শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি পূজামণ্ডপে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তাঁরা এসব কথা বলেন। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সংগঠন দুটি এ সভার আয়োজন করে। সভায় লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস (সাধন)। উপস্থিত ছিলেন পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও কাজল দেবনাথ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, উপদেষ্টা বীরেশ চন্দ্র সাহা এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথসহ অন্য নেতারা।
নেতারা বলেন, তাঁরা চান পূজা শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্নে উদযাপিত হোক। ধর্মীয় উৎসবে সব সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন বাঙালির শাশ্বত ঐতিহ্য। তাঁরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করেন, যেখানে ঈদ, পূজা, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমাসহ সব ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে, ভয়ভীতি ও পুলিশি পাহারা ছাড়াই পালন করা যাবে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পূজার প্রস্তুতির মধ্যে সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি জেলায় দুর্গাপ্রতিমা ও মন্দিরে হামলা হয়েছে। ফরিদপুরে ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে। সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা ও লুটপাট হয়েছে। নওগাঁয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী পরিচয়ে ডাকাতির খবরও পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অনেক দুর্বৃত্ত গ্রেপ্তার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে নেতারা বলেন, শুধু বাহিনীর পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। তাঁদের ভাষ্য, পূজার পাঁচ দিনের নিরাপত্তা ভাবলেই হবে না, বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গড়তে হলে ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশের পাশাপাশি দুর্বৃত্তদের বিচারের সংস্কৃতিও প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দেশজুড়ে পূজার আয়োজনে প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকবে না বলেও জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোও পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতি মিলেছে। সুষ্ঠুভাবে পূজা আয়োজনের জন্য পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২২ দফা নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
সভায় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অস্তিত্ব রক্ষায় আট দফা দাবি আবারও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ। অর্পিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করে ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভুক্তভোগীদের জমির মালিকানা ও দখল ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাতে সরকার, সংসদ ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সব সংস্থায় সংখ্যালঘুদের অংশীদারি ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
অন্য দাবির মধ্যে আছে দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণে আইন, বৈষম্য বিলোপ আইন, হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তর এবং দুর্গাপূজায় অষ্টমী থেকে দশমী পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি সরকারি গেজেটে প্রকাশ। দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও বৈষম্য বিলোপ আইনের খসড়া বিল ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়।
পূজার ঠিক আগে এতগুলো ঘটনার অভিযোগ স্বভাবতই উদ্বেগ বাড়ায়। তবে এখানে উল্লেখ্য, ৩৪টি ঘটনার সংখ্যা ও বিবরণ দুটি সংগঠনের বক্তব্যভিত্তিক। প্রকাশিত তথ্যে কোন জেলায় কতটি ঘটনা ঘটেছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন বা কতটি মামলা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। ঘটনাগুলোর পেছনে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য ছিল, নাকি চুরি-ডাকাতির মতো অন্য কারণ ছিল, তা-ও স্পষ্ট করা হয়নি। প্রশাসন বা পুলিশের পক্ষ থেকে এ সংখ্যা নিয়ে কোনো বক্তব্যও প্রকাশিত খবরে নেই।
নেতাদের ‘৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা’ দাবির তাৎপর্য আছে। উৎসবের সময় পুলিশি পাহারা বাড়ানো সাময়িক সমাধান হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ফেরাতে দ্রুত তদন্ত, দৃশ্যমান বিচার এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষায় আইনি কাঠামো জরুরি। উৎসবের আগে প্রশাসনের আশ্বাস কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

