নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাতায়াত করা গুরুতর গোনাহের কাজ। তবে এ নিয়ে সমাজে প্রচলিত একটি কথা ভিত্তিহীন। অনেকে বলেন, নামাজির সামনে দিয়ে গেলে ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়। সিলেটের জামিয়া কৌড়িয়ার প্রধান মুফতি ও মুহাদ্দিস মাওলানা হেলাল আসহাব কাসেমি বলেছেন, এমন বক্তব্য শরিয়তে প্রমাণিত নয়। তাঁর ভাষায় এটি মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। একই সঙ্গে নামাজির সামনে দিয়ে কতটুকু দূরত্বে হাঁটা যাবে, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে।
ইসলামে সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীর ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। কোরআনে সরাসরি নামাজ আদায়ের নির্দেশ এসেছে। সুরা বাকারার ৪৩ নম্বর আয়াতে নামাজ কায়েম, জাকাত প্রদান ও রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করার কথা বলা হয়েছে। সুরা নিসায় বলা হয়েছে, নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ। হাদিসে নামাজকে দ্বীনের স্তম্ভ বলা হয়েছে, অর্থাৎ নামাজ ছাড়া ধর্মের ভিত্তি গড়ে ওঠে না। আরেক হাদিসে এসেছে, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ এর মধ্যবর্তী সময়ের গোনাহ মুছে দেয়।
নামাজের মর্যাদা যেমন বেশি, নামাজি ব্যক্তির মর্যাদাও তেমন। তাই নবীজি (সা.) নামাজির সামনে দিয়ে যাওয়া নিষেধ করেছেন। হাদিসে এসেছে, নামাজির সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী যদি জানত এতে কত বড় শাস্তির আশঙ্কা আছে, তবে চল্লিশ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকাকেও সে ভালো মনে করত। বর্ণনাকারী আবুন নাজর বলেন, এই চল্লিশ দিন, মাস নাকি বছর, তা তাঁর জানা নেই। হাদিসটি সহিহ বোখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
এই হাদিসের ভিত্তিতে নামাজির সামনে দিয়ে চলাফেরা করা গুরুতর অপরাধ। তবু অনেকে বিষয়টিকে স্বাভাবিক মনে করেন। আবার যাঁরা নিষেধ করেন, তাঁদের কেউ কেউ ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হওয়ার কথা বলেন। আসহাব কাসেমির মতে, হাদিসে কঠোর নিষেধ আছে ঠিকই, কিন্তু ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হওয়ার কথা কোথাও প্রমাণিত নয়। হাদিসে চল্লিশ সংখ্যাটির অর্থ কী, তা বর্ণনাকারীই নিশ্চিত করে বলেননি।
কোন কোন ক্ষেত্রে গোনাহ হয় না, সে বিষয়েও তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ যদি নামাজির ঠিক সামনে থাকেন, তবে সেখান থেকে ডানে বা বামে সরে যেতে পারেন। এতে গোনাহ হবে না। এটি অতিক্রম করার মধ্যে পড়ে না। তবে বিনা প্রয়োজনে এমন করা উচিত নয়। একইভাবে নামাজির সামনে শরয়ি সুতরা থাকলে তার সামনে দিয়ে যাওয়া যায়। সুতরা মানে নামাজির সামনে রাখা এমন কোনো আড়াল, যা তাঁর ও অতিক্রমকারীর মধ্যে সীমারেখা তৈরি করে। এ ক্ষেত্রেও বিনা প্রয়োজনে যাওয়া ঠিক নয়।
বড় মসজিদের ক্ষেত্রে আলাদা বিধান আছে। আসহাব কাসেমি বলেন, যে মসজিদের প্রশস্ততা ৪০ বর্গহাতের বেশি, সেখানে নামাজি সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখলে সাধারণত যত দূর নজরে আসে, তার বাইরে দিয়ে যাওয়া যাবে। এই পরিমাণ হলো মুসল্লির নিজের কাতারসহ সামনের আরও দুই কাতার। এর বাইরে দিয়ে গেলে গোনাহ হবে না, তবে এর ভেতর দিয়ে গেলে অবশ্যই গোনাহ হবে। এর চেয়ে ছোট মসজিদে সুতরা ছাড়া নামাজির সামনে দিয়ে যাওয়া নাজায়েজ ও গর্হিত কাজ। এ মত তিনি আল হিদায়া গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করেছেন।
কেউ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নামাজির সামনে দিয়ে যেতে চাইলে নামাজি ব্যক্তি ডান হাত বাড়িয়ে তাঁকে বাধা দিতে পারেন। শরিয়তে এ নির্দেশনা এসেছে বলে জানান আসহাব কাসেমি।
ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, নামাজির সামনে দিয়ে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়া নাজায়েজ। তবে কেউ নামাজির ঠিক সামনে থাকলে তিনি সেখান থেকে সরে যেতে পারেন। একইভাবে নামাজির পেছন থেকে গিয়ে তাঁর বরাবর সামনে দাঁড়ানোও যাবে।
কতটুকু দূরত্ব দিয়ে হাঁটা যাবে, এ প্রশ্নে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। একদল আলেম বলেছেন, সিজদা পর্যন্ত যতটুকু জায়গা লাগে, তা ছেড়ে অর্থাৎ এক কাতার সামনে দিয়ে হাঁটা যাবে। তাঁদের যুক্তি, সিজদার জায়গার বাইরে হাঁটলে নামাজির মনোযোগ নষ্ট হওয়ার কথা নয়। হাদিসে নিষেধ মূলত তাঁর মনোযোগ রক্ষার জন্যই।
আরেক দল আলেম তিন কাতার সামনে দিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাঁদের যুক্তি, নামাজি সিজদার জায়গায় তাকালেও স্বাভাবিকভাবে তিন কাতার পর্যন্ত দেখতে পান। তাই তিন কাতারের ভেতর দিয়ে গেলে তাঁর মনোযোগ নষ্ট হবে। এর বাইরে দিয়ে যাওয়া যাবে।
এই দুই মতের প্রেক্ষাপটে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, যতটুকু জায়গা দিয়ে হাঁটলে নামাজির মনোযোগ নষ্ট হয় না, ততটুকু দূর দিয়েই যাওয়া যাবে। তাঁর পরামর্শ, যত বেশি দূরত্ব রাখা সম্ভব, তত বেশি দূরত্ব রেখে যাওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে বিষয়টির সারকথা হলো, নামাজির সামনে দিয়ে যাওয়া গুরুতর গোনাহ। তবে এর শাস্তি হিসেবে ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হওয়ার প্রচলিত কথাটি প্রমাণিত নয়, তাই এমন কথা ছড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত। দূরত্বের প্রশ্নে এক কাতার ও তিন কাতার, দুটি মতই আলেমদের মধ্যে আছে। সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পথ হলো যথাসম্ভব বেশি দূরত্ব রাখা, প্রয়োজন না থাকলে সামনে দিয়ে না যাওয়া এবং বিশেষ প্রয়োজনে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া। বিশেষ করে ছোট মসজিদে বা জামাতের সময় সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ সেখানে সুতরা ছাড়া অতিক্রমের সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেছেন মুফতি আসহাব কাসেমি।
সূত্র: কাল বেলা

