকা পরিবহনের প্রয়োজন কমে, ব্যবসায়িক হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং অর্থ স্থানান্তরে সময় কম লাগে।
কাগজের নোটের মুদ্রণ, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাছাই ও অযোগ্য নোট প্রত্যাহারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাস্তব ব্যয় জড়িত। ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে এই ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। আরেকটি বড় সুবিধা হলো লেনদেনের তথ্য। ডিজিটাল লেনদেনে একটি নথি বা হিসাবের ছাপ থাকে। ফলে বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ, হিসাবরক্ষণ এবং কর ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে।
তবে এখানেই একটি সতর্কতা জরুরি। ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেই দুর্নীতি বা কালো টাকা ‘অসম্ভব’ হয়ে যায় না। অবৈধ অর্থ ডিজিটাল মাধ্যমেও স্থানান্তরিত হতে পারে। তবে যথাযথ পরিচয় যাচাই, তথ্য বিশ্লেষণ, নজরদারি ও আইন প্রয়োগের সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন যুক্ত হলে সন্দেহজনক অর্থপ্রবাহ শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ে।
ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ। ডিজিটাল লেনদেনের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা। একজন ছোট ব্যবসায়ীর নিয়মিত ডিজিটাল বিক্রির তথ্য সংরক্ষিত থাকলে ভবিষ্যতে তার ব্যবসার নগদ প্রবাহ সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ধারণা তৈরি হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, শুধু কিউআরে টাকা নিলেই ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামানতবিহীন ঋণ দেবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আয়, পরিশোধক্ষমতা, ব্যবসার ধরন, ঝুঁকি ও অন্যান্য তথ্য বিবেচনা করতে হয়। তবে ডিজিটাল লেনদেনের ধারাবাহিক তথ্য ভবিষ্যতে বিকল্প ক্রেডিট মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে। এই সম্ভাবনাটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তবু নগদ এখনো শক্তিশালী। ডিজিটাল লেনদেনের দ্রুত প্রবৃদ্ধিকে দেখে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস অর্থনীতি হয়ে গেছে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি নগদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বজায় থাকার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু নগদ এখনো অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এর কারণও স্পষ্ট। দেশের বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, গ্রামীণ বাজার, ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতা এবং সব জায়গায় সমান প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব নগদের ব্যবহারকে টিকিয়ে রেখেছে।। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নগদকে প্রশাসনিকভাবে একদিনে বিলুপ্ত করা নয়; বরং ডিজিটাল ব্যবস্থাকে এত সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করা, যাতে মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই ডিজিটাল মাধ্যম বেছে নেয়।
ডিজিটাল বিভাজন এখনো বড় বাধা। ক্যাশলেস অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো ডিজিটাল প্রবেশাধিকার। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল দক্ষতা—সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া একটি কার্যকর ডিজিটাল অর্থনীতি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি, লেনদেনের ব্যয় এবং স্মার্টফোনের সীমিত প্রবেশাধিকারকে নগদ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতএব, শুধু শহরের বিপণিবিতানে কিউআর কোড বসালেই স্মার্ট অর্থনীতি তৈরি হবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক, ক্ষুদ্র দোকানি, নারী উদ্যোক্তা ও স্বল্প আয়ের মানুষকে এই ব্যবস্থার কার্যকর অংশীদার করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্ন। ক্যাশলেস অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আস্থা। মানুষ যদি মনে করেন ডিজিটাল হিসাবে রাখা অর্থ নিরাপদ নয়, তাহলে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, নগদের প্রতি নির্ভরতা থাকবে। ফিশিং, ভুয়া ফোন, প্রতারণামূলক বার্তা, পরিচয় চুরি, ওটিপি হাতিয়ে নেওয়া কিংবা সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা ডিজিটাল অর্থনীতির বাস্তব ঝুঁকি। তাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রাহকের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সাইবার নিরাপত্তা উদ্যোগও দেখায় যে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তাকে সমান্তরাল অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, লেনদেন স্থগিতের সুযোগ, অর্থ ফেরত এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ নিরাপদ ডিজিটাল অর্থনীতি শুধু শক্তিশালী প্রযুক্তির ওপর নয়, শক্তিশালী গ্রাহক সুরক্ষার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।
মার্চেন্ট ফি কমানো কেন গুরুত্বপূর্ণ? ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করবেন কি না, তার একটি বড় নির্ধারক হলো খরচ। একজন বড় ব্যবসায়ী সামান্য লেনদেন ফি বহন করতে পারলেও একজন ক্ষুদ্র দোকানির কাছে প্রতিটি লেনদেনের সামান্য চার্জও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই বাংলা কিউআরের খরচ কমানোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ। অক্টোবর ২০২৬ থেকে ১ শতাংশ ন্যূনতম মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট হার তুলে দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মাশুল কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র লেনদেন উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এ ধরনের নীতি সফল হলে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়তে পারে। তবে শুধু প্রণোদনা নয়—দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তির উন্নতি ও লেনদেনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচও যুক্তিসংগত থাকে।
ভবিষ্যৎ নীতিতে কী প্রয়োজন? বাংলাদেশের ক্যাশলেস রূপান্তর সফল করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। প্রথমত, আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা আরও বাড়াতে হবে। একজন গ্রাহক কোন প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবহার করছেন, সেটি যেন তার ডিজিটাল পেমেন্টের স্বাধীনতাকে অযথা সীমাবদ্ধ না করে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কিউআর ও ডিজিটাল পেমেন্টের খরচ কম রাখতে হবে এবং অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, গ্রাম ও শহরের ডিজিটাল অবকাঠামোর ব্যবধান কমাতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য মোবাইল ইন্টারনেট ছাড়া ক্যাশলেস ব্যবস্থা বাস্তবে টেকসই হবে না। চতুর্থত, আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, নারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে হাতে-কলমে নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন শেখানো প্রয়োজন। পঞ্চমত, সরকারি সেবার ডিজিটাল পরিশোধ আরও সম্প্রসারিত করা দরকার। তবে যেখানে নগদের বিকল্প অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়, সেখানে হঠাৎ নগদ বন্ধ করার বদলে ধাপে ধাপে ডিজিটাল বিকল্প শক্তিশালী করা বেশি বাস্তবসম্মত। ষষ্ঠত, সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহক সুরক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তিকে ডিজিটাল পেমেন্ট সম্প্রসারণের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
সিবিডিসি কি পরবর্তী ধাপ? কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা বা সিবিডিসি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চলছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি এখনই চালু হয়ে গেছে—এমন দাবি করা সঠিক হবে না। বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতির বর্তমান অগ্রাধিকার মূলত বিদ্যমান পেমেন্ট অবকাঠামো—ব্যাংকিং, এমএফএস, কিউআর, কার্ড ও আন্তঃব্যাংক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও আন্তঃসংযুক্ত করা।
ভবিষ্যতে সিবিডিসি নিয়ে নীতিগত ও প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে শুধু কাগজের নোটের বিকল্প হিসেবে নতুন ডিজিটাল মুদ্রা চালু করাই সমাধান নয়। এর প্রয়োজনীয়তা, গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যমান পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য—সবকিছু গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
কাগজের টাকা থেকে স্মার্ট অর্থনীতির পথে। বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বর্তমান চিত্রে আশাবাদের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। জুন ২০২৬-এ ইন্টারনেট ব্যাংকিং লেনদেনের মূল্য ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। একই সময়ে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার অব্যাহত থেকেছে। আর বাংলা কিউআর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দৈনিক প্রায় ১ লাখ লেনদেন থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে; দৈনিক লেনদেনের মূল্যও ২৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় উঠেছে।
এই পরিসংখ্যান একটি পরিবর্তনশীল অর্থনীতির ছবি তুলে ধরে। তবে এটিকে ‘বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ক্যাশলেস হয়ে গেছে’ বলার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এগুলো দেখায় যে নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল-প্রধান অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশের যাত্রা দ্রুত হচ্ছে।
স্মার্ট অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন একজন শহুরে ভোক্তা যেমন নিরাপদে কিউআর স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন, তেমনি প্রত্যন্ত গ্রামের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও একই ব্যবস্থায় সহজে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন; যখন ডিজিটাল লেনদেনে খরচ কম হবে, প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত সুরক্ষা পাওয়া যাবে এবং ব্যবসার ডিজিটাল ইতিহাস অর্থায়নের সুযোগ বাড়াবে।
কাগজের টাকা তাই রাতারাতি অদৃশ্য হওয়ার বিষয় নয়। এটি একটি দীর্ঘ রূপান্তরের গল্প। সেই রূপান্তরে প্রযুক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আস্থা, নীতি, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও মানুষের সক্ষমতা।
বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন ‘ক্যাশ থাকবে কি থাকবে না’—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, নগদের পাশাপাশি যে ডিজিটাল অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে, সেটিকে কতটা নিরাপদ, সাশ্রয়ী, আন্তঃপরিচালনযোগ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়। কারণ একটি সত্যিকারের স্মার্ট অর্থনীতি এমন হবে, যেখানে প্রযুক্তি কেবল লেনদেনকে দ্রুত করবে না; বরং অর্থনৈতিক সুযোগকে আরও বিস্তৃত করবে, ব্যবসাকে আরও স্বচ্ছ করবে এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তুলবে।
বাংলাদেশ সেই পথেই এগোচ্ছে। বাংলা কিউআরের দ্রুত সম্প্রসারণ, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি, কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যাপক বিস্তার সেই পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রমাণ। এখন প্রয়োজন এই গতি ধরে রেখে এমন একটি ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে নগদ অর্থের বিকল্প শুধু প্রযুক্তিগতভাবে নয়—বাস্তব জীবনেও মানুষের কাছে বেশি সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। সেই পথই হতে পারে বাংলাদেশের স্মার্ট অর্থনীতির সবচেয়ে টেকসই ভিত্তি।

